কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ

ওরা ক’জনা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২৮
বাংলাদেশে বেসরকারি পর্যায়ে যেসব মেডিক্যাল কলেজ গড়ে উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হচ্ছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত দানবীর হিসেবে যিনি পরিচিত তার প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। বিদেশি ছাত্রীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাস। এ যেন বিদেশি ছাত্রীদের জন্য ডাক্তার হওয়ার অন্যরকম এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রায় শতাধিক বিদেশি ছাত্রী কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পড়াশোনা করছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। এই মেডিক্যাল কলেজে মেয়েরাই মেডিক্যাল পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। কুমুদিনী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, দানবীর রনদা প্রসাদ সাহা রায় বাহাদুর ১৯৩৮ সালে ৭৫০ শয্যাবিশিষ্ট্য মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেখানে বিনা খরচে রোগীরা চিকিত্সা সেবা পেয়ে আসছে। তার স্বপ্ন ছিল মেয়েদের জন্য একটি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তুলবেন। কিন্তু মহান এই মানুষের সে আশা পূরণ হতে দেয়নি ১৯৭১ সালের ঘাতক আল-বদর রাজাকার বাহিনী। ১৯৭১ সালের ৭ মে রনদা প্রসাদ সাহা এবং তার একমাত্র পুত্র রবিকে ঘাতকরা ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। ফলে দানবীরের সে স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। দীর্ঘদিন পরে হলেও তার উত্তরসূরী একমাত্র নাতী রাজিব প্রসাদ সাহার অক্লান্ত শ্রম এবং দাদুর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করে ২০০০ সালে একই ক্যাম্পাসে গড়ে তুলেছেন কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। যেখানে বর্তমানে ৫ শতাধিক ছাত্রী মেডিক্যালে পড়ছে। প্রতিবছর ১০০ থেকে ১২০ জন ছাত্রী ভর্তি হয়ে থাকে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজে। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন বিদেশি। কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে শিক্ষার মনোরম পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং কম খরচ। ফলে বিদেশি ছাত্রীরা এই মেডিক্যালে পড়ার জন্য আগ্রহী হচ্ছে বেশি। কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভারতের পশ্চিম বঙ্গ, নেপাল ও কাশ্মীর রাজ্যের ছাত্রীরাই বেশি পড়াশোনা করছে। এছাড়া ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা থেকে ছাত্রীরাও এবছর ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে বলে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের জেনারেল ম্যানেজার মাহবুব আল নুর জানিয়েছেন। কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজের বিদেশি ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের অভিজ্ঞতার কথা। ইন্টার্নি ডাক্তার বিমলা জিএম নেহা। তার পিতার নাম দান বাহাদুর জিএম এবং মায়ের নাম ইয়ামা দেবী। দেশ নেপাল। তিনি জানান- ২০০৭ সালে এখানে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি আরো জানান, আমরা ভিন্ন ভাষার মানুষ হলেও এখানে ভর্তি হয়ে আমাদের কোন সমস্যা হয় না। এখানে শিক্ষার পরিবেশ অনেক ভাল। শিক্ষক ও কুমুদিনী পরিবার অত্যন্ত আন্তরিক। আমাদের সবাইকে সমান চোখে দেখেন। এখানে বিশাল ক্যাম্পাস, কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থাসহ সব দিক বিবেচনা করে আমরা ভালই আছি। ইংরেজি ও অন্য ভাষা আমাদের মাতৃভাষা হলেও কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যালে আমরা সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলে আনন্দই পাচ্ছি। এই মেডিক্যালের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শুধু লেখাপড়া করে ডাক্তার হওয়ায়ই নয়, এখানে নাচ, গান ও খেলাধুলাসহ সাংস্কৃতিক চর্চার বিশাল সুযোগ রয়েছে। প্রতিবছর এবং বিভিন্ন মৌসুমে পিকনিকের ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন কর্তৃপক্ষ। এই হাসপাতালে বাঙালি রোগীদের সেবা দিতে পেরে সত্যিই আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। বিমলা জিএম আরও বলেন- তার ব্যাচে একই দেশের সুইভা ভট, উজমা খানিয়া আরি ও মেহেজাদা আলী পড়াশোনা করছেন। তার মত একই কথা বললেন নেপাল থেকে আসা চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী নিকিতা উপাদা ইয়া ইয়া, রিনা মহাজন ও পশ্চিমবঙ্গ এবং কাশ্মীর থেকে এসেছেন। তারা বলেছেন- এখানকার শিক্ষার পরিবেশ সত্যি সত্যিই অন্য রকম। বিশেষ করে মেডিক্যালের পরিচালক ডাক্তার দুলাল চন্দ্র পোদ্দার, অধ্যক্ষ প্রফেসর এম এ হালিম, কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ও মেডিক্যাল কলেজের চেয়ারম্যান রাজিব প্রসাদ সাহা, পরিচালক প্রতিভা মুত্সুদ্দি ও শ্রীমতী সাহা এবং এ্যাডমিন কর্মকর্তা বিশ্বজিত্ ঘোষসহ প্রতিটি শিক্ষক তাদের সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। তাদের সদয় আচার-ব্যবহারে আমরা বাবা-মা ও ভাইবোনসহ বিদেশে আত্মীয়-স্বজনদের ভুলে থাকি। কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. দুলাল চন্দ্র পোদ্দার ও অধ্যক্ষ প্রফেসর ডা. এম এ হালিম বলেন, বাংলাদেশে মেডিক্যালে পড়া যত সহজ ও কম খরচ কিন্তু বিদেশে মেডিক্যালে পড়া খুব কঠিন এবং ব্যয়বহুল ব্যাপার। ফলে সাধারণ পরিবারের ছেলে-মেয়েরা মেধাবী হয়েও তারা সে দেশে মেডিক্যালে পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে তারা দিন দিন বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করছে। তারা বলেন- বাংলাদেশে যতগুলো বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে নারী শিক্ষা ও মেয়েদের জন্য মেডিক্যালে পড়ার অন্যতম মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ। এখানে ৫ বছর মেয়াদি মেডিক্যালে এমবিবিএস কোর্সে মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনী বিভাগে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ছাত্রীদের মেডিক্যালে পড়ানো হয়। তিনটি বিভাগেই অভিজ্ঞ প্রফেসর ও ডাক্তার রয়েছেন যারা প্রতিনিয়তই ছাত্রীদের ক্লাস নিয়ে থাকেন। বিদেশি ছাত্রীদের গ্রুপভিত্তিক স্টাডি করার সুব্যবস্থা নিয়ে থাকেন শিক্ষকরা। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্রীদের সম্পর্কে তারা বলেন, তারা আমাদের সন্তানের মত। আমাদের দেশের মেয়েরা যেভাবে সুযোগ-সুবিধা পায় তারাও সেভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে।