হরতাল-অবরোধ আর লংমার্চকে কেন্দ্র করে সারাদেশ থেকে রাজধানী ঢাকা কার্যত বিচ্ছিন হয়ে পড়েছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমূল কমিটি, সেক্টরস কমান্ডারস ফোরাম ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ২৭টি সংগঠনের হরতাল আর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের রাজপথ-রেলপথ অবরোধ শুরুর অন্তত ১২ ঘন্টা আগেই শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে সারাদেশের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিরাপত্তার কারণে রাস্তায় যানবাহন নামানো হয়নি বলে দাবি করেছেন পরিবহন মালিকরা। একই অবস্থা লঞ্চ ও ট্রেনের ক্ষেত্রেও। বরিশাল থেকে কোন লঞ্চ ছাড়েনি। কিছু কিছু ট্রেন ছাড়লেও টিকিট বিক্রি করা হয়নি। চলছে না ফেরিও। মাওয়া বা পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে অনিয়মিতভাবে দু’একটি ফেরি চলেছে। গতকাল দুপুরের পর থেকে ফেরি চলাচল একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয়। আর লঞ্চগুলো নদীর মধ্যে নিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। মালিকরা বলছেন, লঞ্চ নষ্ট হয়েছে, তাই যাবে না। আসলে তারা বন্ধ করে রেখেছেন। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের কারণেই এ অবস্থা। হেফাজতের কর্মীদের দাবি সরকার তাদের লংমার্চ বাধাগ্রস্ত করতেই জোর করে মালিকদের যানবাহন নামাতে দেয়া হয়নি। বাস, ট্রেন ও লঞ্চ না চলায় হেফাজতের কর্মীরা যেমন রাজধানীতে আসতে পারছেন না, তেমনি সাধারণ মানুষও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। গতকাল রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে হেফাজত ইসলামের কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের সংঘর্ষ ও ভাংচুরের পর কর্মীরা ফিরে যান। একই দিনে হরতাল-অবরোধ আর পাল্টাপাল্টি সমাবেশের কারণে গভীর উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠা নিয়ে দেশবাসী নজর রাখছে এসব কর্মসূচিতে। কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হলে কাল রবিবার থেকে টানা হরতাল ঘোষণার আভাস আগে থেকেই দিয়ে রেখেছে হেফাজতে ইসলাম। তাই সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস থেকেই নগরবাসী যে আরো বড় দুর্ভোগে পড়তে যাচ্ছেন তা আগে থেকেই অনুমান করা যায়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই মালিকরা যানবাহন পথে নামাচ্ছেন না। সরকারের কোন আদেশ বা নির্দেশ নেই দাবি করে তিনি বলেন, মালিক সমিতির পক্ষ থেকেও কোন ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। প্রত্যেকটি পরিবহনের মালিক নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নিজেরাই রাস্তায় পরিবহন নামাননি। তিনি বলেন, এর আগে বিগত কয়েকদিনের হরতালে শুধু রাজধানীতেই শতাধিক বাস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এখন থেকে এই ধরনের সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় তারা আর কোনভাবেই বাস রাস্তায় বের করবেন না।
তবে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাইনুদ্দিন রুহি বলেন, সরকারের নির্দেশে পরিবহন মালিকরা রাস্তায় যানবাহন নামাননি। এমনকি লংমার্চে যেতে হেফাজতে ইসলামকে কোন ধরনের পরিবহন ভাড়া দেয়া হচ্ছে না। অগ্রিম টাকা নিয়ে বাস দিচ্ছেন না মালিকরা। সরকারের দ্বিমুখী আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রী বলছেন, কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হলে তারা বাধা দেবেন না। আবার পরিবহন মালিকদের বাস ভাড়া দিতে নিষেধ করা হয়েছে। এটা কেমন নীতি- প্রশ্ন তার। তিনি সরকারকে আশ্বস্ত করে
বলেন, তাদের এই কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত বা তাদের বাঁচানোর কোন ইচ্ছে হেফাজতে ইসলামের নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ ঠেকাতে নেয়া হয়েছে সর্বাত্মক পদক্ষেপ। তাই অবরোধ শুরুর ১২ ঘণ্টা আগেই শুরু করে দেয়া হয়েছে অবরোধ। প্রশাসনযন্ত্র আর শ্রমিক সংগঠনগুলোকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশ থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে ঢাকাকে। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, বরিশালসহ দেশের প্রধান প্রধান শহর থেকে ঢাকামুখী যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বরিশাল থেকে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ রয়েছে। মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে ফেরি চলাচলও বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অজুহাত দেয়া হয়েছে নিরাপত্তার। মূলত ঢাকাগামী হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের ঠেকানোর জন্যই এ কৌশল নেয়া হয়েছে। হেফাজতের নেতা-কর্মীরা যেসব বাস ভাড়া করেছিলেন সেসব বাস মালিকও এখন ঢাকায় আসতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে বিকল্প পথে ঢাকায় আসার চেষ্টা করছেন হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। গতকাল সকালে চট্টগ্রাম থেকে লংমার্চ শুরু হয়েছে। ৩৬টি মাইক্রোবাসের একটি বহর সকালে চট্টগ্রাম ত্যাগ করে।
সোহাগ পরিবহনের গাবতলী বাস কাউন্টারের টিকিট বুকিংম্যান ওমর ফারুক বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে কোনো দূরপাল্লার বাস বাইরের শহরে যাচ্ছে না। তারা টিকিট বিক্রি করছেন না। কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তারা টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। কবে থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হবে, তাও নিশ্চিত নয়। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে মালিকেরা সিদ্ধান্ত নেবেন। গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার ব্যাপারে ওমর ফারুক বলেন, হরতালে বাস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একটি সাধারণ বাসের দাম ৭০ থেকে ৮০ লাখ আর বিলাসবহুল বাসের দাম তিন থেকে চার কোটি টাকা।
সাধারণ মানুষ বলছেন, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির দিকে এগুচ্ছে দেশ। এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে এক বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইনি জটিলতার কারণে এখনই জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। গণজাগরণ মঞ্চ জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন করছে। এই মঞ্চের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা আরো কঠোর আন্দোলনের পথ বেছে নিবে। তাই সময় যত গড়াচ্ছে ততোই জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। দেশে কী হতে যাচ্ছে? সামনের দিনগুলো কী অন্ধকারাচ্ছন্ন? এসব প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে এখন মানুষের মনে।
দক্ষিণাঞ্চল থেকে সড়ক ও নৌ-পরিবহন বন্ধ
বরিশাল অফিস জানায়, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বরিশাল-ঢাকা রুটের সকল ধরনের বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর জোরপূর্বক লঞ্চ থেকে মুসল্লীদের নামিয়ে দেয়ার পর গতকাল শুক্রবার ভোর ৬টা থেকে সড়ক পথে বরিশাল-ঢাকা রুটের সকল প্রকার বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। দুপুরে নৌ-বন্দর টার্মিনাল থেকে ঢাকাগামী সুরভী, সুন্দরবন, পারাবত ও দ্বীপরাজ কোম্পানির লঞ্চগুলো বেলতলা ফেরিঘাটে সরিয়ে নেয়া হয়। লঞ্চ স্টাফরা জানিয়েছেন, পুলিশের চাপের মুখে তারা লঞ্চ সরিয়ে নিয়েছেন। যদিও সুন্দরবন লঞ্চের স্বত্ব্বাধিকারী বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু ও সুরভী নেভিগেশনের পরিচালক রেজিন উল কবির ইত্তেফাককে জানান, তাদের লঞ্চের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে লঞ্চ ঘাট থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। শুধু বরিশাল নৌবন্দর নয়, দক্ষিণাঞ্চলের কোনো রুট থেকেই ঢাকাগামী লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। ফলে সাধারণ যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে যারা সড়ক পথে মাইক্রোবাস বা বিকল্প যানবাহনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন তারাও চরজানাজাত, মাওয়া ঘাটে গিয়ে দুর্ভোগে পড়েন। এ রুটের সকল স্পীডবোট চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি ফেরি চলাচল করলেও তা অধিকাংশই পণ্যবাহী ট্রাক পরিবহন করেছে। নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে মালিক পক্ষ সকল কাউন্টার বন্ধ রেখেছেন।
মাওয়া-কাওড়াকান্দিতে নৌযান চলছে সীমিত
