কী ঘটবে আজ

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ২৩:০৯
ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অভিমুখী আজকের লংমার্চ এবং এই কর্মসূচি প্রতিহত করতে ২৫টি সংগঠনের চলমান হরতাল ও গণজাগরণ মঞ্চের অবরোধকে ঘিরে দেশব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে টানটান উত্তেজনা। জনমনে দেখা দিয়েছে শঙ্কা ও উত্কণ্ঠা। সবার একই প্রশ্ন-কী ঘটতে যাচ্ছে আজ ? লংমার্চ ও সমাবেশ কর্মসূচি কি শান্তিপূর্ণ হবে, নাকি ছড়িয়ে পড়বে সংঘাত-সংঘর্ষ ? কিংবা কর্মসূচিতে বাধা পেলে হেফাজতে ইসলামের পূর্ব হুমকি অনুযায়ী দেশ কী সত্যিই আগামীকাল রবিবার থেকে লাগাতার হরতালের কবলে পড়তে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের মনে। ইতিমধ্যে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আজ ঢাকায় আসতে যেখানেই বাধা দেয়া হবে, সেখানেই অবস্থান নেবেন তারা। দাবি আদায়ে এই অবস্থান চলতে থাকবে মাসের পর মাস, প্রয়োজনে বছর ধরে। জানা গেছে, লংমার্চের যাত্রা ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বাধা পেয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা সেখানেই অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। দূরপাল্লার সব যানবাহন বন্ধ হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ এবং এই কর্মসূচি প্রতিহত করার লক্ষ্যে ডাকা হরতাল ও সড়ক-নৌ-রেলপথ অবরোধের কারণে নিরাপত্তার শঙ্কায় গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই দূরপাল্লার সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। রাজধানীতে কোনো দূরপাল্লার বাস ঢুকছেও না, বেরও হচ্ছে না। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। হেফাজতে ইসলাম গতকাল ঢাকায় ও চট্টগ্রামে পৃথক সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করে বলেছে, লংমার্চ বানচাল করতেই যানবাহন বন্ধ করা হয়েছে। চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে চট্টগ্রামকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে গতকালও বলা হয়েছে, লংমার্চ শান্তিপূর্ণ হলে পুলিশ বাধা দেবে না, বরং লংমার্চ এবং মতিঝিলে সমাবেশ করতে হেফাজতে ইসলামকে পুলিশ সহযোগিতা করবে। মহানবী (সা.) ও ইসলাম অবমাননাকারী ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে আজ শনিবার চট্টগ্রামের হাটহাজারিসহ সারাদেশ থেকে ঢাকা অভিমুখী লংমার্চের ঘোষণা আরও আগেই দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এই লংমার্চ প্রতিরোধ এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সারাদেশে ২৪ ঘণ্টার হরতালের ডাক দিয়েছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ২৫টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন। একই দাবিতে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক-নৌ-রেলপথ অবরোধ এবং আজ বিকালে শাহবাগে সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম আগাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, আজকের হরতাল প্রত্যাহার করা না হলে কাল রবিবার থেকে তারা সারাদেশে লাগাতার হরতাল শুরু করবে। এদিকে লংমার্চকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই প্রায় সারাদেশে শুরু হয়েছে ধরপাকড়। হেফাজতে ইসলাম অভিযোগ করেছে, পথে-পথে তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বাধা দেয়া হচ্ছে। লংমার্চ ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির জের ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন সংঘাতও শুরু হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকার কামরাঙ্গিরচরে মাদ্রাসা ছাত্র, পুলিশ ও ছাত্রলীগের ত্রিমুখী সংঘর্ষে শহীদুল ইসলাম নামে একজন নিহত হয়েছেন। ঢাকায় আসার জন্য ট্রেনের টিকেট না পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে হামলা করেছে হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা। ‘যেখানে বাধা সেখানেই অবস্থান’ গতকাল বিকালে রাজধানীর লালবাগে জামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব জুনায়েদ বাবু নগরী বলেছেন, যেখানেই বাধা সেখানেই অবস্থান নেবেন তারা। এক মাস, দুই মাস নয়, দাবি আদায়ে প্রয়োজনে বছরব্যাপী তারা আন্দোলন করবেন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকার শাহবাগের ‘নাস্তিকবাদীদের’ পক্ষ নিয়ে দ্বিমুখী আচরণ করছে। আমরা আশা করেছিলাম সরকার আমাদের শান্তিপূর্ণ লংমার্চ কর্মসূচিতে সহযোগিতা করবে। কিন্তু আমরা দেখছি, এর উল্টোটা ঘটেছে। সরকার বাধা দিয়ে ‘মুনাফেকি’ আচরণ করছে। এই মুনাফেকির বিচার দেশের মানুষ একদিন করবে। হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির নূর হোসেন কাশেমী সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ করেন, ‘সরকারের ইঙ্গিতেই’ এ হরতাল ডাকা হয়েছে। তিনি দেশের তৌহিদী জনতাকে আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর মতিঝিলের সমাবেশে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। আজকের হরতাল প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বলব, আপনারা হরতাল প্রত্যাহার করুন। তা না হলে আমরা আরো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব। লংমার্চের জন্য গাড়ি দিতে পরিবহন মালিকদের কাছে দাবি জানিয়ে জুনায়েদ বাবু নগরী বলেন, হেফাজতে ইসলামের এই কর্মসূচিতে যারা গাড়ি দেবেন না, ভবিষ্যতে তাদের গাড়ি আর সড়কে চলতে দেয়া হবে না। ‘জামায়াত-শিবিরকে রক্ষার লংমার্চ’ অন্যদিকে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ও আজকের লংমার্চ প্রতিহত করার লক্ষ্যে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে