বেগম খালেদা জিয়া গতকাল দিনভর সাতক্ষীরা সফরকালে দু’টি শোক সমাবেশে সরকারকে ‘উন্মাদ’, ‘দুমুখো সাপ’, ‘বেশরম’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, এদের কোনো হিতাহিত জ্ঞান নেই। সরকার উন্মাদ হয়ে গেছে। পাগলের মতো যা-ইচ্ছে তাই করছে। সরকার তাকে টার্গেট করেছে এমন দুঃসাহসের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, আন্দোলন করতে করতে এসেছি। স্বৈরাচার হটিয়েছি, গণতন্ত্র এনেছি, উন্নয়ন করেছি। এসবে আমি ভয় পাই না।
সাতক্ষীরার কলারোয়া ফুটবল মাঠ এবং সাতক্ষীরা শহরের কেন্দ্রস্থলের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বিশাল শোক সমাবেশ দু’টিতে তিনি বলেন, ‘সারাদেশে গণহত্যার হুকুমের আসামি এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যার হুকুম দিয়েছিলেন। একটির বদলে দশটি লাশ চেয়েছিলেন। এই যে হত্যা, এর সব তার হুকুমে হয়েছে। এসব হত্যার দায়ে প্রধানমন্ত্রীর বিচার করা হবে। রেহাই পাবেন না।’
খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, হরতাল যদি দেখতে না চান, ক্ষমতা ছাড়েন। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করুন। খেলা হবে সমানে সমান। দেখা যাবে কে হারে কে যেতে। বন্ধ করুন এ রক্তের হলিখেলা। বহু রক্ত নিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং ৩ ও ৪ মার্চ তিনদফায় মোট ১২ জন জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীকে গুলি করে হত্যার পর গতকাল বেগম জিয়া যশোর থেকে ঝিকরগাছা, নাভারণ, কলারোয়া হয়ে আসেন সাতক্ষীরায়। দীর্ঘ সড়ক পথে ব্যাপক জনসমাগম হয়। নারী-পুরুষ দল-মত নির্বিশেষে সকলের হাতেই ছিল শোকের কালো পতাকা, বুকে ছিল কালো ব্যাজ, মাথায় ছিল গণহত্যার বিচারের দাবি উত্কীর্ণ ফিতা। যশোর সার্কিট হাউজ থেকে বেলা পৌনে ১২টায় রওয়ানা দিয়ে দেড়টার সময় পৌঁছান কলারোয়া। এখানে পুলিশের গুলিতে নিহত শামসুর রহমান, আরিফ বিল্লাহ, রুহুল আমিন ও মনিরামপুরের আনিছুর রহমানের স্বজনদের হাতে দেড় লাখ টাকা করে তুলে দেন। পরে এখানে বক্তব্য শেষে তার গাড়িরবহর সাতক্ষীরায় সার্কিট হাউজে পৌঁছে। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে খালেদা জিয়া সাতক্ষীরার শোক সমাবেশে যান। এখানে পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে নিহত ইকবাল হোসেন তুহিন, মাহমুদুল হাসান, রবিউল, শাহীন আলম, সাইফুল্লাহ, আলহাজ্ব মোহাম্মদ সালাম, আলী মোস্তফা ও মাহবুবুর রহমানের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে নগদ সহায়তা দেন।
সাতক্ষীরার শোক সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই সরকার জালেম, খুনি; এদের হাতে বাংলাদেশের মানুষ নিরাপদ নয়। যেখানেই হত্যাকাণ্ড হচ্ছে আমরা সেখানেই যাচ্ছি। যারা শহীদ হচ্ছেন, যাদের হত্যা করছে তাদের খবর সরকার রাখছে না। এমনকি নিহত মানুষগুলোকে পোস্টমর্টেম করা হচ্ছে না।’
খালেদা জিয়া সমাবেশে উপস্থিত যুবকদের উদ্দেশে বলেন, আসল তরুণ-যুবক এখানেই আছে। তাদের মধ্যেই আছে সত্যিকারের দেশপ্রেম। এই তরুণ-যুবক তোমাদের বড় একটি দায়িত্ব আছে। শহীদ জিয়াউর রহমান এই মার্চ মাসে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিল। ছাত্র-যুবক-কৃষক সে আহ্বানে স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। কিন্তু বাকশাল গঠনের মাধ্যমে তা বিলীন করে দেয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, এই সরকারের ইচ্ছা আজীবন ক্ষমতায় থাকবে। একবার করেছিল, বাকশাল। আবারো বাকশাল করতে চায়। সব দল নিষিদ্ধ করে দিতে চায়। তারা বলছে- জামায়াত নিষিদ্ধ করবে। বিএনপি নিষিদ্ধ করবে। থাকবে শুধু তারা, তাদের দল। আমাদের নিষিদ্ধ করতে না পারলে তো তারা লুটপাট করার উত্সব করতে পারছে না।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এ সরকার বিচার বিভাগ সম্পূর্ণরূপে দলীয়করণ করে শেষ করে দিয়েছে। বিতর্কিত ব্যক্তিকে বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর প্রতিবাদে আইনজীবীরা আন্দোলন করছে। টেলিফোনে বলে দেয়া হয়, একে বেল দেন, ওকে দেয়া যাবে না।
খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রতি দলীয়করণের অভিযোগ এনে বলেন, আমরা বলেছিলাম, বিদেশিরাও বলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে সবাই বলছে। এটায় আন্তর্জাতিক কোনো মান নেই। দলীয় বিচার হচ্ছে। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখেন, যারা শেষ দিন পর্যন্ত রাজাকার পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছে, তাদের কেন ধরা হচ্ছে না। তারাই হলো বড় রাজাকার।
পদ্মা সেতু দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আবুল হোসেন সাহেব নাকি সুফী। দুদক তার দুর্নীতি চোখে দেখে না। এসব কানাডায় ধরা পড়েছে। ভবিষ্যতে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, ৫ বছর উন্নয়ন বন্ধ। দেশের বারোটা বাজিয়ে উন্নয়নের সব টাকা তাদের পকেটে। এখন নাকি সব লুটের টাকা বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে বিদেশে বাড়িটারি কিনে, পরিবারের অনেক সদস্যকে পাঠিয়ে দিয়েছে, অনেকে টিকেটও কেটে রেখেছে। সুযোগ বুঝে কেটে পড়বে। জনগণের তাড়া খেয়ে তাদের চলে যেতে হবে। এ অবস্থায় দেশ চলতে দেয়া যায় না। এখানেই ১১ জন সারাদেশে একমাসে ১৮০ জন মানুষকে হত্যা করেছে এই সরকার।
তিনি বলেন, বিজিবি সীমান্তে নিরাপত্তা দিতে পারে না। আপনারা বাংলাদেশের মানুষকে গুলি করে মারছেন, ওইদিকে সীমান্তে ভারতীয়রা বাংলাদেশিকে গুলি করছে, তার কোনো জবাব দিতে পারে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমাদের সীমান্তের ভেতরে ঢুকে তারা নির্যাতন চালিয়েছে, সরকারের কোনো কথা বলতে দেখেনি। হরতাল প্রতিরোধে তাদের রাজপথে নামাচ্ছে। হরতালতো হয়েছে, আরো হবে। আপনারা পদত্যাগ করেন, তাহলে হরতাল-টরতাল আর হবে না। আসুন, নির্বাচন করি। নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে নির্বাচন দেন। আপনাদের জনগণ ভোট দিলে আপনারা ক্ষমতায় আসবেন।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা মুসলমান। সকল ধর্মের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের মানুষকে সম্মান করি। কিন্তু এই আওয়ামী লীগের আমলে কোন ধর্মের মানুষ ভাল থাকে না। নিরাপদ নয়। খালেদা জিয়া বলেন, মুসলমানদের প্রিয় নবী রাসূল (সা.)-কে নিয়ে যেসব কটাক্ষ করা হয়েছে এগুলো উচ্চারণ করাও গুনাহ। আবার তাদের শাস্তি না দিয়ে জামাই আদরে লালনপালন করছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছে। তাদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম কর্মসূচি দিয়েছে। তারা বলেছে, ধর্মের অবমাননাকারীদের ধরতে হবে। সরকার তা না করে হেফাজতে ইসলামকে বাধা দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, মুসলমানরা শুক্রবার দিনে মসজিদে যায়। আমাদের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে তালা দিয়ে রাখা হয়েছে। হিন্দুদের মন্দির ভেঙ্গেছে। আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে তারা সম্মান দিতে জানে না, এটা হিন্দুদের বুঝতে হবে। ইস্যু সৃষ্টির নামে তারা সারাদেশে মন্দির ভাঙছে। অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করছে। আওয়ামী লীগের লোকরা শহীদ মিনার ভাঙতে গিয়ে ধরা পড়ার পর বলে পাগল। চট্টগ্রাম, উখিয়া ও রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মন্দির থেকে আওয়ামী লীগের লোকেরা দামি দামি জিনিস নিয়ে গেছে। সেখানকার আওয়ামী লীগের সভাপতিকে প্রতিদান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে নিয়ে গেছেন। এরাই আওয়ামী লীগ।
হত্যাকারী পুলিশদের সাবধান করে দিয়ে তিনি বলেন, সব পুলিশ না। কিছু দলীয় পুলিশ আর একটি বিশেষ জেলার পুলিশ। তাদেরকে বলি, পশু-পাখির মতো মানুষ মারবেন না। আমরা কারো চাকরি খেতে চাই না। তবে অন্যায় করলে শাস্তি পেতেই হবে। এই যে মহিলা পুলিশ দেখছেন, এদের চাকরি দিয়েছেন শহীদ জিয়াউর রহমান। মেট্রোপলিটন পুলিশ আমি করেছি।
খালেদা জিয়া বলেন, দেশ আজ কঠিন সময়ে। সবকিছু অন্য দেশের হাতে তারা ক্ষমতায় থাকতে চাইবে। তাই আমি তরুণদের বলছি, পরাধীনতার শৃঙ্খলে থাকবে, নাকি স্বাধীনতার পতাকা উড়াবে? তোমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। তোমরাই স্বাধীনতার পতাকা উড়াবে, আমি তোমাদের পাশে থাকবো। খালেদা জিয়া সারাদেশে গণহত্যার শিকার পরিবারগুলোর উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা শুধু সান্ত্বনা দিতে পারি। আমরা আপনাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দিতে পারবো না। ক্ষমতায় এলে আপনাদের সন্তানদের চাকরির ব্যবস্থা করতে পারবো।
কলারোয়ায় খালেদা জিয়া : বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, এখানে এসেছি কোনো বক্তব্য দেয়ার জন্য নয়। সরকারের পেটোয়া বাহিনী নিরীহ মানুষগুলোকে গুলি করে হত্যা করেছে। তাই সহমর্মিতা জানাতে এসেছি। এরা সব আপনজনদের হারিয়েছে। তাদেরকে আর কোনদিন ফিরে পাবে না।
খালেদা জিয়া বলেন, সরকার এখন একমাত্র পথ বেছে নিয়েছে দেশের মানুষকে গুম, খুন ও হত্যা করা। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে ত্বকীকে সরকারি দলের লোক হত্যা করেছে। তার বাবা হত্যাকারীর নাম বলেছে, সেখানকার মেয়রও বলেছে। কিন্তু হত্যাকারীকে ধরা হয় না। খুনিরা ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু খুনিদের এখন পর্যন্ত ধরা হয় নাই। কি করা উচিত। উপস্থিত হাজার হাজার মানুষ বলেন, এ সরকারকে ভারতে পাঠিয়ে দেন। তখন খালেদা জিয়া পর পর তিনবার বলেন, এটা আমার কথা নয়, এখানকার জনগণ বলছে।
বিরোধী নেতা বলেন, এই পদ্ম সেতু আর তারা করতে পারছে না। দুর্নীতি করেছে তাই বিশ্বব্যাংক টাকা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারও জড়িত। বিএনপি সরকারে এলে পদ্মা সেতু হবে, দুটি হবে। মাওয়া দিয়ে একটি, পাটুরিয়া দিয়ে একটি সেতু হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, কত টাকা লুটে নিয়েছেন বিদ্যুত্ থেকে, সেই টাকা দেশেও রাখেননি। বাইরে পাচার করেছেন। জনগণের উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়া বলেন, সামনে কঠোর কর্মসূচি আসবে, প্রতিটি কর্মসূচিতে শরিক হয়ে এই সরকারকে বিদায় দেবেন।
তিনি বলেন, তাদের দলে অনেক রাজাকার আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের। আমরাও বিচার করবো, যারা সত্যিকারের রাজাকার, তখন তাদের বিচার হবে।
কলারোয়ার সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সভাপতি হাবিবুল ইসলাম হাবিব।
শোক সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, ড. আবদুল মঈন খান, সাংগঠনিক সম্পাদক মশিউর রহমান, নির্বাহী কমিটির সদস্য সাহারুজ্জামান মর্তুজা, ডা. শহীদুল আলম, বিলকিছ ইসলাম, নেওয়াজ হালিমা আরলি, কলারোয়া থানা বিএনপির সভাপতি বজলুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আবদুল রকিব মোল্লা, সাংগঠনিক সম্পাদক তানজিম আহমেদ মেরিন, পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কামরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান তুহিন, কলারোয়া পৌরমেয়র আক্তারুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় জাসাস নেতা আরিফুজ্জামান মামুন, স্থানীয় বিএনপি নেতা বিএম সিরাজ, যুবদল নেতা আবদুল কাদের বাচ্চু, ছাত্রনেতা তৌফিকুর রহমান সঞ্জু প্রমুখ। দুই দিনের সফরে বেগম জিয়ার সঙ্গে আরো ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, রাজিয়া ফয়েজ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল কাদের জুয়েল প্রমুখ। সন্ধ্যায় তিনি সাতক্ষীরা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