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গতকাল ঢাকা-মাওয়া-খুলনা মহাসড়কের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে ফেরি, লঞ্চ, সি-বোটসহ সকল প্রকার নৌযান চলছে সীমিত আকারে। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কেও সীমিত আকারে বাস চলাচল করেছে। অপরদিকে নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ নৌপথে লঞ্চ চলাচল বেলা ১১টার দিকে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এতে যাত্রী দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। এ ব্যাপারে মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ি ইনচার্জ এসআই হাফিজুর রহমান বলেন, আমরা কোন বাধার সৃষ্টি করছি না। মাওয়া প্রান্তে সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি’র মাওয়া অফিসের এজিএম আশিকুজ্জামান জানান, ফেরি চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ফেরিগুলো ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকলেও কোন প্রকার পরিবহন না থাকায় ফেরিগুলো ছেড়ে যেতে পারছে না।
রাজশাহী থেকে বাস চলাচল বন্ধ
রাজশাহী অফিস জানায়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় বাস মালিকদের ‘ব্যক্তিগত’ সিদ্ধান্তে গতকাল বেলা ১১টায় রাজশাহী থেকে ঢাকাগামী বাস-কোচ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে আন্তঃজেলা ও লোকাল রুটের বাস চলাচল সারাদিন স্বাভাবিক থাকলেও গতকাল সন্ধ্যার পর সেগুলোর চলাচলও বন্ধ হয়ে গেছে। রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মঞ্জুর রহমান পিটার জানান, সাংগঠনিক কোনো সিদ্ধান্তে নয়, প্রত্যেক বাস-কোচের মালিক তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে বাস-কোচ চলাচল বন্ধ রেখেছেন। প্রসঙ্গত, হরতালের নামে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের প্রতিবাদে পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন বিভাগীয় কমিটির আহবানে বৃহস্পতিবার রাজশাহী বিভাগে সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বাস ধর্মঘট পালন করা হয়।
খুলনা থেকে গণপরিবহন ছাড়েনি
খুলনা অফিস জানায়, ঢাকার উদ্দেশ্যে কোন গণপরিবহন খুলনা থেকে ছেড়ে যায়নি। তবে অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে গণপরিবহন যথারীতি চলাচল করেছে বলে জানা গেছে। হেফাজতে ইসলাম খুলনার নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন, তারা যাতে লংমার্চে যোগ দিতে না পারে সে জন্য নগরীর সোনাডাঙ্গা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে ঢাকা রুটের সকল গণপরিবহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এছাড়া পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বুধবার থেকেই রেন্ট-এ-কারগুলোর ভাড়া ধরা বন্ধ করে দিতে বলা হয় বলে জানা গেছে।
এদিকে হেফাজতে ইসলাম খুলনার সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নাসির উদ্দিনসহ ১৪ নেতা-কর্মীকে গতকাল রেল স্টশন থেকে আটক করে সদর থানায় নিয়ে যায়। সেখানে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ছেড়ে দেয়া হয়। লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির খুলনা বিভাগীয় আহবায়ক মাওলানা মোস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, দফায় দফায় রেলস্টেশন থেকে পুলিশ তাদের ঢাকাগামী নেতা-কর্মীদের আটক করে শরীরে তল্লাশি চালায়।
সিলেটে কোর্ট পয়েন্টে অবস্থান
সিলেট অফিস জানায়, লংমার্চে যেতে গাড়ি না পেয়ে সিলেটের প্রবেশদ্বার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হুমায়ুন রশীদ চত্বর ও কোর্ট পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেছেন হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা।
সারারাত সেখানে অবস্থান করবেন বলে ঘোষণা দেন তারা। সমাবেশে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েক হাজার লোক এসে জড়ো হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। গত বৃহসপতিবার রাতে নেতারা সভা করে ঘোষণা দিয়েছিলেন, গাড়ি না পেলে
