নানী দাদীদের মুখে প্রবাদ শুনেছি, ‘বাঘে আর মহিষে একঘাটে জল খায় না, তেমনি তেল আর জলও খাপ খেতে পারে না’। কিন্তু সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কথাটি ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। কারণ সব জিনিসকেই খাপ খাওয়ানো বা একত্রিত করা সম্ভব যদি তা সঠিক পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা যায়। গ্রীষ্মের তাপদাহ, কাঠফাটা রোদে খাল বিল আর নদীর পানি শুকিয়ে মাঠ- ঘাট ফেটে চৌচির, যখন এক ফোটা বৃষ্টির জন্য কৃষাণ কৃষাণী থেকে শুরু করে ছেলে বুড়ো সকলেই তীর্থের কাকের ন্যায় আকাশপানে তাকিয়ে থাকে ঠিক তখনই আগমনী বার্তা নিয়ে আসে বাংলা মায়ের অশান্ত কন্যা পহেলা বৈশাখ। যা বাঙালির প্রাণের নববর্ষ নামে পরিচিত। প্রথম বৈশাখের সকালে পান্তা ভাতের সঙ্গে এক টুকরো ইলিশ যেন বাঙালির রসনা বিলাসের অপরিহার্য অংশ হলেও তা এখন আর শুধুমাত্র বাঙালিদের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের দেশে বাস করছেন এমন বিদেশিরাও বাঙালির সাথে মিলেমিশে উদযাপন করেন বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে। উজবেকিস্তানের ড. মাভলুদা বালা এবং রাশিয়ান নাতালিয়া ডিমিনা জানান তাদের বাঙালিয়ানার কথা—
ড. মাভলুদা বালা
উজবেকিস্তানের নাগরিক
ড. মাভলুদা বালা একজন পেশাদারী ডাক্তার। উজবেকিস্তানের একটি হাসপাতালে বুয়েট বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. সুজিত কুমার বালার সাথে চিকিত্সাধীন অবস্থায় পরিচয় ঘটে। এরপর পরিনয়। পরবর্তীতে একমাত্র ভালবাসার টানে নিজ দেশ ছেড়ে স্বামীর হাত ধরে কয়েক হাজার মাইল পথ পারি দিয়ে চলে আসে বাংলার বধূ হয়ে। প্রথম অবস্থায় এদেশের খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে বাংলা ভাষায় কথা বলাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিলেও তার বউসোহাগী শাশুড়ী মায়ের স্নেহ ভালবাসা আর অক্লান্ত চেষ্টার ফলে সবাইকে চমকে দিয়ে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই ড. মাভলুদা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পেরে পরিবারের সকলের মধ্যেমনি হতে পেরেছিলেন। তিনি শ্বশুর, শাশুড়ি ও স্বামী সন্তান নিয়ে একত্রে বা যৌথভাবে থাকতে ভালবাসেন। তিনি কতটা অল্প সময়ে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করতে পেরেছেন তার বাস্তব প্রমাণ মিলেছে তার একমাত্র নাতীর প্রতি নানী প্রীতি দেখে। তার মতে এদেশের সংস্কৃতি আর উজবেকিস্তানের সংস্কৃতির অনেকাংশে মিল রয়েছে, যেমন দুটো দেশেই যৌথ পরিবার প্রথা বিদ্যমান। এছাড়া ড. মাভলুদা কখনোই তার সন্তানদেরকে তার নিজ দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে তেমন উত্সাহ দেন না, কারণ ওরা যেহেতু বাঙালি ঘরের সন্তান তাই বাংলাদেশের সংস্কৃতিকেই ওদের মনে প্রাণে ধারণ করা শ্রেয়। এছাড়া বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে সব ধরনের পালা, পার্বন ও আচার অনুষ্ঠানে পরিবারের সকলের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। পহেলা বৈশাখ বরাবর’ই তার কাছে একটি চমত্কার উত্সব হিসেবে পরিচিত, যে দিন থেকে তিনি এই বিশেষ দিনটিকে বুঝতে শিখেছেন। এছাড়া পহেলা বৈশাখ নিয়ে তার একটি চমত্কার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এটি ছিল তার জীবনের প্রথম পহেলা বৈশাখ। সকলে মিলে একত্রে খেতে বসে তার চক্ষু তো প্রায় চড়ক গাছ হয়ে উঠেছে, পানি দেয়া