বয়ঃসন্ধিকাল মানব জীবনের কৈশোর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় এবং এই সময় মানুষ ভালোমন্দ বিচার করতে শেখে। কৈশোর তথা টিনএজদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে তাদের আচরণের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের দৈহিক সে পরিবর্তন তা মূলত হরমোনের প্রভাবে ঘটে থাকে। বয়ঃসন্ধির এ পর্যায়ে এসে একজন কিশোর বা কিশোরী হঠাত্ করেই নিজেকে পূর্ণাঙ্গ ভাবতে শুরু করে। অনেক সময় খারাপ চিন্তার জগতে হাবুডুবু খায়। ভালোমন্দ নিয়ে এ সময় তাদের মানসিক চেতনা বেড়ে উঠে। তাই বয়ঃসন্ধিকাল মানব জীবনের একটি প্রধান ধাপ। বিশেষ করে দেহের আকার-আকৃতি, আচার-ব্যবহারে মূলত পরিবর্তন ঘটে এই সময়ে। ১২ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত উচ্চ বিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে কিশোরদের বাড়ন্ত শরীরে তখন বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়। এ সময়ে কিশোর এ ছেলে-মেয়ে যৌন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে থাকে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে পরিবর্তনে অনেক সময় তারা ভয় পায়, লজ্জার কারণে কারো সাথে কোন কিছু খোলামেলা আলাপ করতেও অস্বস্তিবোধ করে। তবে স্থান, কাল ভেদে বয়ঃসন্ধিকালের সময় তথা বয়সের তারতম্য ঘটে। মানব জীবনের এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে গবেষণা করলো সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের ৪র্থ বর্ষ ২য় সেমিস্টারের চারজন নবীন গবেষক।
‘বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে উচ্চ বিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অবগত হওয়া এবং তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সকল সমস্যা সম্পর্কে জানা’ এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ এ চারটি জেলার বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ের মোট ১৪৭৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে উদ্দেশ্যমূলক পদ্ধতিতে ব্যবহার করে ১৬০ জন ছাত্র-ছাত্রীদের উপর জরিপ চালিয়ে দীর্ঘ ৬ মাসে এ গবেষণা করা হয়। দীর্ঘ এ গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: মিজানুর রহমান। গবেষক চার শিক্ষার্থী হলেন, মো: খায়ের উদ্দিন ভুঁইয়া, আক্কাস আলী, সিরাজুল ইসলাম ও মো: আতিকুর রহমান। এই গবেষণার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সামাজিক নমুনা জরিপ পদ্ধতি করেছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, বয়ঃসন্ধিকালীন এই সময়ে অধিকাংশ ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকার চর্মরোগ, বর্ণ, এগজিমা, চোখের এলার্জি, হাত ও পায়ের আঙ্গুলে ব্যথা, গুটি বসন্ত, কোমরে ব্যথা ও চুলকানো প্রভৃতি। তাছাড়া রয়েছে, হতাশা, উদ্বিগ্নতা,লজ্জা এবং একাকীত্ব বোধ।
এরমধ্যে বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে ১.২৫% ছাত্র-ছাত্রীদের ধারণা রয়েছে। আর ৯৮.৭৫% ছাত্র-ছাত্রীদের এ ব্যাপারে জ্ঞান নেই বললেই চলে। তবে দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে কোন বা কোনমতে পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে। এরমধ্যে যারা বয়ঃসন্ধিকাল বিষয়ে অবগত তাদের অধিকাংশই ধারণা পায় বন্ধুদের কাছ থেকে।
আবার বিভিন্ন যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে ৩৪.৩৭% শিক্ষার্থীরা মোটামুটি ৪৮.১২% অবগত এবং ১৭.৫% কিছুই জানে না। অপরদিকে গবেষণায় দেখা গেছে এসব গ্রামে ৮৮.৭৫% শিক্ষার্থীরা পুষ্টিকর খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণ পায় এবং ১১.২৫% দারিদ্র্য ও বিভিন্ন সমস্যাজনিত কারণে পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত। তাছাড়া স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কোন সমস্যা হলে এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা গ্রাম্য ডাক্তারের কাছ থেকে চিকিত্সা গ্রহণ করে। গবেষকরা দীর্ঘ এ গবেষণা শেষে প্রাপ্ত ফলের উপর ভিক্তি করে সরকারি, বেরসকারি সেবা প্রতিষ্ঠানসহ অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সুপারিশ উপস্থাপন করেন, যেগুলো বাস্তবায়ন ও কার্যকর হলে বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে ছেলে-মেয়েরা শারীরিক, মানসিক, পরিবেশগতসহ বিভিন্ন উপসর্গ ও সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে। সুপারিশগুলো হলো— দেশের বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে ডাক্তার অথবা প্যারামেডিক রাখা, উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর নিকটস্থ হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্য সেবার সুযোগ রাখা, প্রত্যেক এলাকায় একটি করে প্রাথমিক হেলথ কেয়ার প্রতিষ্ঠা করা, এতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানও উদ্যোগী হতে পারে। কেম্পেইন, সভা-সেমিনার ও জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যৌনবাহিত রোগ সম্পর্কে কিশোর-কিশোরীদের সচেতন করে তোলা। বয়ঃসন্ধিকালীন বিষয়ে স্বাস্থ্যগত ও মানসিক বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে বিষয় আরো বেশি অন্তর্ভুক্ত করা, বিশেষ করে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ছেলে-মেয়েদের মানসিক সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পিতামাতার পাশাপাশি পরিবারের বড় ও অন্যান্য সদস্যরা তাদের সাথে বন্ধুসূলভ আচরণ করা। শিক্ষকদের পাশাপাশি হাসপাতাল, সেবা সংস্থায় কর্মরত চিকিত্সক ও নার্সদেরও তাদের সাথে বন্ধুসূলভ আচরণ করা।