তারা সিলেট থেকে পায়ে হেঁটে ঢাকার লংমার্চের উদ্দেশে রওয়ানা হবেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী বিকাল ৩টা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা ধোপাদীঘির পূর্বপাড়ের ওসমানী শিশুপার্কের সামনে জড়ো হতে থাকেন। বিকাল ৪টায় সেখানে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। পরে তারা দক্ষিণ সুরমা বাস টার্মিনালের দিকে রওয়ানা হন এবং সন্ধ্যার পর হেফাজতে ইসলাম কোর্ট পয়েন্টে জমায়েত হয়।
নরসিংদীতে পুলিশ বিজিবি
র্যাবের বাধা
নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, ঢাকা অভিমুখী লংমার্চে ব্যাপক পুলিশী বাধার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর বাসস্ট্যান্ডে হবিগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী হেফাজতে ইসলামের ৩টি বাস থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়েছে পুলিশ ও বিজিবি। বেলা ২ টায় নারায়ণপুর বাসস্ট্যান্ডে পুলিশ, বিজিবি সদস্যরা ৩টি বাসের গতিরোধ করে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদেরকে জোরপূর্বক বাস থেকে নামিয়ে দেয়। বাদ জুমা স্টেশনে গিয়ে টিকিটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েও টিকিট পায়নি। স্টেশনের বুকিংক্লার্করা চলে যায়। রেলস্টেশনে শত শত হেফাজত কর্মী টিকিট না পেয়েও ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। প্লাটফরমে কয়েশত মুসল্লী সমবেত হলে শুক্রবার দুপুরে নরসিংদী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুল করিমের নেতৃত্বে পুলিশ নরসিংদী রেলস্টেশনে হেফাজত কর্মীদেরকে ট্রেনে উঠতে বাধা প্রদান করে। দুপুর আড়াইটায় শত শত আলেম ওলামা ও হেফাজত কর্মী লংমার্চে যোগ দিতে নরসিংদী রেলস্টেশনে জড়ো হলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুবুল করিম হ্যান্ডমাইক দিয়ে তাদেরকে টিকিট ছাড়া ট্রেনে উঠতে নিষেধ করে। এসময় সমবেত হেফাজত কর্মীরা ম্যাজিস্ট্রেটের এই ঘোষণার প্রতিবাদ জানিয়ে তার নিকট ট্রেনের টিকিট চাইতে থাকে। এ অবস্থায় হেফাজত কর্মীদের সাথে ম্যাজিস্ট্রেটের বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে হেফাজত কর্মীসহ স্টেশনে উপস্থিত শত শত যাত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ পিছু হটতে বাধ্য হয়। নরসিংদী হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ইসমাইল নূরপূরী স্টেশনে ছুটে আসেন। তিনি উপস্থিত থেকে হেফাজত কর্মীদেরকে ট্রেনে উঠতে সাহায্য করেন।
সাতক্ষীরা শহরের প্রবেশ
দ্বারে পুলিশের তল্লাশি
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন প্রবেশ দ্বারে পুলিশ গতকাল দুপুর থেকে সকল বাসে তল্লাশি চালিয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে ঢাকাগামী সকল পরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
ফরিদপুরে হেফাজতের
১৬ গাড়ী ভাংচুর
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, লং মার্চে অংশ নিতে যশোরের নেতৃবৃন্দ ২৯টি গাড়ির বহর নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ঘাটে ফেরি বন্ধ করে দেয়ায় তারা ঢাকা যেতে না পেরে সেখান থেকে যশোরে ফেরত যাওয়ার পথে ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ে আসলে এই বহরে ১৬টি গাড়ী ভাংচুর করা হয়।
কাউখালী থেকে লঞ্চ
বাস ফেরি বন্ধ
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, লং মার্চ প্রতিরোধে হরতাল ও অবরোধ শুরুর আগেই খুলনা-বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে পিরোজপুরের কাউখালী বেকুটিয়া ও কাউখালী-স্বরূপকাঠি-বরিশাল সড়কের আমরাজুরী ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফেরির দুই পারে অসংখ্য গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও ফেরি চলাচল বন্ধ। ফেরির এক কর্মী বলেন, উপর থেকে নির্দেশ দিয়েছে দুইদিন ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে। ঢাকা-কাউখালী-হুলারহাট-ভান্ডারিয়া- স্বরূপকাঠি নৌ-রুটের সকল লঞ্চ কাউখালী লঞ্চ ঘাটে নোঙ্গর করে রেখেছে।
চৌদ্দগ্রামে গাড়িতে হামলা
সড়ক অবরোধ
চৌদ্দগ্রাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হরতালের সমর্থনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দত্তসার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও ১০-১২টি গাড়ী ভাংচুর করেছে পিকেটাররা। এ সময় তারা দীর্ঘক্ষণ সড়ক অবরোধ করে রাখে।
সীতাকুন্ডে হেফাজতের ১৫ গাড়ী
আটক ও দুটি ভাংচুর
