যৌতুক, পরকীয়া প্রেম, বলপূর্বক বিয়ে, দ্বিতীয় বিয়ে ইত্যাদি কারণে খুনের পাশাপাশি ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী খুনের ঘটনা নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা পত্রিকায় ঘটনাগুলোর সচিত্র প্রতিবেদন দেখে আঁতকে উঠি। টিভিতে সে নিউজগুলো দেখানোর সময় গিন্নিকে ডেকে বলি, ওগো শুনছো! দেখে যাও। তোমাকে যে ঘটনার কথা বলেছিলাম সেটা দেখাচ্ছে। গিন্নি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে আসে। ছেলেমেয়ে, বউ সবাই একসঙ্গে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেখি, বিস্ময় প্রকাশ করি, নরকের কীটসম অপরাধীদের দেখে নাক সিঁটকাই। তারপর ভুলে যাই। আমাদের শিষ্ট সমাজের ভূমিকা বড়জোর এ পর্যন্তই।
আগের দিনে সন্তান বাড়ি থেকে শহরে পাড়ি দেবার সময় মা বলতেন, বাবা, শহরে পৌঁছামাত্র মার কাছে চিঠি লিখবি। এখন সে চিঠি লেখার দিন নেই। এখন মা বলেন, শহরে পৌঁছামাত্র মার কাছে ফোন দিস। মা তো জানেন না, তাঁর সেই নিষ্পাপ কিশোর ছেলেটি আর ছোট্টটি নেই। দামি মোবাইল ফোন তার হাতে, যে মোবাইলে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে, ব্লু টুথ আছে। ব্লু টুথের কল্যাণে তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেটি পরিণত বয়সের মানুষের কর্মকাণ্ড সরাসরি দেখতে পারছে। বাড়ি থেকে যাত্রা করতে গিয়ে বাসের সিটে যাত্রার একঘেঁয়েমি দূর করতে গিয়ে সে মোবাইল ফোনে পর্ণো ফিল্ম দেখছে। দোষ কার ? ছেলেটির নাকি প্রযুক্তির বাঁধভাঙা জোয়ারের ? তদ্রুপ ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে পেছনের বেঞ্চে বসে যে ছেলেটি মোবাইলে অশ্লীল দৃশ্য দেখে সময় কাটাচ্ছে, দোষটি কার ? ছেলেটির নাকি প্রযুক্তির ? এসব প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য অগ্রসর মানবসমাজের চিন্তা-ভাবনা করার সময় মনে হয় এসে গেছে।
রাজধানীর তোপখানা রোডের একটি বাণিজ্যিক ভবনের টয়লেট থেকে পাঁচ দিন আগে নিখোঁজ রিতু (১০) নামে এক শিশুর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। রাজু নামে হতদরিদ্র এক কিশোর দশ বছরের এক বালিকাকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে জেলে যায়। জামিনে মুক্ত হয়ে সে কিশোর সেই মেয়েটিকেই ধর্ষণের পর হত্যা করে। মিরপুরে এক আইনজীবী মহিলাকে একাকী বাসায় হত্যা করার ঘটনা আশা করি সকলেরই জানা। দরিদ্র দুই যুবক দ্রুত বড়লোক হবার আশায় এ পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তারা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে সিকিউরিটি কোম্পানিতে চাকরি নেয়। বিশ্রামাগারের সিলিং ফ্যান বিক্রি করে ছুরি কেনে। তারপর তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার পদক্ষেপ নেয়।
ঘটনাগুলো আমরা যদি একটু গভীরভাবে বিশ্লে¬ষণ করি, দেখতে পাবো, সবগুলো ঘটনার পেছনেই সহজলভ্য মোবাইল ফোন দায়ী। মোবাইল ফোনে সহজলভ্য পর্ণো ফিল্ম দেখে তারা এ নির্মম ঘটনাগুলো ঘটাতে সাহস পেয়েছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায় টিকে থাকতে গিয়ে মোবাইল ফোনকে সহজলভ্য করে তুলেছে। যার কারণে সর্বশ্রেণির মানুষের হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছেছে। মোবাইল ফোন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো যোগ্যতার বাছ-বিচার রাখা