হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে গতকাল শনিবার বিকালে ২২ ঘন্টার অবরোধ সম্পন্ন করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। শাহবাগে হেফাজতের হামলা চেষ্টার নিন্দা জানিয়ে ভবিষ্যতে ‘প্রতিরোধ-প্রতিশোধের’ ঘোষণা দিয়েছে মঞ্চের নেতারা। আগামীকাল সোমবার হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতাল প্রত্যাখ্যান করে প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে মঞ্চ।
একইসাথে সকল যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন চারটি কর্মসূচি ঘোষণা করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আগামী ৮ এপ্রিল সকাল ১১টায় সারাদেশে হরতাল বিরোধী পতাকা মিছিল, ৯ এপ্রিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট, ১০ এপ্রিল সকাল ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ের সামনে ও ঢাকার বাইরে সকল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গণঅবস্থান এবং ১৪ এপ্রিল-পহেলা বৈশাখ বিকাল ৩টায় শাহবাগে মহাসমাবেশ। গতকাল শনিবার রাতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সমাবেশে ডা. ইমরান এইচ সরকার এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিকাল চারটায় মঞ্চের সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও হেফাজতে ইসলামের হামলা চেষ্টার কারণে সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় তা শুরু হয়।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার উদ্দেশ্যে সোমবার হরতাল ডেকেছে হেফাজতে ইসলাম। আমরা ঘৃণাভরে এ হরতাল প্রত্যাখ্যান করছি। সোমবার সকাল ১১টায় হরতালবিরোধী মিছিলে সর্বস্তরের জনগণকে অংশগ্রহণের আহবান জানাচ্ছি। দাবির পক্ষে ৯ এপ্রিলের ছাত্র ধর্মঘটের আওতামুক্ত থাকবেন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা।
ইমরান বলেন, যে বর্বর চেহারা ধারণ করে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পক্ষের শক্তি আবির্ভূত হয়েছে তরুণ-ছাত্র-জনতা তা প্রতিহত করবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরব না। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিরোধে জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহবান জানিয়েছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, ছাত্রনেতা বাপ্পাদিত্য বসু, সাইফুজ্জামান সাকন, শামসুল ইসলাম, হাসান তারেক, প্রবীর সাহা, আবদুর রউফ, সোহান সোবহান, মঞ্জুর রহমান দিপু প্রমুখ।
দুপুরে শাহবাগে মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ এবং জামায়াত-শিবিরের নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া বানচালের জন্য হেফাজতে ইসলাম মরিয়া হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এড়াতে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের প্রতিরোধে জনগণকে ব্রিগেড গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে সকলকে রাজপথে নেমে আসতে হবে।
ইমরান সাংবাদিকদের বলেন, “মহাখালীসহ বেশ কয়েকটা জায়গায় তারা (হেফাজতে ইসলাম) হামলার চেষ্টা করেছে, একটা সহিংস পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে। চট্টগ্রামেও তারা তলোয়ার নিয়ে অপেক্ষা করছে। বিভিন্ন সহিংস এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছে।”
তিনি বলেন, এভাবে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করে দেশকে অস্থিতিশীলতার মধ্যে দিয়ে যুদ্ধাপরাধের চলমান বিচার প্রক্রিয়া এবং জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া বানচাল করে দেয়াই হেফাজতে ইসলামের মূল উদ্দেশ্য।
ইমরান বলেন, “তারা যেকোনো ভাবেই হোক যেকোনো মূল্যেই হোক একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সেখান থেকে ফায়দা নিতে চাচ্ছে। আমার মনে হয় খুব কঠোর হস্তে এটা দমন করতে হবে। যেকোনো মূল্যেই হোক এদেরকে প্রতিহত করতে হবে।”
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র বলেন, “দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষ আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নিজেরাই স্বত:স্ফূর্তভাবে এই অবরোধ কর্মসূচি পালন করছেন।” তবে সরেজমিন ঘুরে শাহবাগ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য অবরোধ পয়েন্টগুলোতে ঘোষিত অস্থায়ী মঞ্চ দেখা যায়নি।
এর আগে গতকাল শনিবার বিকালে হেফাজতে ইসলাম শাহবাগে হামলার চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করে মঞ্চের কর্মীরা। এছাড়া দুপুরে মত্স্য ভবনের সামনে হেফাজতের কর্মীরা হামলার চেষ্টা করতে পারে এমন সংবাদে সেখানে মিছিল নিয়ে যান মঞ্চের কর্মীদের একাংশ। তারা সেখানে অবস্থান নেন। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় শাহবাগে শুরু হওয়া সড়ক অবরোধ চলে রাত পর্যন্ত।
ইমরান মতিঝিলে হেফাজতের সমাবেশকে লক্ষ্য করে বলেন, আজ শাপলা চত্বরে লকলকে জিহবা বের করে যে শ্বাপদেরা বক্তব্য দিয়েছে, তার প্রতিটি অংশই রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। অথচ এখনও মনে হয় প্রশাসনের ঘুম ভাঙে নি। গণজাগরণ মঞ্চ দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছে- আমাদের আন্দোলন চলছে, চলবেই। কোনো হায়েনা হেফাজতির আষ্ফালনে আমরা ভীত নই। আমাদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আছে, আমাদের সাথে আছেন বাংলার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপন্থী সকল মানুষ। আপনারা জানেন, আগামী ৮ এপ্রিল হেফাজতি ইসলামের মতো কুখ্যাত দল বিএনপি-রাজাকারের সহযোগিতায় হরতাল ডেকেছে। এই অবৈধ অন্যায় হরতাল বাঙালি মানে না, কোনোদিন মানবেও না। যে কীটপতঙ্গরা আমাদের জাতীয় পতাকা সম্বন্ধে অবমাননাকর বক্তব্য দিয়েছে, তাদের হরতাল বাঙালি কোনোদিন মানে না, মানবে না।
সরকারের উদ্দেশ্যে ইমরান বলেন, কুলাঙ্গারেরা শাপলা চত্বরের সমাবেশ থেকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের জাতীয় পতাকা ও আমাদের জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে যে কটূক্তি করেছে, সমাবেশের অনুমতি দিয়ে সেটা করার সুযোগ করে দিয়েছেন আপনারা। তাদের ১৩ দফা দাবি, স্পষ্টতই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। এই হায়না শক্তিকে আপনারা আইনের মাধ্যমে দমন করুন।
তিনি বলেন, সোমবার সকাল এগারোটায় সারা বাংলাদেশে হরতাল প্রতিরোধে পতাকা মিছিলের ঘোষণা দিচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চ। আমাদের প্রাণের পতাকাকে অপমান করেছে এই হায়েনা গোষ্ঠী। আমরা জাতীয় পতাকা নিয়ে সোমবারের অবৈধ হরতালকে প্রতিরোধ করবোই। দেশের সকল মানুষের প্রতি আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনারা জাতীয় পতাকা নিয়ে হরতাল বিরোধী মিছিল করে যার যার এলাকার শহিদ মিনারে যাবেন। আমাদের জাতীয় পতাকা, আমাদের প্রাণের মিনার শহিদ মিনারকে আমরাই অক্ষুণ্ন রাখবো, আমরাই তার মর্যাদাকে সুসংহত করবো।
ইমরান বলেন, বাংলার প্রতিটি মানুষকে অনুরোধ করছি, আপনারা আপনাদের ঘরে জাতীয় পতাকা রাখবেন। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা সংবিধান সম্মতভাবে নিজ নিজ বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবেন এবং যথাযথ সম্মানের সঙ্গে সূর্যাস্তের সময় নামিয়ে নেবেন।