সীথাকুন্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, লংমার্চে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম থেকে সকালে ছেড়ে আসা হেফাজতে ইসলামের ১০০০ গাড়ি সীতাকুন্ড উপজেলা অতিক্রম করেছে এবং বিকাল ৫টায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি কর্তৃক ঘোষিত হরতালের আওতায় কর্মীরা দারোগারহাট বাজারে ব্যারিকেড দিয়ে লংমার্চের ১৫টি গাড়ী আটকে দেয় এবং ৩টি গাড়ি ভাংচুর করে। পরে হেফাজতের কর্মীরা নেমে প্রতিরোধ গড়ে তুললে ঘাদানিকের কর্মীরা পালিয়ে যায় এবং গাড়িগুলো লংমার্চে রওনা হয়।সীতাকুন্ডে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
গাইবান্ধায় ৩০ নেতা-কর্মী আটক
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় গতকাল হানিফ এন্টারপ্রাইজের একটি বাসসহ হেফাজতে ইসলামের ৩০ নেতা-কর্মীকে পুলিশ আটক করেছে। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতরা বাসযোগে গাইবান্ধা থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। গাইবান্ধা-পলাশবাড়ি সড়কের গাইবান্ধা জেলা কারাগারের সামনে থেকে পুলিশ বাসটি আটক করে। পুলিশ সুপার এ কে এম নাহিদুল ইসলাম জানান, বাসের ভেতরে থাকা ৩০ জন হেফাজতে ইসলামের নামে জামায়াতে ইসলামের নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।
ভাণ্ডারিয়া থেকে যোগাযোগ বন্ধ
ভাণ্ডারিয়া সংবাদদাতা জানান, ভাণ্ডারিয়ায় গতকাল সকাল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে কোন বাস কিংবা লঞ্চ ছেড়ে যায়নি। এমনকি পিরোজপুর-বরিশাল বা পিরোজপুর-খুলনা রুটেও নিয়মিত বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন ভাবে ২/১ টি বাস বাগেরহাট-খুলনা পথে চলছে। অন্যদিকে ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহন গতকাল সকালে ভাণ্ডারিয়ায় এসে পৌঁছেছে। শুক্রবার ভাণ্ডারিয়া থেকে ঢাকাগামী কোন লঞ্চ ছাড়বে না বলে ভাণ্ডারিয়া লঞ্চ ঘাট সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও পরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল যানবাহন চলাচল না করায় হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে অনেকে যোগ দিতে পারেননি। অবশ্য তাদের কিছু সমর্থক বিচ্ছিন্ন ভাবে ভাঙ্গা পথে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
কুমিল্লা থেকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ
কুমিল্লা প্রতিনিধি ও সদর দক্ষিণ (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্নপথে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা লংমার্চে অংশ নিতে ঢাকায় গেছেন। গতকাল কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড থেকে তারা গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করেন। হেফাজতে ইসলামের কুমিল্লা মহানগর শাখার প্রচার সম্পাদক মাওলানা সুলতান আহমেদ জানান, পদুয়ার বাজার এলাকা থেকে জেলা শাখার সভাপতি আল্লামা নূরুল হকের নেতৃত্বে মহাসড়কের ১৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ময়নামতি (ক্যান্টনমেন্ট) এলাকায় পৌঁছে তারা বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে বিকাল সাড়ে ৫টায় মেঘনা সেতু পেরিয়েছেন। তিনি বলেন, পায়ে হেঁটে এবং কাভার্ডভ্যান, ছোট ট্রাক, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ছোট বাস, কোস্টারে করে ও বিভিন্ন যানবাহনে করে লংমার্চে যোগ দিতে রওনা করেছি।
নোয়াখালীতে সড়ক অবরোধ
চৌমুহনী সংবাদদাতা জানান, লংমার্চে অংশগ্রহণকারীরা শুক্রবার ২ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে। লংমার্চে অংশগ্রহণ করার জন্য শুক্রবার সকালে চৌমুহনী শহরের চৌরাস্তায় জড়ো হয়ে তাদের ভাড়া করা বাস না আসায় অন্য বাসে করে যেতে চায়। কিন্তু ঢাকাগামী অন্য বাসে তাদের নিতে অপারগতা প্রকাশ করলে হেফাজতের সমর্থকরা সকাল নয়টায় সড়কের ওপর বসে পড়ে। এ সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে জেলা ও উপজেলার কর্মকর্তাগণ এসে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকদের সাথে আলোচনা করে অন্য বাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিলে সকাল ১১টায় অবরোধ উঠিয়ে নেয়।
কিশোরগঞ্জ থেকে বাস চলাচল বন্ধ
