হরতালে সংঘর্ষ ভাংচুর গুলি, শতাধিক আহত

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫২
১৩ দফা আদায়ের লক্ষ্যে ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতাল চলাকালে গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজত কর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও হরতাল বিরোধীদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে পুলিশ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে সংঘর্ষ চলাকালে ৪৩ জন গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে ছয় হেফাজত কর্মীকে আশংকাজনক অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ময়মনসিংহে ১৪ দল, পুলিশ ও হেফাজতের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৪০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় আওয়ামী লীগ অফিসে হামলার চেষ্টা ও বিএনপির জেলা অফিসে আগুন দেয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে হরতাল চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেললাইনে টায়ারে আগুন ধরিয়ে ও কাঠের গুড়ি ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে পিকেটাররা। এতে বিভিন্ন স্টেশনে বেশ কয়েকটি ট্রেন আটকা পড়ে। পরে অবরোধ তুলে নিলে প্রায় চার ঘণ্টা পর ঢাকা-সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। চট্টগ্রাম অফিস জানায়, নগরীর ইস্পাহানী মোড়ে হরতাল বিরোধীদের সাথে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী ও সাহিত্য সম্পাদক মুফতি হারুন ইজহারসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এ সময় কমপক্ষে ৪৩ জন গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে রাস্তার বিলবোর্ড, দোকানপাটের সাইনবোর্ড ও শাটারের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হয়। আতঙ্কিত লোকজন দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদ স্থানে সরে যান। হেফাজত নেতা মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী জানান, হরতালের সমর্থনে হেফাজত কর্মীরা ভোর থেকেই ইস্পাহানি মোড়ে অবস্থান গ্রহণ করে। সাড়ে ১০টার দিকে হঠাত্ সেখানে অস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা উপস্থিত হয়ে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাদের হামলায় হেফাজতের শতাধিক কর্মী আহত হন। গুলিবিদ্ধ ৬ জনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নগরীর বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। হামলায় তাদের কমপক্ষে ৬০ জন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন। সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (দক্ষিণ) মোস্তাক আহমেদ জানান, ইস্পাহানি মোড় এলাকার দখল নেয়াকে কেন্দ্র করে হরতাল বিরোধীদের সাথে হেফাজত কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় সেখানে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটলেও পুলিশ কাউকে লক্ষ্য করে গুলি করেনি। এদিকে হেফাজত কর্মীরা ভোর থেকেই নগরীর আন্দরকিল্লা, ষোলশহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, নতুন ব্রিজ, হালিশহরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে জমায়েত হয়ে মিছিল, সমাবেশ ও পিকেটিং করেন। হেফাজতের সবচেয়ে বড় সমাবেশ হয় দামপাড়া ওয়াসা মোড়ে। হরতাল চলাকালে ইস্পাহানি মোড় ছাড়া নগরীর আর কোথাও বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও বিকালের দিকে নগর বিএনপির কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর ও আশেপাশের ভবনের দরজা জানালার কাঁচ ভাংচুর করে বিএনপি কর্মীরা। বিকালে আবদুল্লাহ আল নোমানসহ দলের শীর্ষ নেতাদের মুক্তি দাবিতে দফায় দফায় মিছিল করে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা জুবিলি রোড এলাকায় ইত্তেফাক অফিসের সামনে একটি মাইক্রোবাস ভাংচুর করে। এ সময় তারা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পটিয়া সংবাদদাতা জানান, হরতালকারীরা সকাল ১১টার দিকে শিকলবাহা ক্রসিং এলাকায় ৭ বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও হরতালবিরোধীরা একটি কওমী মাদ্রাসা ভাংচুর করেছে। এ সময় শিক্ষকসহ ২০ জন আহত হন। অন্যদিকে একই সময়ে আনোয়ারা পারকী বাজার এলাকায় হরতালকারীদের সঙ্গে হরতাল বিরোধীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় উভয়পক্ষের ২০/২৫ জন আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২০/২৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। এতে আনোয়ারা থানার এস আই জীবন হাজারী, কনস্টেবল মনির হোসেন, মাদ্রাসা ছাত্র মোহাম্মদ শফি আহত হন। চবি প্রতিনিধি জানান, হরতাল চলাকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়গামী দু’টি শাটল ট্রেন ক্যাম্পাসে আসার পথে ফতেয়াবাদ ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশনে আটকে দেয় পিকেটাররা। এ সময় তারা ট্রেন চালককে পুড়িয়ে মারার হুমকি দেয়। ফলে দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়গামী আর কোন ট্রেনই চলাচল করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সিরাজ উদ দৌল্লাহ জানান, শাটল ট্রেন ক্যাম্পাসে না আসায় শিক্ষকরা ক্লাস-পরীক্ষা নিতে পারেনি। ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, হরতালের সমর্থনে হেফাজতের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহরের গাঙ্গিনাপাড় ট্রাফিক মোড়ে আসলে পাশেই শিববাড়িতে অবস্থান নেয়া ১৪ দলের নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া দেয়। তারাও পাল্টা ধাওয়া দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ এবং বিপুল সংখ্যক টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষে গাজী টিভির সাংবাদিক, এসআই মোরশেদুলসহ কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ২০ জনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শহরে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় শহরের গাঙিনাপাড়, রামবাবু রোড, সিকে ঘোষসহ প্রেসক্লাবের আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা লাঠিসোটা নিয়ে গাঙিনাপাড় ও সিকে ঘোষ রোডসহ প্রেসক্লাবের আশপাশের এলাকায় বাড়ি ও দোকানপাটে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। একই সময়ে হেফাজত কর্মীরা শিববাড়ি রোডের আওয়ামী লীগের জেলা কার্যালয়েও হামলার চেষ্টা চালায়। এ সময় আওয়ামী লীগের ময়মনসিংহ জেলা সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মতিউর রহমান কার্যালয়ের ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এদিকে সংঘর্ষের পর পর কে বা কারা শহরের নতুন বাজারে জেলা বিএনপি কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর গাঙ্গিনার পাড়ে হোটেল খন্দকারে ভাংচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন লাগানোর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শহরে বিজিবি মোতায়েন করা হয়। দলীয় কার্যালয়ে আগুন দেয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি একেএম মোশাররফ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আবু ওহাব আকন্দ। আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল দুপুরে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে দলীয় অফিসে হামলা চেষ্টার প্রতিবাদ জানায়। সন্ধ্যায় শহরের কাঠগুলা বাজারে হেফাজতের অনুসারী সংগঠন ‘ইত্তেফাকুল ওলামা’ মাওলানা আব্দুর রহমান হাফিজীর সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে । ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, সকাল ৯টার দিকে ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন এলাকায় হরতালকারীরা অবরোধ করে। তারা রেললাইনে পাথরের ব্লক, কাঠের গুড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন ধরিয়ে ট্রেন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ময়মনসিংহগামী নাসিরাবাদ মেইল ট্রেন, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনে আটকা পড়ে। পরে ১১টার দিকে পুলিশ সুপার মোঃ মনিরুজ্জামান পিপিএম ঘটনাস্থলে পৌঁছে হরতালকারীদের অনুরোধ করলে নাসিরাবাদ ট্রেনটি স্টেশন ত্যাগ করলেও অপরটি আটকা পড়ে থাকে। প্রায় ৫ ঘণ্টা পর পারাবত ট্রেনটি রেলস্টেশন ত্যাগ করে। আখাউড়া সংবাদদাতা জানান, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আখাউড়া রেল জংশন এলাকার চন্দনসারে রেললাইনে আগুন দেয় হরতালকারীরা। এতে ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস, উপকূল এক্সপ্রেস ও ভৈরবগামী বাল্ল¬া লোকাল ট্রেন আখাউড়া স্টেশনে আটকা পড়ে। এছাড়া কসবায় উপকূল এক্সপ্রেস আটকা পড়ে। তবে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা পর ট্রেনগুলো গন্তব্যের উদ্দেশে আখাউড়া ছেড়ে যায়। এদিকে আখাউড়ায় সিলেটগামী কুশিয়ারা ও ভৈরবগামী বাল্লা ট্রেনে বাইপাস এলাকায় ঢিল ছুঁড়ে হরতাল সমর্থকরা। এতে ৫ যাত্রী আহত হন। চট্টগ্রামে বৃহস্পতিবারও হরতাল এদিকে আবদুল্লাহ আল নোমানসহ শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে আগামী বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মহানগরে পূর্ণদিবস হরতাল ডেকেছে স্বেচ্ছাসেবক দল চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। গতকাল বিকালে নগরীর কাজীর দেউড়ি মোড়ে দলের এক প্রতিবাদ সমাবেশে এই হরতালের ঘোষণা দেয়া হয় বলে জানিয়েছে আমাদের চট্টগ্রাম অফিস। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষ লালমোহনে আহত ৫০ লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। ভাংচুর করা হয়েছে উপজেলা ছাত্রলীগের অফিস ও উপজেলা বিএনপি অফিস, ছাত্রদল সভাপতির ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অন্তত ১০টি দোকান। স্থানীয় ছাত্রদল নেতার ওপর হামলার জের ধরে গতকাল রাতে লালমোহন পৌর শহরের করিমরোড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় থানার ওসি খন্দকার মিজানুর রহমান খান, সাংবাদিক ইউনুছ শরীফ, শহিদুল ইসলাম, শামিম প্রমুখ।