ভাত, তার সাথে লম্বা লম্বা লাল মরিচ আর ইলিশ ভাজা। খাওয়ার পূর্বে সকলে মজা করে বলেছিল যে এটা ঝাল মরিচ না, ক্যাপসিক্যাম জাতীয় মিষ্টি মরিচ, যেই কথা সেই কাজ, পুরো মরিচটাই ভাতে মেখে খেয়ে ঝালে নাকের আর চোখের জল মিলেমিসে একাকার অবস্থা। এই বছর ড. মাভলুদা বৈশাখটাকে ছেলে, মেয়ে, নাতী আর বিয়াই- বিয়ানদের নিয়ে একটু আলাদা ভাবে উত্যাপন করার প্রস্তুতি স্বরূপ ইতিমধ্যে তার শাড়ি- চুড়ি থেকে শুরু করে সকল বৈশাখী উপকরণ দিয়ে যেন বৈশাখকে বরণ করার বরণ ডালার পসরা সাজিয়ে রেখেছেন।
----
নাতালিয়া ডিমিনা
রাশিয়ান নাগরিক
পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন বর্তমান রাশিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন নাতালিয়া ডিমিনা। ইকোনোমিক্যাল ইনস্টিটিউট অফ মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন শেষে ভালবেসে বিয়ে করেন ঐ দেশীয় নাগরিক ‘আলেকজান্ডার পি. ডিমিন কে, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থিত রাশিয়ান কালচারাল ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বহী পরিচালক। স্বামীর চাকরির সুবাদে প্রায় দেড় বছর যাবত্ বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছেন নাতালিয়া। দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে ছেলে তাদের সাথেই থাকেন। নাতালিয়া এবং তার স্বামী দুজনেই আলাদা পরিবার পছন্দ করেন। কারণ সকলের একটি ব্যক্তিগত ভিন্ন জগত্ রয়েছে। তবে নাতালিয়া মাত্র অল্প দিনের ভেতরে এদেশের সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠানকে অনেকটা আত্মস্থ করতে পেরেছেন। কারণ এদেশের সংগীত, নৃত্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংস্কৃতি বিষয়কে তিনি আলাদা ভাবে সন্মান ও গুরুত্ব দেন। অবসরে পিয়ানো বাজাতে ও গান শুনতে পছন্দ করেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের মেয়েদের দিয়ে অত্যন্ত সফলভাবে রাশিয়ান নৃত্যানুষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন নাতালিয়া। প্রথমত নিজ সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়ার পাশাপাশি এদেশের সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদা দেন তিনি, কারণ এদেশের গানের সাথে রাশিয়ান গানের অনেকাংশে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই দেড় বছরে কিছু কিছু বাংলা শিখতে পেরেছেন নাতালিয়া, তার মতে বাংলা ভাষা শেখার জন্য অনেক ধৈর্যের প্রয়োজন। এদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিয়ে থেকে শুরু করে নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার, যা সম্ভব হয়েছে একমাত্র বাঙালিদের আন্তরিকতার ফলে। তবে পহেলা বৈশাখের পান্তা ইলিশের ব্যাপারে একটু বৈচিত্র্যতাবোধ রয়েছে তার, এক বেলার রান্না করা ভাত অন্য বেলায় পানি দিয়ে, মরিচ, এবং ইলিশ ভাজা দিয়ে খাওয়া যেটা তিনি একমাত্র বাংলাদেশেই প্রথম লক্ষ্য করেছেন। তবে এই একটি বিশেষ দিনে বিশেষ জায়গায় লালপাড়ের সাদাশাড়ি আর লাল কাঁচের চুড়ির সাথে গালে আল্পনা একে খুব আনন্দ ও উত্সাহের সাথে দিনটিকে বরণ করা যেন একটি আলাদা ও ভিন্ন অভিজ্ঞতার বিষয়। যদিও নাতালিয়া খুব ভালভাবে শাড়ি পরতে পারেন না তবে, এই বারের পহেলা বৈশাখের আনন্দকে তিনি কোনভাবে হাত ছাড়া করতে নারাজ। এ বছরের বৈশাখে স্বামী, ছেলে ও বাঙালি বন্ধুদের নিয়ে খুব আনন্দসহকারে পালন করার অভিপ্রায় রয়েছে নাতালিয়ার।
