পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলায় শুনানি শুরু হয়েছে কানাডার আদালতে। বাংলাদেশ সময় সোমবার মধ্যরাতে টরন্টো সিটির ডাউন টাউনে অবস্থিত ওল্ড সিটি হলে অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিস-এ শুরু হয় বহুল আলোচিত এই মামলার শুনানি। এতে রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি) পক্ষ থেকে অভিযোগের স্বপক্ষে প্রায় হাজার পৃষ্ঠার দলিল-দস্তাবেজ উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার মধ্যরাতে একই কোর্টে বিষয়টির ওপর ক্রস আর্গুমেন্ট বা যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা রয়েছে। দেশি-বিদেশি একাধিক সূত্রের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে এসব তথ্য। এদিকে কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলার শুনানি প্রত্যক্ষ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুই প্রতিনিধির কানাডা যাওয়া নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে দুদকের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করে কিছু বলা হচ্ছে না।
প্রসঙ্গত, কানাডার নির্মাণ তদারকি প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের সাবেক দুই কর্মকর্তা বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কানাডীয় নাগরিক ইসমাঈল মোহাম্মদ এবং ভারতীয় বংশোদ্ভুত কানাডীয় নাগরিক রমেশ সাহার বিরুদ্ধে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরামর্শক হিসাবে কাজ পাবার জন্য বাংলাদেশের সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ কতিপয় কর্তাব্যক্তিকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগের ভিত্তিতেই কানাডার আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ এই মামলার বাদি। মামলাটি দায়েরের আগে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে কানাডার পুলিশ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অন্টারিও প্রদেশের ওকভিলে অবস্থিত এসএনসি-লাভালিনের কার্যালয়ে এক অভিযান পরিচালনা করে এবং তাতে অভিযুক্ত রমেশ সাহার ব্যক্তিগত ডায়েরি (দিনপঞ্জি) এবং অন্যান্য নথিপত্র জব্দ করে। পরবর্তীতে রমেশ সাহা ও ইসমাঈল মোহাম্মদকে গ্রেফতার করা হয় এবং কিছুদিন পর তারা জামিনে মুক্তি পান। অবশ্য এই ঘটনার পর তাদের দুজনকেই এসএনসি-লাভালিন থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গত বছরের ২৫ জুন মামলাটির ওপর প্রথম দফা শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তখন অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় আলামত ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশকে সময় দেয়া হয় চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত। এ পর্যায়ে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে মামলাটির ওপর বিস্তারিত শুনানি শুরু হয়। তবে প্রথম দিনেই আদালতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, চলমান শুনানির বিষয়ে পরবর্তী আদেশ না দেয়া পর্যন্ত সংবাদ মাধ্যমে কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। অবশ্য শুনানিকালে আদালতে সাংবাদিকদের উপস্থিতির বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
জানা যায়, সোমবারের শুনানির সময় রয়েল কানাডিয়ান পুলিশের কর্মকর্তারা ছাড়াও অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির আইনজীবীগণ উপস্থিত ছিলেন। প্রথম দিনের শুনানিকালে টানা ৪ ঘন্টা ধরে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায় হাজার পৃষ্ঠার দলিল দস্তাবেজ উপস্থাপন করা হয়। শুনানির শেষের দিকে রমেশ সাহার আইনজীবী সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। দ্বিতীয় দিনে উভয়পক্ষের মধ্যে আর্গুমেন্ট শুরু হবে। আগামী ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত বিষয়টির ওপর শুনানি চলবে। এরপর আদালত মামলাটির ভবিষ্যত সম্পর্কে আদেশ দেবেন।
এদিকে কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলার শুনানি প্রত্যক্ষ করা এবং এ সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের লক্ষ্যে দুদকের পক্ষ থেকে দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের কানাডা যাওয়ার খবর প্রচার হলেও বাস্তবে তারা এখনো কানাডার ভিসা সংগ্রহ করতেই সক্ষম হননি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অবশ্য এ ব্যাপারে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হচ্ছে না। অনানুষ্ঠানিকভাবে বেশ কয়েকদিন আগেই বলা হয়েছিল যে, দুদকের আইনজীবী আনিসুল হক ও উপ-পরিচালক মির্জা জাহিদুল হক কানাডা যাচ্ছেন। এ জন্য ভিসা চেয়ে সিঙ্গাপুরে কানাডার কনসুলার অফিসে আবেদনও করা হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সাড়া মেলেনি। অথচ যে মামলার শুনানি প্রত্যক্ষ করতে তাদের কানাডা যাওয়ার পরিকল্পনা, সেই মামলার শুনানি ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
ওয়াকিবহাল একটি সূত্র জানিয়েছে, আইনজীবী আনিসুল হক ও দুদক কর্মকর্তা মির্জা জাহিদুল হকের ভিসার আবেদনের সঙ্গে দুদকের যে দাফতরিক চিঠি (জিও লেটার) সংযুক্ত করা রয়েছে, তাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তারা কানাডার মন্ট্রিয়াল ফেডারেল কোর্টে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলার শুনানি প্রত্যক্ষ করতে যাবেন। অথচ বাস্তবে মন্ট্রিয়ালে ফেডারেল কোর্ট বলে কিছু নেই এবং সেখানে এ ধরনের কোনো মামলার শুনানি হচ্ছেও না। আলোচ্য মামলাটির শুনানি চলছে টরেন্টো সিটির অন্টারিও কোর্ট অব জাস্টিস-এ। সুতরাং এ রকম একটি ভুল তথ্য সম্বলিত চিঠির কারণেই মূলত দুদক প্রতিনিধিদের ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
