ইরাকের ৩১ বছর বয়সী আব্বাস হামিদ একটি চাকরির জন্য এখানে সেখানে অনেক ধর্না দিয়েও কোনো গতি করতে না পেরে শেষমেষ কারবালায় ফেরি করে স্যুভেনির বিক্রি শুরু করেন। শুধু আব্বাসই নয় তার মতো কয়েক হাজার বেকার যুবক ইরাকের অন্যতম পবিত্র এই শহরের প্রধান সড়কে ফেরি করে নানা সামগ্রী বিক্রি করছেন। শিয়া সম্প্রদায়ের এই পবিত্র নগরীতে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ আসেন। তাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী বিক্রি করে জীবন চলে বেকার এই যুবকদের। এই মুহূর্তে দেশটিতে বেকারত্বের হার ৩৯ শতাংশ। ইরাকের অবস্থা সবসময়ই এমন ছিল। মূলত ইরাক যুদ্ধ দেশটির সাধারণ মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রায় বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশটি ভালোই উন্নতি করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন এখনো রয়ে গেছে। কবে এ অবস্থা থেকে উত্তোরণ ঘটবে বিশ্লেষকরাও বলতে পারছেন না।
অর্থনীতি:সৌদি আরব ও রাশিয়ার পর ইরাক হলো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্ তেল রপ্তানিকারক দেশ। এ বছরের শেষ নাগাদ দেশটিতে দৈনিক ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্পাদন হতে পারে। ইরাক যুদ্ধের আগে দৈনিক ২ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্পাদিত হতো। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে বার্ষিক দুইশ’ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি তেল রপ্তানি করে ২০৩৫ সালের মধ্যে ইরাক প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করতে পারে। আইইএ আরো বলেছে, ইরাকের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুত্ সরবরাহের অভাব। ২০০৩ সালের আগে বাগদাদের মানুষ দৈনিক ১৬-২৪ ঘণ্টা বিদ্যুত্ পেতো। যেখানে দেশের অন্য এলাকার মানুষেরা দৈনিক বিদ্যুত্ পেতো চার থেকে আট ঘণ্টা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে বিদ্যুত্ অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে বিদ্যুত্ বিতরণ ব্যবস্থায় গোলযোগ দেখা দেয়। এই অবস্থার মধ্যেও ইরাকের লোকজন এখন গড়ে আট ঘণ্টা বিদ্যুত্ পায়। যদিও ইরাকের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নীরবে বিশাল ভূমিকা রেখে যাচ্ছে তেল। কিন্তু বিদ্যুত্ চাহিদা মেটানোর জন্য তেল পরিশোধন করে বিদ্যুত্ উত্পাদনের সক্ষমতা এখনো অর্জন করতে পারেনি ইরাক। ইরাকে যেমন তেলের বিশাল মজুদ রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় বড় ভাণ্ডার। ইরাকের বিদ্যুত্ শিল্পের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস গুরুত্বপর্ণ জ্বালানি হতে পারে। আইইএ’র হিসাবে, ২০১২ সালে যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে এর অর্ধেকেই পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক প্রায় ২১৩ বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করেছে যুদ্ধ পরবর্তী ইরাক পুনর্গঠনে। সংস্থাটি এ মুহূর্তে ইরাকের নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার, গ্যাস সরবারাহ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও গ্যাস নির্ভর বিদ্যুেকন্দ্র নির্মাণের জন্য কর্তৃপক্ষকে অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য মত দিয়েছে।
প্রযুক্তি:বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই ২০০৩ সাল থেকেই দেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এই মুহূর্তে দেশের ৭৮ ভাগ নাগরিকের হাতে মোবাইল ফোন আছে। তবে সে তুলনায় অল্প কিছুসংখ্যক মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। প্রতি ১০০ জনে মাত্র ৫ জন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এ সময়ের মধ্যে সৌদি আরব ও মিসরে ইরাকের চেয়েও বেশি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছেছে। কিছু নিত্যব্যবহার্য জিনিসের চাহিদা বেড়েছে গত ১০ বছরে। ইরাক সরকার পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে প্রাইভেটকার ব্যবহার কমলেও মোটর সাইকেল ব্যবহার বেড়েছে।
