রাশিয়ার জাতীয় সমস্যা আত্মহত্যা!

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ২০:০৭
রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ গত বছর এক সন্ধ্যায় হঠাত্ করেই সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন। মিডিয়া সংশ্লিষ্ট সকলেরই ধারনা জন্মেছিল, তিনি হয়তো জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবেন। সেজন্য হলরুম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছিল সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে। এর মাঝে অনেক বিদেশী সাংবাদিকও ছিলেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজনীতি বিষয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি মেদভেদেভ। তার লিখিত বক্তব্যের পুরোটাই ছিলো আত্মহত্যা সংশ্লিষ্ট। তিনি সকল মিডিয়ার প্রতি আহবান জানান, অবুঝ টিনেজারদের আত্মহননের খবরগুলো ফলাও করে প্রচার না করতে, কিংবা খুব বেশি প্রয়োজন মনে না করলে চেপে যেতে। কারণ এতে করে আত্মহত্যার ঘটনা তো কমছেই না, উপরন্তু বাড়ছে। জাতীয় স্বার্থেই ছিলো মেদভেদেভের এই উদাত্ত আহ্বান। সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে সাংবাদিকরা কঠিন সব প্রশ্ন করতে শুরু করেন মেদভেদেভকে। অখ্যাত এক পত্রিকার রিপোর্টার আত্যহত্যার খবর ছাপতে না বলার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেন বিশদভাবে। রেগে না গিয়ে মেদভেদেভ উত্তরটা দেন কৌশলে, ‘এটি কোনো স্নোবল নয় যে প্রতি বছরই কেবল বড় হতে থাকবে। মানছি, বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং ভাবনার। খুব নমনীয়ভাবে পরিস্থিতিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। নইলে জাতির সামনে ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে। সবাই মিলে টিনেজ আত্মহত্যার হার নিয়ন্ত্রণে আনার এখনই উপযুক্ত সময়। ওরা কেনো আত্মহত্যা করবে? জীবনের কঠিন বাস্তবতা উপলব্ধির বয়সই তো হয়নি ওদের। রাশিয়ায় আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অনেক আগে থেকেই বেশি। কিন্তু টিনজোরদের এ পথ বেছে নেযার হিড়িক পড়ে ২০১২ সালের ফেব্রুযারির থেকে। পরিস্থিতি এমন ভযাবহ রূপ নিয়েছে যে, ১০ বছরের ছাত্রও আত্মহত্যা করে। পৃথিবীর সর্ববৃহত্ দেশে টিনেজ আত্মহত্যার হার বর্তমান বিশ্বগড়ের চেয়ে তিনগুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা এর কারণ খুঁজতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। সুনির্দিষ্ট কোনো কিছু চিহ্নিত করতে পারছেন না। একেকজন একেক কথা বলছেন। বেশিরভাগই দূষছেন অ্যালকোহল আসক্তিকে। টকশো ও সেমিনারে অন্য যে বিষয়গুলো উঠে আসছে, সেগুলো হলো— পরিবারের অকার্যকারিতা, সামাজিক অবক্ষয়, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের অনুপস্থিতি। সেই দিনের সংবাদ সম্মেলনে মেদভেদেভের সঙ্গে সবাই একটি বিষয়ে একমত হন যে, ইন্টারনেটের এই যুগে স্যোশাল নেটওয়ার্কগুলো আত্যহত্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনো কাজেতো আসছেই না, উপরন্তু ক্ষতি করে যাচ্ছে দারুণভাবে। আত্মহত্যার খবরগুলো স্যোশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অন্যরা উত্সাহিত হচ্ছে। বিশেষত যারা স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নেবে কিনা এ বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছে। গত জানুয়ারির শেষ সপ্তায় সেন্ট পিটার্সবার্গের সংবাদপত্র সেমেনায় আত্মহত্যাকারীর মৃতদেহের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হওয়ার তীব্র সমালোচনা করে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়। লেখাটির উপসংহার টানা হয়েছে এভাবে— আত্মহত্যাকারীর মৃতদেহটিকে গুরুত্ব না দিয়ে তাচ্ছিল্য করলে অন্যরা বুঝবে যে, এভাবে মারা যাওয়ার পর গুরুত্ব পাওয়া যায় না, বরং উপেক্ষা করা হয়। তারচেয়ে স্বাভাবিক মৃত্যু অনেক ভালো। মস্কোর সার্বস্কি স্টেইট সায়েন্টিফিক সেন্টার ফর সোশাল এন্ড ফরেনসিক সাইকিয়াট্রির মনোবিজ্ঞানি বরিস পলোঝি আত্মহত্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এর পেছনে অনেগুলো বিষয় কাজ করতে পারে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো— সামাজিক, চিকিত্সাগত ও মনোবৈজ্ঞানিক। কাজেই সমস্যার সমাধান করতে হবে পদ্ধতিগতভাবে। সেজন্যে সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাশিয়ায় কোন পদ্ধতিই বলবত্ নেই। রাশিয়ার আইন অনুযায়ী প্রতি স্কুলে অন্তত একজন মনোবিজ্ঞানি থাকা বাধ্যতামূলক। যারা আত্মহত্যার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করছে, তাদের জন্য রয়েছে একটি জাতীয় টেলিফোন হটলাইন। কল করলেই বাড়িয়ে দেয়া হয় সাহায্যের হাত; বিরত রাখতে শোনানো হয় নানা উপদেশবাণী। কিন্তু এর বাইরে সমস্যা মোকাবেলা করার কোন উদ্যোগই চোখে পড়ে না। রাশিয়ার শিশু অধিকার ন্যায়পাল পাভেল আস্তাকভ কিছুদিন আগে পরািস্থতিকে ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়েছেন। ক্রসরোডস নামক একটি কাউন্সেলিং সেন্টার পরিচালনা করেন কিরিল খলোমভ। আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা টিনেজারদের বিষয়েই কাজ করে তার প্রতিষ্ঠান। তিনি পরিহাসের সুরেই জানান, ‘মিডিয়ার আলোচনায় সমস্যাটিকেএখনো হালকাভাবে নেয়া হচ্ছে। যেমন কেউ কেউ বলেন, ফেইসবুক বন্ধ করে দেন, দেখবেন সবকিছু ঠিক হযে যাবে। আসলে বিষয়টি এতো সহজ নয়।’ তার মতে, সোভিয়েত আমলের মতো যুব সংগঠনগুলোর উপস্থিতি না থাকা এবং পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়াতেই সমস্যা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।