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, কিশোরগঞ্জ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার সকল বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন মালিক-শ্রমিকরা। জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি হেলালউদ্দিন মানিক জানিয়েছেন, লংমার্চ এবং হরতালকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই দূরপাল্লার বাস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
যেতে পারছে না হবিগঞ্জের নেতাকর্মীরা
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গাড়ি না পাওয়ায় হবিগঞ্জ থেকে হেফাজতে ইসলাম নেতাকর্মীরা লংমার্চে যোগ দিতে ঢাকায় যেতে পারেননি। তবে হরতাল প্রত্যাহার না হলে আজ শনিবার সকাল থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শায়েস্তাগঞ্জ গোলচত্বরে তারা অবস্থান নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
নড়াইলে বাস চলাচল বন্ধ
নড়াইল প্রতিনিধি জানান, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চকে কেন্দ্র করে নড়াইল থেকে ঢাকাগামী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে বাস মালিকরা। হঠাত্ করে বাস বন্ধের ঘোষণায় জরুরি প্রয়োজনে ঢাকাগামী যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
ফেরিতে আটকা, পরে রওনা
ফেনী প্রতিনিধি ও পরশুরাম সংবাদদাতা জানান, ফেনী থেকে হেফাজতে ইসলামের ঢাকামুখী লংমার্চে ফেনী থেকে ৬টি বাস শুক্রবার দুপুরে ফেনীর মহিপাল টার্মিনাল থেকে ছেড়ে গেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী ৩৫-৪০টি বাস ও ১৫-১৬টি মাইক্রোবাস শুক্রবার দুপুরে ফেনীর মহিপাল এলাকা অতিক্রম করে। এ সময় স্থানীয় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা সে স্থান দিয়ে পার হওয়া নেতাকর্মীদের গাড়ি বহরের লোকজনকে খাবার পানি, বিস্কুট, ব্রেড, কলা, ফ্রুট জুস সরবরাহ করেন ও শ্লোগান দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সুনামগঞ্জে লংমার্চে যেতে পারেনি
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, পুলিশী বাধার মুখে লংমার্চে যেতে না পেরে সুনামগঞ্জের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে জেলা হেফাজতে ইসলাম। শুক্রবার সকাল ১১টায় স্থানীয় পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে অবস্থানকালে হেফাজতে ইসলাম তাদের আরো নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। শনিবার বেলা ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শহরের পুরাতন বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান ধর্মঘট পালন করবে।
দিনাজপুরে লংমার্চে বাধা
স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর জানান, বিকাল ৩টার দিকে ঢাকামুখী লংমার্চে দিনাজপুর থেকে ২টি বাস ছেড়ে যাবার সময় পুলিশের বাধার মুখে তা ভুণ্ডুল হয়ে যায়। হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দের সাথে পুলিশের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই তাদের ঘটনাস্থল থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেলস্টেশনে হামলা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় টিকেট দিতে দেরি হওয়ায় দুপুরে রেলস্টেশনে ভাঙচুর করেছে হেফাজতে ইসলাম সমর্থকরা। কয়েকশ কর্মী-সমর্থক রেলস্টেশনে হাজির হয়ে ঢাকা যাওয়ার টিকেটের জন্য লাইনে দাঁড়ায়। এ সময় টিকেট দিতে দেরি হওয়ায় এবং টিকেট না পেয়ে তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে টিকেট কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর এবং স্টেশন এলাকায় ভাঙচুর চালায়। এ সময় স্টেশনে উপস্থিত শত শত যাত্রীর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
ছাতকে হেফাজতের বিক্ষোভ
ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, লংমার্চে যেতে রাস্তায়-রাস্তায় পুলিশের বাধার প্রতিবাদে ছাতকে হেফাজতে ইসলাম বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে।
দিরাইয়ে পুলিশি বাধা
দিরাই সংবাদদাতা জানান, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে বাধা দিয়েছে থানা পুলিশ। পুলিশি বাধার মুখে লংমার্চে না যেতে পেরে থানা পয়েন্টে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে লংমার্চগামী নেতাকর্মীরা।