সহিংসতা:২০১০ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা ইরাকে যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো মোতায়েন ছিল। ধীরে ধীরে ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ অপরাশেন ইরাকি ফ্রিডম (ইরাক যুদ্ধ) শুরু হওয়ার পর ৪৪৮৮ জন আমেরিকান সেনা নিহত হয়েছে। আর ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়েছে ১৭৯ জন। ওই সময়ের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সহিংস বিদ্রোহের ঘটনায় এক লাখেরও বেশি বেসামরিক ইরাকী নিহত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা হিসাব রাখে ইরাকি বডি কাউন্ট। ওই সংস্থার হিসাবে, শুধু ২০১২ সালেই ৪৫৭১ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। ২০০৫ সালে বাগদাদের কাছে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে এক হাজার ব্যক্তি পদদলিত হয়ে মারা গেছে। ওখানে আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে এমন খবরে মানুষজন আতংকে ছোটাছুটি করে এতো মানুষ প্রাণ হারায়। ইরাকি বডি কাউন্টের হিসাবে গত ১০ বছরে সবচেয়ে সহিংসতার সময় হলো ২০০৬ সালের মার্চ থেকে ২০০৮ সালে মার্চ পর্যন্ত। এই সময়ে ৫২ হাজার ব্যক্তি নিহত হয়েছে। তখন ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীও বহুবার বোমা হামলার শিকার হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে ইরাকের অবস্থা এখনও খুবই খারাপ। বিশেষ করে বন্দি, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, নারী ও শিশুদের জন্য এখনো দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। সংস্থাটির মতে, যুদ্ধের সময় এবং এরপরে অনেক নারী বিধবা হয়েছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জোর করে পতিতাবৃত্তি ও নারীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করার মতো। মানবাধিকার কর্মীরা জানিয়েছে, ইরাকের নারীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে গিয়ে তাদের হামলা ও হুমকির শিকার হতে হয়েছে। গণমাধ্যমের জন্য ইরাক খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের হিসাবে এ পর্যন্ত ১৫১ জন সাংবাদিক নিহত হওয়ার তথ্য আছে তাদের হাতে। তবে বডি কাউন্টের হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি হবে, অন্তত ২৮৮ জন। যুদ্ধের সময় এবং এরপরে ২৬৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছে।
দুর্নীতি: দুর্নীতির মাত্রা ইরাকে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ২০১০ সালের জরিপে দেখতে পায় দেশটির ৫৬ শতাংশ মানুষ ঘুষ প্রদান করে। ৬৩ শতাংশ মানুষ মনে করে, সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধের সুফল পায়নি সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বড় কথা জরিপে ওঠে এসেছে ২০০৭ সালের পর ইরাকে দুর্নীতির পরিমাণ আরো বেড়েছে।
শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত: এই ১০ বছরে অন্তত ৩০ লাখ মানুষ বাধ্য হয়েছে বাস্ত্যুচ্যুত হতে। এদের অনেকই দেশ ছেড়ে বিদেশ চলে গেছে। আবারো অনেকইে নিজ দেশেই ঘরবাড়ি হারা। পার্শ্ববর্তী সংঘাতপূর্ণ দেশ সিরিয়ারও কিছু মানুষ সেদেশের অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে ইরাকে আশ্রয় নিয়েছে। ফিরে এসেছে সেখানে কর্মরত ইরাকিরা। বাস্তুচ্যুত ইরাকি ও সিরীয়রা বিদেশি ত্রাণের ওপর জীবনযাপন করছে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে। অন্তত ২০ হাজারের বেশি ইরাকি নাগরিক রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন দেশে আবেদন করেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়, এ মুহূর্তে ৭০ লাখ ইরাকী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ। যারা প্রতিদিন মাথাপিছু মাত্র ২.২ ডলার ব্যয় করে। দেশটির অর্থনীতি এমন বিপর্যস্ত এ মুহূর্তে ইরাকে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। সৃষ্টি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। প্রতিবছর দেশের চার লাখ ৫০ হাজার নতুন কর্মশক্তি সৃষ্টি হয়। এই বিপুল মানবসম্পদকে কাজা লাগাতে পারলে হয়তো আবারো ইরাকে ফিরবে সুদিন।
