অসহিষ্ণু রাজনীতি বিপর্যস্ত অর্থনীতি

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৪
একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কেন প্রয়োজন? যদি এ প্রশ্ন করা হয় তাহলে বলতে হয়, অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। রাশিয়ার এক প্রতিনিধি দল এসেছিলেন পোশাকখাতের অর্ডার দেওয়ার জন্য। তাঁরা দেশের অরাজকতা দেখে বিমানবন্দর থেকেই চলে গেছেন। তাতে দেশের যে ক্ষতি হলো, সে দায়ভার এখন কে নেবে? রাজনীতিতে যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হলো দেশপ্রেম। দেশের রাজনীতি যদি দেশের মানুষের ক্ষতি করে সেটা অপূরণীয়। সে কারণে দেশ এগিয়ে না গিয়ে পিছিয়ে যায়। দেশ জুড়ে চলছে এখন তীব্র অরাজকতা। রাজপথের আন্দোলন এখন দেশের মানুষের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। রাজপথ এখন ভয়ঙ্কর দানবে পরিণত হয়েছে। অহেতুক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দায়ভার কেন রাজনৈতিক দলের ওপর বর্তাবে না? তারা কেন এখন কাঠগড়ায় দাঁড়াবে না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে গার্েমন্টস সেক্টর। সেখানে অরাজকতার কারণে দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি সাধন হচ্ছে। রাশিয়া গোলযোগ দেখে ফিরে গেলো আর এ দেশ সম্বন্ধে যে ধারণা নিয়ে গেলো তা তার দেশের অন্য ব্যবসায়ীদের বলবে। তাতে তারাও এ দেশের পোশাক নিতে অনীহা দেখাবে। বিশ্বখ্যাত পোশাক কোম্পানি ওয়ালমার্ট এ দেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। তারা অন্য দেশের ক্রেতা হয়েছে। তার দেখাদেখি অন্যরাও দেশ ত্যাগ করবে। তখন কার স্বার্থে রাজনীতি করবেন এ দেশের রাজনীতিবিদরা? তাই অরাজকতার পথ পরিহার করে দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই হবে একটি অগ্রসর রাজনৈতিক ভূমিকা। কিছু পথভ্রষ্ট মানুষ অরাজকতার নেপথ্যের নায়ক। তাদের চিন্তা-চেতনার সঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে সরকারও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে পারছে না। সে কারণে হরতালের মতো ভয়াবহতা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দেশের গণতান্ত্রিক ধারা ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো দলের ওপর যদি আঘাত করা হয় তাহলে তার পরিণতি তেমন একটা ভালো হয় না। বিরোধী দলের নেত্রীর গুলশান কার্যালয়ে গুলির ঘটনায় প্রতিহিংসার আগুন জ্বলছে। এগুলো বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এহেন কালচার একটি গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে বিরাজ করতে পারে না। পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের এক পর্যায়ে তত্কালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বেনজির ভুট্টো নিহত হয়েছিলেন সন্ত্রাসীদের হাতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের লক্ষ্যেও গ্রেনেড হামলাসহ বেশ কয়েকবার আক্রমণ বা আক্রমণের পরিকল্পনা হয়েছে। বস্তুত জাতি এখন যে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, তাতে জাতীয় দুই নেত্রীসহ কারও জীবনই নিরাপদ নয়। সংঘাত-সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে চতুর্দিকে। রাজশাহীতে শিবিরের বোমা হামলায় পুলিশের এক কর্মকর্তার দুই হাতের কব্জি উড়ে গেছে। ওদিকে ছাত্রলীগ-শিবিরের সংঘর্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে রণক্ষেত্রে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। এসব সংঘাত-সংঘর্ষের এখানেই শেষ নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব মনে করছেন, গণজাগরণ মঞ্চের লাগাতার অবস্থান কর্মসূচির অবসান হওয়া উচিত। গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে বলেই মনে হয়। সরকার এতসব সংকট কীভাবে সামাল দেবে— তা এক বড় প্রশ্ন। জামায়াত-শিবিরের অপতত্পরতা সামাল দিতেই সরকারের হিমশিম অবস্থা। এর অতিরিক্ত বিএনপির আন্দোলন, হেফাজতে ইসলামসহ অন্যান্য ইসলামী সংগঠনের সরকারবিরোধী তত্পরতা ইত্যাদি মোকাবেলা করতে সরকার যদি কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে ব্যাপক সহিংসতার জন্ম হবে তাতে সন্দেহ নেই। সবটা মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন যে অবস্থায় রয়েছে, তাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে শুভবুদ্ধি জাগ্রত না হলে চরম খেসারত দিতে হবে জাতিকে। বস্তুত গণতন্ত্রও এখন চরম হুমকির মুখে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছে, তাতে হয়তো সাধারণ মানুষ আপাত মুক্তির লক্ষ্যে অশুভ জেনেও তৃতীয় কোনো শক্তিকে স্বাগত জানাতে পারে। বাঁচার তাগিদে মানুষ কীনা করতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আবারও আবেদন থাকবে, সংকট উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন। রাজনীতি জনগণের জন্য, সেই জনগণই যদি বিপন্ন বোধ করে, তাহলে সেই রাজনীতির কী অর্থ? এটা পরিষ্কার—রাজনীতিতে বিবদমান পক্ষগুলো যদি যার যার অবস্থানে অনড় থাকে, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে না। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে সবার মধ্যে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এই ছাড় কে কতটা দেবে, তা নির্ধারণের জন্য দরকার সংলাপ। আমরা বিশ্বাস করি, সত্ মানসিকতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসলে সংকট উত্তরণের একটা না একটা পথ বেরোবেই। নারায়ণগঞ্জ