সাইপ্রাসের আর্থিক সংকট

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ২০:০৪
২০১১ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে আবার মন্দার মধ্যে পড়ে ইউরোপের অর্থনীতি। ইউরো অঞ্চলে বেকারত্বের হারও রেকর্ড পরিমাণে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, মন্দাভাব চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ছিলো। তবে ইউরোপের সব দেশ যে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংকটের মুখে তা নয়। গ্রিসের পর এখন ইউরো অঞ্চলে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি সাইপ্রাস। আর্থিক সংকটে ভুগছে ইউরোপের এই ছোট দেশটি। এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তারা বেইলআউট (আর্থিক সঙ্কট থেকে উদ্ধার পরিকল্পনা) চাইলেও সেই বোঝা চাপানোর চেষ্টা চলছে দেশের মানুষের উপর। এর আগেও ইউরো অঞ্চলের কিছু দেশ আর্থিক সংকটের মুখে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) থেকে বেলআউট পেয়েছে। কিন্তু সাইপ্রাসকে ঘিরেই দেখা দিচ্ছে নানা সমস্যা। আগে গ্রিস বা অন্যান্য দেশের জন্য আর্থিক সহায়তা নিয়ে বিতর্ক হলেও পরবর্তীতে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসিবি থেকে বেইলআউট পেয়েছিলো। সাইপ্রাসকে বেইলআউট দেয়া নিয়েও প্রাথমিকভাবে তেমন কোনো জটিলতা দেখা যায়নি। কিন্তু এই প্রথম বেইলআউটের একটা অংশ মেটাতে বলা হচ্ছে সংকটগ্রস্ত দেশটির জনগণকে। এ কারণেই সৃষ্টি হয়েছে যত জটিলতার। সম্প্রতি সাইপ্রাসের দ্বিতীয় বৃহত্ ব্যাংক লাইকির পতন হওয়ায় সংকট আরো তীব্র হয়েছে। কারা এজন্য দায়ী দেশটির রাজনীতিকরা নাকি অর্থনীতিবিদরা? এ নিয়ে চলছে দোষারোপ করার গেম। এ পরিস্থিতিতে ছোট দেশটির অনেক প্রখ্যাত ব্যক্তি তাদের ব্যর্থতার জন্য বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন। কাউকে জেলেও যেতে হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে কি সমস্যার সমাধান হচ্ছে। দেশটির অর্থমন্ত্রী মিখালিস স্যারিসের বিরুদ্ধে তদন্ত হতে পারে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহ দায়িত্ব পালনের পর গত ২ এপ্রিল পদত্যাগ করেছেন তিনি। যাদের অ্যাকাউন্টে ১ লাখ ইউরোর কম অর্থ রয়েছে, তাদের কাছ থেকে কর নেয়া হবে না বেইলআউটের বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমন শর্তে সম্মতি দেয়ার পর তার বিশ্বাসযোগ্যতা শেষ হয়ে গেছে। এ সিদ্ধান্তের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ধনী রাশিয়ানরা, সাইপ্রাসের বড় ব্যবসায়ীরা, উচ্চ বেতন পাওয়া আইনজীবী ও চাকরিজীবীরা, যাদের এক লাখ ইউরোর বেশি অর্থ রয়েছে ব্যাংকে। গত মার্চে একটি আন্তর্জাতিক উদ্ধার প্যাকেজ নিয়ে আলোচনাকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দেশটির ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ২৮ মার্চ ছয় ঘণ্টার জন্য ব্যাংকগুলো খুলে দেয়া হয়। সাইপ্রাসের গণমাধ্যম বলছে, ব্যক্তিখাতের গ্রাহকরা যাতে ব্যাংকগুলো থেকে বড় অংকের অর্থ তুলে নিতে না পারে সেজন্য দৈনিক অর্থ উত্তোলনের পরিমাণ ৩শ’ ইউরো নির্ধারণ করে দেয়া হয়। একসময় স্যারিস চেষ্টা করেছিলেন মস্কোর কাছ থেকে ৫ বিলিয়ন ইউরো ঋণ নেয়ার জন্য। এ অর্থ পেলে হয়তো লাইকি ব্যাংককে দেউলিয়াত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি মস্কোকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়েছেন। সাইপ্রাস ছোট দেশ হলেও এর আর্থিক সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব ইউরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে সংকটের মুখে থাকা গ্রিসের সঙ্গে সাইপ্রাসের সুদৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ইতিমধ্যে সাইপ্রাসের অর্থনৈতিক সংকটের সরাসরি প্রভাব গ্রিসের উপর পড়ছে বলে গ্রিক সরকার দাবি করছে। সাইপ্রাসকে ঘিরে বর্তমান জটিলতার কারণে ইউরোপীয় অঞ্চলে পুঁজিবাজার কিছুটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সাইপ্রাস সে দেশের ব্যাংক ও পুঁজিবাজার কিছুদিন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ অবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। ইউরোপের অর্থনীতিকে দ্রুত চাঙ্গা করার বিষয়ে এবারের ইইউ সম্মেলনে আলোচনা হতে পারে। তবে ঐকমত্যে আসতে হলে সদস্য দেশগুলোকে নমনীয় হতে হবে বলে মনে করেন ইইউ প্রেসিডেন্ট হ্যারমান ভ্যান রম্পুই। তার মতে, দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ব্রিটেনকে নিজের স্বার্থ আদায় করার অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। ফ্রান্স ও জার্মানিকেও তাদের অবস্থান থেকে সরে এসে মধ্যপন্থা গ্রহণ করতে হবে। সাইপ্রাসের এ অবস্থায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বিষয়ে চিন্তা করা কঠিন। সাইপ্রাসের নাগরিকদের মধ্যে একটি বড় প্রবণতা হলো তারা আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে থাকেন। আরো একটি সমস্যা হলো ইউরো। যার কারণে তারা তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ইউরো অঞ্চলের দেশগুলো বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে তা পারে না। স্পেন, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, গ্রিস তাদের অর্থনীতির কারণে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। এ অবস্থায় সাইপ্রাস কী করবে- তারা ইউরো ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিছু অর্থনীতিবিদেরও এটাই মত। অন্তত এর মাধ্যমে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপর নিয়ন্ত্রণ পাবে। যার মাধ্যমে সরকার অর্থনীতিকে পরিচালনা করতে পারবে। সাইপ্রাসের অনেক মানুষ এখনই ইউরোর বিরুদ্ধে মত দিচ্ছে। তাই একক মুদ্রা হতে পারে সাইপ্রাসের আগামীদিনের অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য। তবে এক্ষেত্রে দেশটির নিজস্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। এখন জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তাদের সাথে সাইপ্রাসের মধ্যে তীব্র আলোচনার লড়াই চলছে। সাইপ্রাসের এমপিরা মনে করছেন, ইউরোজোনের ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়ে তারা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হচ্ছেন। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংককে (ইসিবি) ইউরোজোন ও আইএমএফের সাথে সোমবারের মধ্যে বেইলআউটের জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে সাইপ্রাস। নইলে ইসিবিকে দেয়া তহবিল প্রত্যাহার করে নেবে তারা। এর ফল হতে পারে ইউরো থেকে তাদের বেরিয়ে আসা।