রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে হেফাজতে ইসলামের ‘হামলার চেষ্টা’ প্রতিহত করে দিয়েছেন মঞ্চের কর্মীরা। এ সময় দুই পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে গতকাল বিকালে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজধানীর রমনা পার্ক এলাকা। এ ঘটনায় অন্তত ১৩ জন আহত এবং ১২ জন আটক হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ প্রচুর রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং পুলিশ সূত্র জানায়, মতিঝিলে সমাবেশ শেষে গতকাল শনিবার বিকাল সোয়া ৫টার দিকে হেফাজতে ইসলামের প্রায় দুই শতাধিক কর্মী একটি মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে এগিয়ে যান। মিছিলটি প্রথমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে শাহবাগে যাওয়ার চেষ্টা করে। সে সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া করেন। তাদের ধাওয়ায় হেফাজতের অন্তত ৫ কর্মী আহত হন। এরপর হেফাজত কর্মীরা মত্স্য ভবনের সামনের সড়ক দিয়ে শাহবাগের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন। সংবাদ পেয়ে তাদের প্রতিহত করতে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা লাঠি নিয়ে মত্স্য ভবন ও রমনার দিকে এগিয়ে যান। ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রলীগ কর্মীরাও সেখানে যান। এ সময় হেফাজত কর্মী-পুলিশ-ছাত্রলীগ-মঞ্চের কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রচুর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষের সময় গুলির শব্দও শোনা যায়। এ সময় অন্তত আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হেফাজতের কর্মীরা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী বিদ্যুেক বেদম মারধর করে।
একই সময় পুলিশের বাধা অতিক্রম করে হেফাজতের কর্মীরা রমনা পার্কের লোহার বেষ্টনি ভেঙ্গে পার্কের ভিতরে প্রবেশ করেন। তারা শাহবাগের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের প্রতিহত করতে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরাও শিশু পার্কের সামনে রমনা পার্কের অস্তাচল গেটের তালা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করেন। সেখানে হেফাজতের কর্মীদের ধাওয়া দেন মঞ্চের কর্মীরা। তখন অনেকেই পার্কের রূপসী বাংলা সংলগ্ন সড়ক দিয়ে পালিয়ে যান। তাদের আরেকটি অংশ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। শাহবাগে জনতার দৌড়াদৌড়িতে আহত হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক আফসার আহমদ।
সাড়ে ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত পার্কের ভিতর থেকে প্রায় সাতজনকে পিটিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেন মঞ্চের কর্মীরা। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে শিবির সন্দেহে ৫ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এ প্রসঙ্গে গতকাল সন্ধ্যায় রমনা জোনের পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হাসান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছুঁড়েছে পুলিশ। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুরো পার্ক তল্লাশি করেছি। ছাত্রশিবির সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়াও বেশ কয়েকজনকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। কয়েকজন আহতও হয়েছেন। আহত ও আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম বলেন, বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। রাতে জিজ্ঞাসাবাদ করে মামলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে হেফাজতের হামলা-চেষ্টার খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বের হয়ে আসেন। তারা জামায়াত-শিবির ও হেফাজতের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমবেত হন। ছাত্রলীগের কেন্দ ীয়-বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল শাখার নেতারা এসব মিছিল-সমাবেশে নেতৃত্ব দেন।
‘হামলা হলে বসে থাকবো না’
বিকাল ৫টার দিকে ২২ ঘন্টার অবরোধ শেষে গণজাগরণ মঞ্চে সমাবেশ শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু সংঘর্ষের কারণে সমবেত জনতার একাংশের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তারা দিগবিদিক ছুটতে থাকেন। এসময় বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মূল মঞ্চে উঠে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা শান্ত হোন। আমরা শান্তিপূর্ণ ছিলাম, শান্তিপূর্ণ থাকবো। তবে আমাদের উপর হামলা হলে আমরা বসে থাকবো না। প্রতিহত করব।’ তিনি বলেন, ‘মঞ্চের কেউ একা কোথাও যাবেন না। যেখানেই যাবেন অন্তত বিশ জন যাবেন। লাঠি নিয়ে বের হবেন। ২০ জন করে ব্রিগেড তৈরি করুন। মুক্তিযুদ্ধের মত লড়াই-প্রতিরোধ-সংগ্রাম গড়ে তুলুন।’ জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আপনারা এই দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিন। রাজপথে নেমে আসুন।’
এদিকে হেফাজতের আড়ালে জামায়াত-শিবির শাহবাগে হামলার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন মঞ্চের একাধিক কর্মী। গতকাল আটক ও আহতরা জামায়াত-শিবির কর্মী বলে তারা দাবি করেছেন। তবে আহত হেফাজতের এক কর্মী সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তারা শাহবাগে আক্রমণ করতে নয়, মতিঝিলের সমাবেশে অংশগ্রহণ শেষে গন্তব্যস্থলে যাচ্ছিলেন। হাতে লাঠি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে ঐ কর্মী নিশ্চুপ থাকেন।
হেফাজতের লং মার্চের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শাহবাগ অবরোধ করে রাখে গণজাগরণ মঞ্চ। ঐ সড়ক দিয়ে কোনো যান চলাচল করেনি। আন্দোলনরতরা হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে এবং যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিসহ ছয় দফা দাবিতে অবিরাম স্লোগান দেন। বিকালে সংঘর্ষের পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে লাঠি মিছিল নিয়ে শাহবাগে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তারাও হেফাজত প্রতিরোধে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে স্লোগান দেন।
