‘শীতের শেষ রাত বসন্তের প্রথম দিন’ নামটি কৈশোরে আমাকে খুব টেনেছিল। ফুরিয়ে যাওয়া মাঘ আর সূচিত ফাল্গুনের সন্ধিক্ষণের সেই নো-ম্যানস ল্যান্ডের মতো বিষয়টি বেশ নাড়া দিয়েছিল বলে বইটির লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদ মনে দাগ কাটেন। পরে তাঁর সঙ্গে পত্রযোগাযোগ, পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ঢাকায় এসে তার ধানমন্ডির বইভর্তি বাসায় বহুবার আড্ডা দিই। পরে তিনি চলে যান উত্তরায় রত্নদ্বীপে। ২০০৪ সালে একবার যাই রত্নদ্বীপে। একুশের একটি অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করার জন্য। প্রথমে ফোন করলে বলেন, ‘তুমি আমাকে ভুলে গেছ? বাসায় আসো।’ বাসায় গিয়ে মহান ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ‘স্মৃতিচারণা, আবৃত্তি ও কবিতা পাঠ’-এর প্রধান অতিথির আমন্ত্রণ জানাই।
‘স্বরব্যঞ্জন’ এবং ‘তারুণ্য’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন আহমদ রফিক। আর কবিতা পাঠ করেছিলেন আবু বকর সিদ্দিক, শিহাব সরকার, কাজী রোজী, মাহবুব বারী, জরিনা আখতার, কামাল চৌধুরী, শাহজাদী আঞ্জুমান আরা, বিমল গুহ, ফারুক মাহমুদ প্রমুখ।
সেদিন আমি তাঁদের উদ্দেশে বলেছিলাম, ‘সবাই বলে—ভাষাসৈনিক। আমি বলি, ভাষা সেনাপতি।’ ভাষাসৈনিক থেকে সেনাপতিতে উত্তীর্ণ করায় তিনি আনন্দে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছিলেন, এভাবে কেউ কোনো দিন আমাকে সম্মান জানায়নি।
ভাষাসেনাপতি আলাউদ্দিন আল আজাদ জুলাই ০৩, ২০০৯-এ জীবন থেকে অবসর নিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর জানালেন টরন্টোর সহিদুল ইসলাম মিন্টু। আমি তখন স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করি। মিন্টু এসে বললেন, ‘দুলাল ভাই, আপনার ভাষা সেনাপতি মারা গেছেন। তার সঙ্গে আপনার অনেক স্মৃতি। আমার বেঙ্গলি টাইমসের জন্য একটা লেখা দেবেন।’
সঙ্গে সঙ্গেই আলাউদ্দিন আল আজাদের নানা স্মৃতি ভিড় করল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ ১৯৬০ সালে বের করে নওরোজ কিতাবিস্তান। বইটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ থেকেই ‘বসুন্ধরা’ নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সুভাষ দত্ত। ‘বসুন্ধরা’ সাতটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিল। আমি বইটি আজও পড়িনি। তবে সিনেমাটা দেখেছি। তা নিয়ে আলোচনা করেছি আলাউদ্দিন আল আজাদের সঙ্গে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ আর সত্যজিত্ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ কি এক?
আরও বলেছিলেন, অপুর চরিত্রে আমি কিছুটা নিজেকে খুঁজে পাই। কারণ, তাঁর ডাকনাম ‘বাদশা’ হলেও শৈশবে বাবা-মাকে হারান; শুরু হয় তাঁর জীবনসংগ্রাম। গ্রামজীবনের কৃষিভিত্তিক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। নরসিংদীতে তাঁর জন্ম হলেও বেড়ে উঠেছেন ভৈরবে। সেখানেই পড়াশোনা শুরু। সংগ্রাম করে জীবনের শীর্ষে উঠেছিলেন তিনি। ঈশ্বর গুপ্তের জীবন ও কবিতার ওপর পিএইচডি করেছিলেন। হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাসে সংস্কৃতি উপদেষ্টা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিসচিব!
১৯৪৬ সালে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সওগাত’ পত্রিকায় তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘জানোয়ার’ ছাপা হয়েছিল। সেসব গল্প বলতে বলতে জানান, ‘ভৈরব বাজারের রাস্তায় হাঁটতে দেখতাম এক ন্যাংটা পাগলকে, আমার কিশোরচোখে অদ্ভুত লাগত, তাকে কেন্দ্র করেই গল্পটি লিখেছিলাম।’
শতাধিক গ্রন্থের জনক আলাউদ্দিন আল আজাদের সকল কবিতা আমাকে টানেনি। কিন্তু মাহবুবুল আলম চৌধুরীর মতোই তাঁর রচিত ১৯৫২ সালে চেতনা-জাগানিয়া শহীদ মিনার নিয়ে প্রথম কবিতা ‘স্মৃতির স্তম্ভ’ চিরকালীন বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। কবিতাটি ১৯৫৩ সালে কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে স্থান পায়। অনবদ্য এ কবিতাটির অংশবিশেষ এখানে উদ্ধৃত করা হলো:
‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো
চার কোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো!
ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা চার কোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হূদয়ের বর্ণ লেখায়।
পলাশের আর
রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়
দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন, যুগে যুগে সেই
শহীদের নাম
এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিলায়, তোমাদের নামে।
তাই আমাদের
হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক
শপথের ভাস্কর’