মশাল মিছিল বের করে ২৪ ঘণ্টার হরতাল আহ্বানকারী অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্মিলিত সাংস্কৃতি জোট। মিছিল শেষে সমাবেশে জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়া হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা অভিমুখে লংমার্চের ডাক দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনকে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ প্রতিহত করার আহ্বান জানান তিনি। জোটের নেতারা অভিযোগ করেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করতে এবং জামায়াত-শিবিরকে রক্ষার জন্যই এই লংমার্চ । লংমার্চ প্রতিহতের ঘোষণা ওলামা-মাশায়েখদের সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে জামায়াত-শিবিরের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, লংমার্চ প্রতিহতের পাশাপাশি জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত। সরকার সমর্থিত ওলামা-মাশায়েখ ঐক্য পরিষদও গতকাল অভিযোগ করে বলেছে, ইসলাম রক্ষা নয়, জামায়াত-শিবিরকে রক্ষা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ, সরকারের বিরুদ্ধে অপতত্পরতা চালাতে এবং একটি দলকে ক্ষমতায় আনতেই হেফাজতে ইসলাম লংমার্চ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দু’পক্ষকেই সমাবেশের অনুমতি এদিকে ২৫টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন এবং গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিরোধের ঘোষণার মধ্যেই হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশকে আজ বেলা ১১টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। বৃহস্পতিবারই এই অনুমতি দেয়া হয়। একইসঙ্গে আজ দুপুরের পর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চকেও সমাবেশ করার অনুমতি দিয়েছে ডিএমপি। সমাবেশ সফল করতে দু’পক্ষই ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। হেফাজতের এক লাখ কর্মী ঢাকায়! হেফাজতে ইসলামের নেতা ও মতিঝিলের সমাবেশের সমন্বয়কারী মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ জানিয়েছেন, সমাবেশ সফল করতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু করে শুক্রবার দিনভর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তাদের প্রায় এক লাখ নেতা-কর্মী-সমর্থক ঢাকায় পৌঁছেছে। জানা গেছে, ঢাকায় আগত হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা বিভিন্ন মাদ্রাসা, আবাসিক হোটেল ও আত্মীয়-স্বজনের বাসায় অবস্থান নিয়েছেন। আজ সকাল থেকেই তারা মতিঝিলে জড়ো হবেন। এছাড়া লংমার্চের তিনদিন আগেই রাজধানীতে চলে এসেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মইনুল ইসলাম মাদ্রাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফি। বুধবার বিকালে চট্টগ্রাম থেকে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছান। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি-জামায়াতসহ ১৮ দলীয় জোট। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম শরিক এরশাদের জাতীয় পার্টিও লংমার্চে সমর্থন দিয়েছে। লংমার্চের সময় ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের খাবার পানি সরবরাহ করতে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নির্দেশ দিয়েছেন জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। এছাড়া পীরসাহেব চরমোনাইয়ের নেতৃত্বাধীন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ এবং লেখক, কবি ও গবেষক ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে সদ্য আত্মপ্রকাশ করা ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি’সহ ওলামা-মাশায়েখদের বিভিন্ন সংগঠন হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে। বিরোধী দলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরায় এক সমাবেশে বলেছেন, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে বাধা দেয়া হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। শান্তিপূর্ণভাবে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করতে দেয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ২৫টি সংগঠনের ডাকা হরতালে সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, গণঐক্য, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, পার্বত্য জনসংহতি সমিতি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)সহ বাম রাজনৈতিক দলগুলো। নাশকতার আশংকা:আজ মাঠে থাকবে আওয়ামী লীগ ২৫টি সংগঠন ও গণজাগরণ মঞ্চের কর্মসূচিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লংমার্চের সুযোগে কুচক্রি মহল নাশকতা চালাতে পারে বলে সন্দেহ করছে দলটি। লংমার্চ থেকে যেকোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ। বৃহস্পতিবার তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কাছে খবর এসেছে, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে জামায়াত ঢুকে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। তাই শনিবার তাদের নাশকতা ঠেকাতে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। জামায়াত-শিবির তাদের (হেফাজতে ইসলাম) কর্মসূচিতে অনুপ্রবেশ করে যাতে কোনো ধরনের নৈরাজ্য করতে না পারে, এর জন্য গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডে সভা করেছে আওয়ামী লীগ। আজকের লংমার্চ ঘিরে নাশকতার আশঙ্কা করছে সরকারও। বিষয়টি নিয়ে সরকারও দুশ্চিন্তায়। যেকোনো ধরনের নাশকতা মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও সীতাকুন্ডে গতকাল থেকেই বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে।