১৯৭১ সাল রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের স্বাধীন বাংলা। বিজয়ের বীরত্বে সমবেত হয়ে ঐ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা দিনাজপুর শহরের মহারাজা গিরিজানাথ স্কুলে স্থাপন করেন ট্রানজিট ক্যাম্প। বিজয়ের মাত্র ২০ দিন পরের কথা। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি বিকেলে ট্রানজিট ক্যাম্প এ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মিটিং। সন্ধ্যায় মাগরিবের আজান শেষ হওয়ার পরপরই প্রচন্ড বিস্ফোরণে উড়ে যায় ট্রানজিট ক্যাম্প। মহারাজা স্কুল সম্পূর্ণভাবে পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে। ক্যাম্পে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরের মাংস, হাড় স্কুল ভবনের ইট-পাথর উড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে পুরো শহরে। ওই এলাকা ছাড়াও শহরের বিভিন্ন এলাকার বাড়িঘর, দরজা-জানালা ভেঙ্গে পড়ে। ধারণা করা হয়, অপসারিত মাইন ট্রাক থেকে নামাতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ে গিয়ে ঐ বিস্ফোরণে ঘটে এই হূদয় বিদারক ঘটনা। এই বিস্ফোরনের সাথে সাথে অন্যান্য সমস্ত জমাকৃত অস্ত্র সম্ভারও একসাথে প্রচন্ড বিকট শব্দে বস্ফািরিত হয়।
মনোরম, নয়নাভিরাম খয়েরী রং এর বিরাট স্কুল ভবনটার প্রায় পুরো অংশই ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে যায়। মাইন বিস্ফোরণের স্থানটি একটি বিরাট গহ্বরে পরিণত হয় এবং তাতে মাটিরতলা থেকে পানি বেরিয়ে আসে। বিশাল মাঠ পরিণত হয় বিশাল পুকুরে ।
এই আকস্মিক নিদারুণ দুর্ঘটনায় মহারাজা স্কুলে অবস্থানরত প্রায় সাড়ে পাঁচ’শ বীর মুক্তিযোদ্ধা সেখানে নিহত হন। কোন লাশই চেনা যায়নি বা সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরের দিন মুক্তিযোদ্ধাদের সব খন্ডিত লাশ এবং দেহের অংশবিশেষ উদ্ধার করে দিনাজপুর শহরের অদূরে চেহেলগাজী গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। পরবর্তিকালে ঐ নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে মহারাজা স্কুল প্রঙ্গনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।
ঐ নিদারুণ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দিনাজপুরবাসী শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়ে। স্বাধীন মাতৃভূমিতে বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের অপ্রত্যাশিত এত লাশ বিজয়ের আনন্দকে নস্যাত্ করে তাদের দুঃখ সাগরে নিমজ্জিত করে।
১৯১৩ সালে মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় দিনাজপুর শহরে। মহারাজা স্যার গিরিজানাথ রায় বাহাদুর তাঁর খাস জমি থেকে শহরের বালুবাড়ীতে ২৬ বিঘা জমি দান করেন স্কুল ভবন নির্মাণ করার জন্য। শুধু তাই নয় এই বিদ্যান ও দানশীল ব্যক্তিটি নগদ অর্থ দিয়েও নতুন হাই স্কুলটি স্থ্াপনের সহায়তা করেন। মহারাজার নামেই এর নামকরণ করা হয়। এই বিদ্যালয়টির স্থাপত্য সৌন্দর্য ছিল অপরুপ। স্কুল ভবনের বাইরের দিকটা ছিল প্লাস্টারমুক্ত পয়েন্টিংযুক্ত অসাধারন সুন্দর। এর গঠন বিন্যাসটি ছিল মার্জিত স্থাপত্য শিল্প সৌকর্যো গঠিত। রংটি ছিল উজ্জল খয়েরী রং এর সাথে কৃষ্ণচুড়ার লাল ফুলের রং মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। নীচ থেকে ৪ ফুট উঁচু পাটাতনের উপর নির্মিত ছিল রাজোচিত বিরাট “ঊ” আকৃতির পাকা ছাদ দেওয়া মহারাজা স্কুলের ক্লাসরুমগুলো। সবুজ রং এ বর্ণিল করা খড়খড়িযুক্ত বড় বড় দরজা, জানালা, সাদা রং এর সুদৃশ্য আর্চ বিশিষ্ট মোটা মোটা থাম ঘেরা বিরাট টানা বারান্দা থেকে নীচে মাঠে নামার বড় বড় সিঁড়ি, বিরাট হলরুম, হেডমাস্টারের রুম, শিক্ষকদের রুম, লাইব্রেরী, কমন রুম, কাঁচের সুদৃশ্য গ্যালারিসহ বিজ্ঞান রুম এ অঞ্চলের জন্য ছিল একটি বৈশিষ্ট্য।এই বিদ্যালয়টিতে বহু মেধাবী ছাত্ররা বিদ্যা অর্জন করেছে। ১৯৪৭ সাল থেকে বরাবর এই স্কুলটি ভাল ফলাফল করে এসেছে। সকল সাফল্যের মূলে ছিল গুণী শিক্ষখমন্ডলীর অক্লান্ত পরিশ্রম।