হয়নি। প্রতিটি মোবাইল সিমের জন্য সরকারকে সম্ভবত ৯০০ বা ১২০০ টাকার কর পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু গ্রাহক বাড়ানোর লক্ষ্যে মোবাইল কোম্পানিগুলো সেই কর নিজেরাই পরিশোধ করে প্রতিটি সিম ৫০ টাকা বা ৯০ টাকায় বিক্রি করছে। যার ধ্বংসাত্মক ফলাফল জাতি এখন প্রতিনিয়ত পাচ্ছে। একজন শিক্ষিত কর্মজীবী মানুষের মোবাইল ফোন ব্যবহার আর একটা বখাটে ছেলের মোবাইল ফোন ব্যবহার একরকম হবে না। ছুরি ব্যবহার করে ডাক্তার রোগীর জীবন বাঁচায় আর একই ছুরি ব্যবহার করে ছিনতাইকারী মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। ছুরির উপযোগিতাটা নির্ভর করছে ব্যবহারকারীর ওপর।
পত্রিকায় ‘স্বামী ভয়ংকর’ শিরোনামে একটা খবর নজরে এসেছিল। স্ত্রীর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বামী পালিয়ে গিয়েছিল। দৈনিক পত্রিকার সূত্রে জানা গেলো, ঘটনার জন্য নাকি পরপুরুষের সঙ্গে মোবাইল ফোনে স্ত্রীর সন্দেহজনক আলাপচারিতাই দায়ী। ইন্টারনেটের কল্যাণে বর্তমানে দ্রুত গড়ে উঠছে একটি ফেসবুক প্রজন্ম। এ প্রজন্ম আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ফেসবুকের অদৃশ্য বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতেই ব্যস্ত অথবা ব্যস্ত বন্ধুর সংখ্যা বাড়াতে। আজকের শিক্ষার্থী পড়ার টেবিলে গভীর অধ্যয়নে মনোনিবেশ না করে মনোযোগ দেয় মোবাইল ফোনের অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায়। সারাক্ষণ তাদের হাতে থাকে দামি সুদৃশ্য মোবাইল ফোন। আর এ দামি মোবাইল ফোনের জন্য বখে যাওয়া বন্ধুর হাতে প্রাণহানির ঘটনাও এ সমাজে কম ঘটেনি। দেখা যায় বিত্তশালী বাবাই সন্তানকে কিনে দিচ্ছেন দামি মোবাইল ফোন। বাবা জানেন না, সেই মোবাইল ফোনটির সঙ্গে আদরের সন্তানের যমদূতকেও আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সাদরে। দোষটা পুরোপুরি বাবার নয়, সর্বনাশা প্রযুক্তির ক্রমবর্ধিষ্ণু জোয়ারেরও বটে।
মোবাইল ফোনের কারণে বর্তমানে কিছু বিষয় আতঙ্কের হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন ধর্ষণের ঘটনা ভিডিও করা ও পরে সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব¬্যাকমেইলিং করা, ধর্ষণ পরবর্তী খুন, শিশু অপহরণ ও পরে মোবাইলে মুক্তিপণ দাবি, চাঁদা দাবি ইত্যাদি। আফসোসের বিষয়, যে পুরুষটির দ্বারা মেয়েটি ধর্ষিত হলো, তার সঙ্গে হয়তো মেয়েটির পরিচয় হয়েছে এই সর্বনাশা মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই। মোবাইলে মিসকলের সূত্র ধরে বিপথগামী মহিলার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর সহজ সরল কিশোর বা যুবকের প্রাণহানির কিছু ঘটনাও আমরা জানি। আবার মোবাইলের মাধ্যমে বিবাহিত বা অবিবাহিত বখাটে যুবকের প্রেমে পড়ে কিশোরী বা বিবাহিত মহিলার চরম সর্বনাশ হতেও আমরা দেখেছি। মোবাইল ফোনে ‘জিনের বাদশা’ সেজে বিত্তশালী সরলা রমণীর সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার উদাহরণ তো ভূরি ভূরি।
তাই আসুন, আমরা একটু সচেতন হই, একটু চিন্তা-ভাবনা করি কীভাবে সন্তানকে সর্বগ্রাসী মোবাইল ফোনের মরণছোবল থেকে রক্ষা করতে পারি। নতুন প্রজন্মকে আমাদের রক্ষা করতেই হবে। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্যই ব্যাপারটা অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের চেয়েও জরুরি।
ঢাকা
