একটি ছোট্ট মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি ভারি আগ্রহ। কিন্তু সে সময় সমাজে মেয়েদের ঘরের মধ্যে থেকে ধর্মশিক্ষা ছাড়া বাংলা বলো, ইংরেজি বলো কোন কিছুই শেখা নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু মেয়েটি দমবার পাত্রী নন।
বড় ভাই ইব্রাহিম সাবেরের সহযোগিতায় গভীর রাতে মোমের আলোতে পড়তে থাকেন। যখন বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলো, তখন সমাজপতিদের বিরোধিতার চাপে মেয়েটির পিতা বড়ই চিন্তিত হলেন। কারণ তিনি চান মেয়েটি লেখাপড়া করুক। এই মেয়েটি হলো রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামের জমিদার জহিরউদ্দিন মুহম্মদ আবু আলী সাবেরের কন্যা বেগম রোকেয়া। জন্ম ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮০। বেগম রোকেয়ার পিতা বিনয়ী এবং শিক্ষানুরাগী ছিলেন। সমাজপতিদের চাপেই তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা করিমুন্নেসার লেখাপড়া বন্ধ করে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। তিনি আর এমনটি করতে চাইলেন না। তাই পুত্রদের সাথে পরামর্শ করে বেগম রোকেয়ার বিয়ে দিলেন। জমিদার কন্যার জন্য জমিদার পুত্র নয়, বরং বিহারের এক দরিদ্র অথচ মেধাবী, উচ্চশিক্ষিত, অবাঙালি পাত্রকেই নির্বাচন করা হলো। পাত্র বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। সাখাওয়াত্ হোসেনের প্রথমা স্ত্রী একটি সন্তান রেখে মারা যান। বেগম রোকেয়া তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। বিয়ের পর বিহারে স্বামীর কর্মস্থলে থেকে উর্দু ভাষা রপ্ত করেন। এমন আদর্শবান এবং শিক্ষানুরাগী স্বামী পেয়ে বেগম রোকেয়ার শিক্ষার সুপ্তবাসনা ক্রমেই উজ্জীবিত হতে থাকলো।
স্বামীর সাহচর্য, অনুপ্রেরণা বেগম রোকেয়ার জীবনে বয়ে আনলো আশীর্বাদ। সাখাওয়াত্ হোসেন বিভিন্ন ধরণের ইংরেজি বই এবং পত্রপত্রিকা এনে দিতেন। অধ্যবসায় আর অনুশীলনের মাধ্যমে বেগম রোকেয়া শিখে ফেলেন ইংরেজি এবং উর্দু ভাষা। আর বাংলা ভাষায় চললো তাঁর সাহিত্য সাধনা। প্রথম পক্ষের কন্যাটিকে মায়ের মমতায় লালন পালন করে একসময় সত্পাত্রের হাতে তুলে দিলেন। একাকীত্ব ভুলতে আরো বেশি করে মনোনিবেশ করেন সাহিত্য-চর্চায়। লিখতে থাকেন প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা। বেগম রোকেয়া নিজের সমাজ-সংস্কার-জীবন অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেছিলেন - নারী শিক্ষাই নারীর মুক্তির পথকে প্রশস্ত করতে পারে। অবরোধবাসিনী নারীকে নানারকম সংস্কারের শৃঙ্খলে বন্দী করে রাখা হয় গৃহকোণে। ‘আমাদের অবনতি’ প্রবন্ধে বলেছেন- “শিশুর জন্য পিতা এবং মাতা উভয়েরই সমান দরকার।” “সুলতানা’স ড্রিম” নামে ইংরেজি গ্রন্থ লিখেছিলেন। পরে এটি অনুবাদ করে এর নাম দেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’। মতিচূর, অবরোধবাসিনী, পদ্মরাগ প্রভৃতি উপন্যাস লিখেছেন। ইংরেজি এবং উর্দু ভাষার কিছু রচনাও অনুবাদ করেছেন তিনি। আজ আমরা মেয়েরা লেখাপড়া শিখতে পাচ্ছি, সর্বক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করে যাচ্ছি। এসবের জন্য আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় সেই মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেন। নারী-শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আইনগত প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে অনেক অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নারীশিক্ষার প্রয়াসে ‘সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করলেন। কলকাতায় ‘সাখাওয়াত্ মেমোরিয়াল স্কুল’ (১৯১১) প্রতিষ্ঠা করলেন। স্কুলটি সমাজের গণ্যমান্য মনীষীর সহযোগিতায় সরকারি মঞ্জুরি লাভ করে। এই মহীয়সী নারী ১৯৩২ এর ৯ ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
