আমার কথা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:২২
খুব ছোটবেলায় মা গল্পের বই পড়ে শোনাতেন। হয়তো সেই গল্প শোনার অভ্যাসেই একটু বড় হয়েই বই পড়া শুরু। ছোটদের সব ধরনের বই, অল্প কিছু, বড়দের বইও পড়তে পড়তেই লেখার শুরু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিশু’ পড়ে যেমন লেখা শুরু করি তেমনি শিশুতোষ কবিতা ডিটেকটিভ বই পড়ে পড়ে রুলটানা খাতা ভরে ফেলি আস্ত ডিটেকটিভ কাহিনী। রূপকথাও বাদ যায়নি। কৈশরে যে বই পড়ে আবেগে চোখের পানি ফেলি তা হচ্ছে ‘রামের সুমতি’। সেভেন-এইট থেকে লেখা শুরু হলেও প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় কলেজে উঠে কুষ্টিয়া কলেজ ম্যাগাজিন ‘শিখায়’। প্রায় একই সঙ্গে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ১৯৬৪ সালে ‘সবুজ পাতায়’ও লেখা প্রকাশিত হয় এবং এর জন্য কিছু সম্মানীও পাই। দুই-ই সমানভাবে আনন্দিত এবং আলোড়িত করে। বুকের ভেতর একটা অন্যরকম বোধ ও আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। নতুন আসা এক তরুণ শিক্ষকের কল্যাণে ক্লাস এইটে পড়তে পড়তেই আমরা জেনে যাই মাইকেল এঞ্জেলের ‘মোনালিসার কথা’, অনেক ইংরেজ সাহিত্যিকের নাম ও তাদের অমর সাহিত্য রচনার কথা। সম্ভবত সেই সময় থেকে স্বপ্ন দেখতাম শিল্পী হওয়ার। ঢাকা আর্ট কলেজে ভর্তি হতে এসেছিলাম। অনেক পরে জেনেছি শিল্পী আবুল বারক আলভীও একই বছরে ভর্তি হন আর্ট কলেজে। ঢাকার পত্রিকায় লেখা পাঠালে প্রায়শ আমার লেখা ছাপা হতো। তা সত্ত্বেও লেখালেখিতে নিয়মিত হতে পারিনি। এক নামেও স্থির থাকিনি। বর্তমান যে নাম এটা অনেক পরে ১৯৮৮-তে প্রথম উপন্যাস ‘হিরণ্ময় বিষাদ’ বেরুনোর সময় নেয়া। এই লেখাটিও অনেক আগে ১৯৭৪ সালে একটি মাসিক পত্রিকার ঈদসংখ্যায় তিনটি উপন্যাসের একটি। অন্য দুই উপন্যাসের লেখক ছিল নূরুল করিম নাসিম ও হুমায়ুন আহমেদ। ঊনিশশো অষ্টাশি থেকে বিরানব্বই, এই সময়কালে প্রকাশিত হয় মোট ষোলটি বই, এর মধ্যে ১১টি শিশু-কিশোরদের জন্য। ছোটগল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ-কাহিনী, কল্পবিজ্ঞান, এ্যাডভেঞ্চার- সবই রয়েছে। কয়েকটি বইয়ের নাম উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছি না। বনুর জন্য বহুদূর, যুদ্ধদিনের কষ্টগুলো, আগ্রা হয়ে কাশ্মীর, মেঘ পাহাড়ের কোলে ইত্যাদি। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিশোর উপন্যাস “মায়ের কাছে ফেরা” প্রকাশিত হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ডা. এম.এ মালেকের আমন্ত্রণে লিখি বঙ্গবন্ধুর কিশোর জীবনী। তার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন শিশু-সাহিত্যিক খালেক বিন জয়েনউদদীন, নিজে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে। এই বই লিখতে গিয়ে দিনে আঠারো ঘন্টাও আমি পরিশ্রম করেছি। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী মমতা দিয়ে প্রচ্ছদ এঁকে দেন। প্রকাশ করে ‘আগামী প্রকাশনী’। বঙ্গবন্ধু কন্যা দুই হাত পেতে বইটি গ্রহণ করেন আমার কাছ থেকে। আগ্রহভরে পড়েন এবং প্রকাশনী উত্সব করার নির্দেশ দেন। এই বইতেই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ক্লাস এইটে পড়া ছবি প্রকাশিত হয় এবং তাঁর ডাক নাম যে ‘খোকা’ তাও প্রথম উল্লেখিত হয়। ‘মায়ের কাছে ফেরা’ বাংলা ১৩৯৭ সালের বছরের সেরা কিশোর উপন্যাস হিসাবে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পায়। এটা লেখক হিসাবে বড় পুরস্কার কিন্তু এর চেয়ে আমি বড় সম্মানিত বোধ করি যখন কবীর চৌধুরী এই বই পড়ে বিজয় দিবস সংখ্যা বিচিত্রায় একটি নিবন্ধ লেখেন: একটি অভিনন্দনযোগ্য কিশোর উপন্যাস শিরোনামে এবং ভেতরে বই থেকে ছোট ছোট উদ্ধৃতি দিয়ে প্রশংসা করেন। আমি মুক্তিযুদ্ধ করিনি এজন্য একটা অপরাধ বোধ রয়েছে কিন্তু মায়ের কাছে ফেরা লিখে এই সান্ত্বনা পাই যে, পরের প্রজন্ম এই বই পড়ে জানতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস ও অপরিহার্যতা এবং গৌরব। কারণ এই বই একদিকে ইতিহাস অন্যদিকে নিটোল কাহিনী।