১৯৪৬ সালে মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল “নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সম্মেলন”। দুই দিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন সারা বাংলার শিক্ষকবৃন্দ। ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ডা: মেঘনাদ সাহা প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন। যা সেময় এই অঞ্চলের সারা জাগিয়েছিল।
মহারাজা গিরিজানাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাএ প্রখ্যাত চিএশিল্পী, শিল্পোদ্যোক্তা নিতুন কুন্ডু। নিজেকে দেশ-বিদেশে শ্রেষ্ট শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন, গড়ে তুলেন অটবি’র মত শিল্প প্রতিষ্ঠান যা বাংলাদেশকে পরিচিত করেছে বিশ্বের দরবারে। লেখক, সাংবাদিক, ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতারের চরমপত্র খ্যাত এম,আর, আখতার মুকুল এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। বাংলাদেশের চলচিত্র জগতের কিংবদন্তি প্রখ্যাত চলচিত্র নির্মাতা শিল্পী সুভাষ দত্ত এই স্কুল থেকেই ১৯৪৮ সালে ম্যা্রিট্রক পাশ করেন।
আরও বহু প্রতিভাবান ছাত্রের জন্ম দিয়েছে এই স্কুল, যাঁরা আজ নিজেদের কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সম্মানীত আর এই দেশটির সেবায় নিয়োজিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক, বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও লেখক, ২১শে পদক প্রাপ্ত ড. অজয় রায় ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতি ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ রাশিদুল হাসান (মুকুল) এক সময়ে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার ছিলেন। মহারাজা গিরিজানাথ স্কুলের কৃতি প্রধান শিক্ষক মীর মোশারফ হোসেন এর সুযোগ্য সন্তান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম এন্ড হসপিটাললিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যলয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. মোঃ ইসমাইল হোসেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. শাহ মোহাম্মদ বুলবুল ইসলাম ছারাও বহু প্রকৌশলী, স্থাপত্ববিদ, সরকারী/বেসরকারী উচ্চ কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী/শিল্পোদ্যোক্তা মহারাজা গিরিজানাথ স্কুলে লেখাপড়া শেষে আলোকবর্তিকা নিয়ে ছড়িয়ে আছেন দেশে ও বিদেশে যারা আজ স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং এখনও সমাজে নানা ভাবে অবদান রেখে চলেছেন।
এই শতবর্ষী বিদ্যালয়টি আজও পূর্বের মত শিক্ষা কার্যক্রম সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে এই বিদ্যালয়ে দুই সিফটে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্রছাত্রী অধ্যায়ন করছে।
শৈশব ও কৈশোরের ভালবাসায় ঘেরা বিদ্যালয়টি ঐতিহ্য ও গৌরবকে নতুন প্রজস্মের কাছে তথা দেশের সকল মানুষের কাছে পৌছে দেবার তাগিদ থেকে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী সমিতি ও স্কুল কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ে গঠিত শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন কমিটি আয়োজন করেছেন ১২-১৩ এপ্রিল ২০১৩ স্কুল প্রাঙ্গনে শতবার্ষিকী উত্সব। দুদিনের এই উত্সবে অংশ নেবে স্কুলের কয়েক হাজার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী। কলকাতা (পশ্চিমবঙ্গ) হতে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের ১০ জনের একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহন করবেন বলে ইতিমধ্যে আয়োজকদের নিশ্চিত করেছেন। আমরা এখন শুধু একত্রে মিলিত হবার প্রহর গুণছি। আসুন সকলে মিলি একসাথে।
