হরতাল ডাকা যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার, তা অমান্য করে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখাও যে নাগরিক অধিকার ও নৈতিক দায়িত্ব সে কথা কিন্তু আমরা মনে রাখছি না। বার বার ইচ্ছেকৃতভাবে ভুলে যাচ্ছি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা। নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আটক ১৫৩ নেতা-কর্মীর মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং ‘গণহত্যা’ ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিশেষ করে শীঘ্রই নেতা-কর্মীদের মুক্তিসহ ৪ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আগামী ৮ ও ৯ এপ্রিল দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। এদিকে পহেলা এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। এ অবস্থায় সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন করা নিয়ে সর্বমহলে দেখা দিয়েছে উত্কণ্ঠা। কারণ বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ঘন ঘন হরতালে জনজীবন বিষিয়ে উঠেছে। পিকেটারদের সহিংসতা, হাসতে হাসতে মানুষ পুড়িয়ে ফেলাসহ তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিক্ষার্থীরাও। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে কোথায় বাস করছি আমরা? চট্টগ্রামে সর্বশেষ হরতালের দ্বিতীয় দিনে চেরাগি পাহাড় এলাকায় অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী অন্তু বড়ুয়া পায়ে হেঁটে কোচিং ক্লাসে যাওয়ার পথে ককটেলের স্প্লিন্টারে রক্তাক্ত হয়েছে। চোখের প্রদীপ নিভতে বসেছে তার। শুধু তাই নয়, লালমনিরহাটে হরতাল সমর্থকরা দুটি স্কুলে হামলা চালিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীসহ কোমলমতি শিশুদের আহত করেছে। তাদের রোষানল থেকে রেহাই পায়নি শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহূত আসবাবপত্র এমনকি বইও। আমাদের দেশের ইতিহাসে হরতাল চলাকালে শ্রেণি কার্যক্রম ও পরীক্ষা অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার নজির নতুন না হলেও কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কখনো এহেন সহিংসতার শিকার হয়েছে বলে মনে হয় না।
হরতাল সফল ও দাবি আদায়ের নামে জান-মাল এবং সাধারণ মানুষকে নিয়ে এমন সহিংসতার হোলিখেলা আর কতদিন চলবে? বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেমন অনিশ্চিত, তেমনি অনিশ্চিত উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা হরতাল থেকে ছাড় পাওয়ার বিষয়টিও। শুধুমাত্র হরতালমুক্ত পরিবেশে এইচএসসি পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য সারাদেশের অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে মিডিয়াগুলোতে তাদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বিভিন্ন কলেজের একদল পরীক্ষার্থী সংবাদ সম্মেলন করে এইচএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে অন্তত হরতাল না ডাকার আহবান জানিয়েছে। একই দাবি খোদ শিক্ষামন্ত্রীরও। সঙ্গত কারণেই এটি একটি গ্রহণযোগ্য ও যৌক্তিক দাবি। সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা বোর্ড ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেশের সকল নাগরিকই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। তাই কোমলমতি এসব শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের কথা মানবিক বিবেচনায় এনে প্রধান বিরোধীদল ও হরতাল আহবানকারীরা সাড়া দেবেন বলে দেশের মানুষ বিশ্বাস করে। আমরাও চাই বিরোধী দলের দাবি আদায় হোক। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র কয়েকটি দিন হরতাল দেওয়া না দেওয়ায় তাদের দাবি আদায় প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বাধা হবে এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিরোধীদলে থাকা অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা এই বাস্তবতা অবশ্যই বোঝেন এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার গুরুত্বও নিশ্চয়ই তাঁরা বোঝেন। তাই বিরোধীদল দেশের ১০ লাখ শিক্ষার্থী ও দেশবাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষার মতো সাফল্য ও সম্ভাবনার পথটি হরতালমুক্ত রাখা হবে— এ প্রত্যাশা সবার।
চট্টগ্রাম
