নববর্ষের সকালে পান্তা-ইলিশ দিয়ে সকালের খাবার সেরে ছেলেরা পাঞ্জাবী আর মেয়েরা শাড়ি পরে বেরিয়ে পড়ে। রমনার বটমূল-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে সারাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে চলে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার নানা আয়োজন। আর এই আয়োজনের মূল দায়িত্বে থাকে নারীরা। নতুন বছর নব আনন্দ নিয়ে হাজির হয় প্রতিটি বাঙালি পরিবারে।
বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস হাজার বছরের। সমৃদ্ধ এই সংস্কৃতির সাথে বর্ষবরণ উত্সব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্ষবরণ উত্সব কবে থেকে কীভাবে শুরু হয়েছে তা নিয়ে বিভিন্ন মত এবং ঘটনা জানা যায়। এর মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত একটি ধারণা হলো মুঘল সম্রাট আকবর প্রথম বঙ্গাব্দের প্রচলন করেন। সম্রাট আকবরের সময় রাজকার্যে সেই সময় হিজরী সনের প্রবর্তন ছিল। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরও হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করা হতো। হিজরী সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল থাকায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। যার ফলে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। সুষ্ঠুভাবে খাজনা আদায়ের লক্ষ্যেই মুঘল সম্রাট আকবর সেই সময় এলাহি সনের প্রচলন করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবী হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন সনের নিয়ম নির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে নতুন সন গণনা শুরু হয়। এলাহি সন হলেও প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে এটি বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। ১৫৫৬ সালে হিজরি সন ছিল ৯৬৩। বাংলা সনও তখন ৯৬৩ থেকে যাত্রা শুরু করে। বঙ্গাব্দ শুরু হলেও এখন যেভাবে মাসের সাতটি দিন প্রচলিত তখন তেমনটা ছিল না। সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রত্যেকটি দিনের জন্য পৃথক নাম ছিল। পরবর্তীতে সম্রাট শাহজাহান একজন বিদেশি পন্ডিতের সাহায্য নিয়ে সাপ্তাহিক পদ্ধতিতে দিনের নামকরণ পদ্ধতির প্রচলন করেন। বঙ্গাব্দের সাথে খ্রিষ্টীয় সনের দিন-তারিখের পার্থক্যের কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে উভয় সন গণনায় সমস্যা হতো। এজন্য ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীর তত্ত্বাবধায়নে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪ এপ্রিলকে স্থায়ীভাবে বাংলা নববর্ষ শুরুর দিন হিসাবে ঠিক করা হয়। আবার বিভিন্ন নক্ষত্রের নাম থেকে বাংলা সনের মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রাইহন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনি থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ হয়েছে।
বাঙালিদের বর্ষবরণের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের ঐতিহ্য একইসাথে সমৃদ্ধ এবং পুরাতন। বিজু, বৈসু ও সাংগ্রাই উত্সবে মুখর চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়ি লোকালয়। আদিবাসীদের মধ্যে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই আর ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ বৈসু উত্সবে ব্যস্ত থাকে এ সময়টায়। পাহাড়ি-বাঙালি সংঘাত নয়, সম্প্রীতির বন্ধন চিরস্থায়ী করতে প্রতিবছর পার্বত্য জেলাগুলোয় চলে উত্সবের আমেজ। আমেজ দেখলে মনে হবে যেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এ সবকিছুই সবার প্রাণের উত্সব। আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উত্সবকে ঘিরে প্রতিবছরের আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলায় পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ঐতিহ্য তুলে ধরাই এ মেলার উদ্দেশ্য। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে বিজু উত্সবের সময় রাঙামাটিতে এই আদিবাসী মেলা উদযাপিত হয়ে আসছে। আদিবাসীদের এসব উত্সবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাঙালিরাও সানন্দে অংশগ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যদিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে সামাজিক বন্ধন পোক্ত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস। একেক সম্প্রদায়ের লোকজন বৈসাবিকে একক নামে এবং ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক ও অনুষ্ঠানমালার মধ্যদিয়ে পালন করে থাকে। চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন চৈত্রের শেষ দু’দিন আর পহেলা বৈশাখ এই তিনদিন মহাসমারোহে বিজু উত্সব পালন করে থাকে। চাকমাদের মতে, প্রতিবছরই একটি পাখির ‘বিজু বিজু’ ডাক সবাইকে ‘বিজু’ উত্সবের আগমনী বার্তা জানিয়ে দিয়ে যায়। এরপর থেকে তারা বিজু উত্সবের প্রস্তুতি নেয়। তারা প্রথমদিনকে ‘ফুল বিজু’, দ্বিতীয় দিনকে ‘মূল বিজু’ এবং তৃতীয় দিনকে ‘গোজ্যা পোজ্যা’ দিন হিসেবে পালন করে। এদিন তারা সব ধরনের প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকে। ‘বিজু’কে ঘিরে চাকমাদের প্রতিটি বাড়িতে পাহাড়ি মদ তৈরি করা হয়। চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন চৈত্রের শেষ দিনকে ‘মূল বিজু’ হিসেবে পালন করে। এই দিনই ‘বিজু’ উসবের প্রধান দিন হিসেবে পালিত হয়। নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাত্ পহেলা বৈশাখকে চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন ‘গোজ্যা পোজ্যা’ অর্থাত্ আরামে গড়াগড়ি খাওয়ার দিন হিসেবে পালন করে। তাদের বিশ্বাস, বছরের প্রথম দিনটি ভালো খাওয়া-দাওয়া করে হাসি-গল্পে কাটাতে পারলে বাকি দিনগুলো ঠিক একইভাবে কাটানো যাবে। মারমা সম্প্রদায়ের লোকজন চারদিন ধরে সাংগ্রাই উত্সব পালন করে। পুরনো বছরের শেষ দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনই সাংগ্রাই উত্সবের দিন হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। পরের দু’দিন মারমা সম্প্রদায়ের জনপদে হয় আনন্দের বন্য। ওই দু’দিন মারমা সম্প্রদায়ের পাড়ায় পাড়ায় চলে ‘জল’ উত্সব। একে অপরের গায়ে ‘জল’ ছিটিয়ে পুরনো বছরের ব্যর্থতা, গ্লানি ও দুঃখকে ধুয়ে-মুছে ফেলতে চায়। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন ‘বৈসু’ উত্সবের মাধ্যমে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। এ উত্সবে হাসি-আনন্দ আর নাচ-গানের পাশাপাশি শিবের আশীর্বাদ কামনা করা হয়। পাহাড়ি-বাঙালি সবাই কামনা করে পুরনো বছরের গ্লানি, ব্যর্থতা, হিংসা-বিদ্বেষ মুছে নতুন বছর হোক ভালোবাসা, সাফল্য আর সম্প্রীতির আনন্দ-আশ্রম। এই আদিবাসীরা আমাদের সহযাত্রী, আমরা সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এক মৈত্রীয় সুদৃঢ় বন্ধনে আমাদের বসবাস। এখানেই আমাদের ঐক্যের শক্তি, সমৃদ্ধির সোপান। এ ঐক্য বজায় রাখা সমাজের জন্য সামগ্রিকভাবে খুবই ইতিবাচক।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নববর্ষ পালনের রীতিনীতি কিন্তু এক নয়। কিছু কিছু মিল থাকলেও নববর্ষের অনুষ্ঠানের সঙ্গে যোগ হয় দেশীয় ঐতিহ্য। নববর্ষের কিছু প্রথা আছে অবাক করা এবং বেশ মজার। যেমন থাইল্যান্ডে একজন আরেকজনের গায়ে পানি ছিটিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানায়। স্পেনে রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২টা আঙ্গুর খেয়ে নববর্ষের প্রথম ক্ষণটি উদযাপন করা হয়। আর্জেন্টিনায় নববর্ষের আগের দিন রাত্রে পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসে আহার করে। তারপর বড়রা নাচের অনুষ্ঠানে চলে যায়। ভোর পর্যন্ত চলে এ নাচের অনুষ্ঠান। নববর্ষের প্রথম দিন নদী বা পুকুরে সাঁতার কেটে তারা নববর্ষ উদযাপন করে। আবার ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো সমুদ্র সৈকতে নববর্ষের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হয়। এর অন্যতম আকর্ষণ চোখ ধাঁধানো আতশবাজির প্রদর্শনী। এদিন অধিকাংশ লোকই সাদা পোশাক পরিধান করে। সমুদ্রে সাতটি ডুব দিলে এবং সাতটি ফুল ছুঁড়ে দিয়ে তারা মনে করে বছরটি খুব ভালো কাটবে। প্রতিবছর এ উত্সবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় দুই মিলিয়ন পর্যটক যোগ দেয়। কোরিয়াতে নববর্ষ শুরুর সময় কেউ ঘুমায় না। এ সময় ঘুমালে নাকি চোখের ভ্রূ সাদা হয়ে যায়! রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে টিভিতে ৩৩ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। কোরিয়ার ৩৩ বীরের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এটি করা হয়। কোরিয়াতে প্রায় সবাই সূর্যোদয় দেখে। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার সময় একজন আরেকজনকে শুভেচ্ছা জানায়। মেক্সিকোতেও ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এ সময় প্রতি ঘণ্টা ধ্বনির সঙ্গে একটি করে আঙ্গুর খাওয়া হয়। তারা বিশ্বাস করে এ সময় যা কামনা করা হয় তাই পূরণ হয়। ভিয়েতনামে ভোর হওয়ার সময় প্রতি নববর্ষে সবাই গুরুজনদের কাছে দীর্ঘায়ু কামনা করে আশীর্বাদ নেয়।
আধুনিককালে নববর্ষ প্রথম উদযাপনের খবর পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি। কলকাতায় শুধু পহেলা বৈশাখ নয়, পুরো বৈশাখকে বিবাহের জন্য উপযুক্ত ভাবা হয়। কাজেই মাসজুড়ে নতুন পোশাক পরা, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া লেগেই থাকে। আগের বছরের শেষ মাসে, অর্থাত্ চৈত্র মাসের শেষ দিনগুলোতে পোশাকের দোকানগুলোতে অনেক মূল্যছাড় দেয়া হয়। কোন কোন স্থানে আয়োজিত হয় চৈত্রমাসের বিক্রি উত্সব।
