বই আলোচনা

নৌ-যোদ্ধাদের বীরত্বগাথা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৩৮
মুক্তিযুদ্ধ:নৌ-কম্যান্ডো নাবিকদের জীবনকোষ সম্পাদক:কম্যান্ডো মো. খলিলুর রহমান প্রচ্ছদ :অশোক কর্মকার প্রকাশক :সাহিত্যপ্রকাশ মূল্য:৬০০ টাকা, পৃষ্ঠা:৪৮০ ‘আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি। যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না’—এমনই ছিল অসমসাহসী আমাদের ‘সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা’ নৌ-কমান্ডোদের অঙ্গীকার। দেশের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ের মাধ্যমেই হতো তাঁদের পথচলার সূচনা। আর এই প্রত্যয়ের প্রতিফলন দেখি একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকায়। ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট নৌ-কমান্ডোদের দ্বারা পরিচালিত ‘অপারেশন জ্যাকপট’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে পৃথিবীময় দ্রুত পরিচিত করে তোলে। যে অভিযানে বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দরের ছাব্বিশটি জাহাজ নিমজ্জিত হয়। পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাসে সাহসীকতাপূর্ণ এমন কৃতিত্বের নজির খুবই বিরল। কারা ছিলেন এই দেশপ্রেমিক ও অসমসাহসী নৌ-কমান্ডো? কোথা থেকে এসেছিলেন তাঁরা? কীভাবে সম্ভব হয়েছিল এমন দুনিয়াকাঁপানো অভিযান? বিজয় অর্জনের দীর্ঘ চার দশক তাঁদের কীভাবে কেটেছে? এখন তাঁরা কেমন আছেন?—এমন নানা ভাবনাতাড়িত হয়ে সহযোদ্ধা কম্যান্ডো মো. খলিলুর রহমান জীবনকোষ সংকলন ও সম্পাদনার মতো শ্রমসাধ্য ও প্রশংসিত কাজে এগিয়ে এসেছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধ: নৌ-কম্যান্ডো নাবিকদের জীবনকোষ’ তাঁর দীর্ঘ ২০ বছরের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। কোষগ্রন্থটি বেশ পরিকল্পিত, শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে বিন্যস্ত এবং তথ্যবহুল। এখানে ভুক্তিগুলোতে ব্যক্তির বীরত্বগাথার পাশাপাশি উঠে এসেছে যুদ্ধের এবং যুদ্ধের আগে-পরের নানা ঘটনার অংশ, ব্যক্তির বর্তমান অবস্থান-ঠিকানা, এমনকি ফোন বা মুটোফোনের নম্বর-সম্পর্কিত তথ্য ও ব্যক্তির ছবি। উঠে এসেছে তাঁদের ক্ষোভ-বেদনার কথা, বঞ্চনার অকপট বয়ান। যেমন: ‘...অনেক প্রখ্যাত যোদ্ধাও এই খেতাব প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’ অপ্রতুল যুদ্ধ-সরঞ্জামে খুবই অল্প সময়ে কৃতিত্বের মাধ্যমে তাঁরা রচনা করেছিলেন তাঁদের গৌরবগাথা। কিন্তু তাঁদের আমরা কতটুকু মনে রেখেছি? অথবা রাষ্ট্রও কি তাঁদের সকলকে করেছে যথাযথ মূল্যায়ন? না কি আমরা তাঁদের ক্রমে ক্রমে বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারাতে চলেছিলাম! এখানেই কম্যান্ডো মো. খলিলুর রহমান ধন্যবাদের অধিকারী হবেন। কারণ তিনিই যে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের সেই সোনালি পাতাগুলো ‘বিস্মৃতিপ্রবণ’ এ জাতির সামনে মেলে ধরেছেন। অবশ্য সামান্য কিছু ভুল-ভ্রান্তি থেকে গেল। যেমন: বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমীনের ওপর লেখা ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘...ঢাকার বিজিবি সদর দফতরে ওই নামে স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ তথ্যটি সঠিক নয়। বিজিবি সদরদপ্তরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে দুটি, ‘বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ’ এবং ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ’। এ ছাড়া ‘পাকবাহিনী’ শব্দটা নিয়ে অনেকের আপত্তি রয়েছে। বিশেষ করে ইদানীং এই শব্দটি নিয়ে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সরব হয়েছেন। কারণ হিংস্রতা, বর্বরতা আর নানবিধ নাপাক কাজে লিপ্ত পাকিস্তানি বাহিনীকে কোনোভাবেই ‘পাকবাহিনী’ নয় বড়জোর ‘পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী’, ‘পাকিস্তানি হানাদার’, ‘পাকি. হানাদার’—ইত্যাদি শব্দে ডাকাই সমীচীন। পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা এই ‘পাক’ শব্দটি নিয়ে গর্ব করত এবং এখনো স্বাধীনতাবিরোধীরা এই শব্দটিতে আপ্লুত হয়। আর আগরতলা সর্ম্পকে যেসব তথ্য উঠে আসছে বিভিন্ন বই (বিশেষ করে ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলীর ‘সত্য মামলা আগরতলা’) ও লেখা থেকে, তাতে আগরতলা মামলাকে ‘ষড়যন্ত্র মামলা’ বলা আজ আর যথার্থ হবে কি না, এ প্রশ্ন সঙ্গতভাবেই এসে যায়। প্রয়োজন ছিল নির্ঘণ্টও। প্রত্যাশা, দ্বিতীয় সংস্করণে এ বিষয়গুলিতে উের যাবে জীবনকোষগ্রন্থটি। বইটির ১৬ পৃষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ ও দুলর্ভ কিছু ছবিতে সাজানো হয়েছে, যা বইটির গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। এ ছাড়া কোষগ্রন্থটির পরিশিষ্টে নৌ-কমান্ডোদের তালিকাও গ্রন্থটিকে আরও তথ্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে তথ্যসূত্রটি ক্রটিমুক্ত মনে হয়নি। কারণ ইতিহাসভিত্তিক জীবনকোষে তথ্যসূত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই কোষগ্রন্থে কিছু ভুক্তিতে ছবি যায়নি। আবার কোনো কোনো ভুক্তি খুবই সংক্ষিপ্ত—অসমাপ্ত বা তথ্যের দিক থেকে অপ্রতুল। অবশ্য সম্পাদক তাঁর ভূমিকায় এ বিষয়ে কৈফিয়ত বাতলেছেন—অনেক যোদ্ধার নিস্পৃহতা, অপমৃত্যু ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ায় কারও কারও পূর্ণতথ্য ও ছবি সংগ্রহে তিনি সফল হতে পারেননি। কিন্তু আশঙ্কার বিষয়, আজও যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের কাজ থেকে এবং যাঁরা মৃত বা শহীদ, তাঁদের স্বজনদের কাছ থেকে আরও তথ্য না নিতে পারলে জাতির এ গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস অপূর্ণই রয়ে যাবে। ফলে এ বিষয়ে সবাইকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। উদারহণস্বরূপ:বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. আ. ফ. ম. রুহুল হক এমপির নাম-ঠিকানার পর মাত্র তিন লাইন বর্ণনার মাধ্যমে শেষ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে আরেকটু মনোযোগী হলে আরও বিস্তারিত তথ্য উদ্ধার করা খুব বেশি কষ্টকর হবার কথা নয়। তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও সুবিস্তৃত ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এ ধরনের গ্রন্থ অনিবার্যভাবে ভূমিকা রাখবে। কম্যান্ডো মো. খলিলুর রহমান সম্পাদিত ‘মুক্তিযুদ্ধ: নৌ-কম্যান্ডো নাবিকদের জীবনকোষ’ গ্রন্থটি এ কারণেই আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে মূল্যবান সংযোজন হয়ে থাকবে।