দুই তারকার গল্প

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:৫৮
একজন অভিনয়শিল্পীকে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে যতটা কষ্ট করতে হয় তার চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয় সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে। জনপ্রিয় একজন শিল্পীর কাছে দর্শকদের প্রত্যাশার মাত্রা দিনকে দিন বাড়তে থাকে। চঞ্চল ও তিশার কাছেও বিষয়টি একই রকম। নিজের অর্জিত অবস্থানকে ধরে রাখার পাশাপাশি তা আরও সমৃদ্ধ করতে তারা দু’জনই এখন নিজেদের ভাবনা ও কাজের ধারা পাল্টে ফেলেছেন। প্রথমেই মুখ খুললেন চঞ্চল। তিনি বলেন, ‘আমি বরাবরই চরিত্রের ব্যাপারে একটু চুজি। অভিনয়ের জায়গা আছে, এমন চরিত্রে কাজ করতে ভালো লাগে। একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যতটা শ্রম দিতে হয় তাই দিতে চেষ্টা করি। কোনো চরিত্রে অভিনয় করে যদি নিজেই সন্তুষ্ট হওয়া না যায়, তবে তা কখনও দর্শকের মন জয় করতে পারে না।’ এবার তিশার বলার পালা। মৃদু হেসে তিনি বললেন, ‘আর্টিস্টরা আসলে একটু লোভী প্রকৃতির হয়। আসলে ভালো একটি চরিত্রের প্রতি লোভ কাটিয়ে ওঠা যায় না। তাই চরিত্র চুজিংয়ের কোনো শেষ নেই। আমি এখন গতানুগতিকতার বাইরের চরিত্রে কাজ করতে আগ্রহী। আনকমন, অফট্র্যাকের কিছু স্ক্রিপ্ট আমি খুঁজছি। যে স্ক্রিপ্টে ইমোশন আছে, ট্র্যাজেডি, রোমান্স, বেসিক্যালি রিয়েলিটি আছে—এ ধরনের কাজ খুঁজছি। দু’জন ছেলেমেয়ে কাছাকাছি হলো... একে অপরকে ফুল দিল... তাদের প্রেম হলো—এ ধারার কাজের প্রতি আমার আগ্রহ নেই। আমার দর্শকরাও নিশ্চয়ই আমার কাছে এখন ভিন্নধর্মী কাজ আশা করেন।’ এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হন চঞ্চল চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই তার গানবাজনা, আবৃত্তি আর নাটকের প্রতি একটা নেশা ছিল। পরে তার মঞ্চনাটকের প্রতি একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন আরণ্যক নাট্যদলের সদস্য হয়ে মঞ্চে কাজ করলেও টেলিভিশনের দর্শকরা তেমন চিনত না চঞ্চল চৌধুরীকে। বড় ভাই ডাক্তার অচিন্ত আর ভাবী ডাক্তার সুস্মিতার সংসারে চঞ্চল ব্যাচেলর জীবন কাটিয়েছেন অনেকদিন। নাটক করা, বেইলী রোডে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়াই ছিল চঞ্চলের প্রতিদিনের কাজ। এমনিতে আত্মভোলা মানুষ, তা ছাড়া নায়কোচিত ভাবভঙ্গিও ছিল না। সঙ্গত কারণে মেয়ে ফ্যানদের জ্বালাতনও সইতে হয়নি। এতে অবশ্য চঞ্চলেরও তেমন মাথাব্যথা ছিল না। চারুকলা থেকে পাস করে একসময় কোডা-ইউডাতে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ছেলেমেয়েদের আর্ট শেখানো আর অভিনয়ই ছিল তখন তার ধ্যান-জ্ঞান। প্যাকেজ নাটক আর বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার কল্যাণে চঞ্চলের সমসাময়িক অনেকেই সে সময় তারকা বনে গেছেন। চঞ্চলও ইচ্ছে পোষণ করতেন—আহ! আমারও যদি এমন সুযোগ হতো। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি আর সাধনার কারণে একসময় চঞ্চলও সুযোগ পেয়ে যান। তাকে সেই সুযোগ করে দিলেন বিশিষ্ট নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ‘মা’ শিরোনামে মোবাইল কোম্পানি গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে চঞ্চলকে মনোনীত করেন ফারুকী। অজোপাড়াগাঁয়ে বাস করেন মা। ছেলে শহরে চাকরি করে। ইচ্ছে থাকলেও যখন তখন মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে না ছেলে। তাই অনেকদিনের জমানো টাকা দিয়ে একটি মোবাইল কিনেছে। চারদিকে থৈ থৈ পানি। সেই মোবাইল সাথে নিয়ে লঞ্চে চড়ে মায়ের কাছে যাচ্ছে ছেলে। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে, ‘পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহভরা কোলে তুলে মা-গো বলো কবে শীতল হবো...’। এই বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার পাশাপাশি বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানটিতেও চঞ্চল নিজেই কণ্ঠ দিয়েছিলেন। গ্রামীণফোনের মমতা ছড়ানো সেই বিজ্ঞাপন বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই মিডিয়ায় তারকাখ্যাতি পেয়ে যান চঞ্চল চৌধুরী। বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাত্কার, নাটকে অভিনয় সব মিলিয়ে হঠাত্ দারুণ ব্যস্ত হয়ে যান তিনি। এই প্রসঙ্গে চঞ্চল জানান, ঈশ্বরের কৃপায় সেই যে তার ব্যস্ততা শুরু এখন পর্যন্ত আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অন্যদিকে তিশার শুরুটা হয়েছিল বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ দিয়ে। একসময় গায়িকা হওয়ার ইচ্ছে থাকলেও সময়ের প্রেক্ষাপটে আজ তিনি এ প্রজন্মের শীর্ষ অভিনেত্রীদের মাঝে একজন। নতুন শতাব্দীর শুরুতে বন্ধুদের নিয়ে গানের দল গড়লেও এ নিয়ে খুব একটা এগিয়ে যেতে পারেননি। তবে গানের প্রতি ভালোবাসাটা এখনও রয়ে গেছে। এ ঘটনার আগেই মেরিল লিপজেলের টিভিসির মাধ্যমে মডেল তিশার আত্মপ্রকাশ ঘটে। দর্শকনন্দিত এই বিজ্ঞাপনটির পর কেয়া কসমেটিকের কয়েকটি টিভিসি, বিশেষ করে নোবেলের সাথে পারফর্ম করার পর তারকা মডেল হওয়ার খ্যাতিটাও হাতের মুঠোয় বন্দী করেন তিনি। এ কথা বললে বোধ করি কোনো অত্যুক্তি হবে না যে, এমন কিছু বিজ্ঞাপনই তিশার ক্যারিয়ারকে করেছিল আলোকোজ্জ্বল। ৯৭-তে অনন্ত হীরার রচনা ও আহসান হাবীবের প্রযোজনায় ‘সাতপৌরে কাব্য’ নামক টিভি নাটকে অভিনেত্রী তিশার অভিষেক ঘটার পর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের মেধা ও অধ্যবসায়ের মেলবন্ধনে একে একে করে গেছেন দর্শকপ্রিয় অসংখ্য নাটক। সময়টা এখন এমন হয়েছে যে, পর্দায় তিশার উপস্থিতি দেখেই দর্শক টিভি সেটের সামনে বসেন। তাই তো কাজের প্রতি বেশ সচেতন হালের জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী। নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি এই জনপ্রিয় দুই অভিনেতা-অভিনেত্রী চলচ্চিত্রেও নিজেদের অভিনয়ের মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেন। ২০০৯ সালে গিয়াসউদ্দিন সেলিম পরিচালিত ‘মনপুরা’ ছবিতে অভিনয় করেন চঞ্চল চৌধুরী। এ ছবিতে অনবদ্য অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। সেই সাফল্য থেকেই অভিনয় করেন ওপার বাংলার খ্যাতিমান চিত্র নির্মাতা গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্রে। এবারেও তিনি ভালো অভিনয়ের জন্য প্রশংসিত হন। অপরদিকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ছবিতে কাজ করে তিশা দর্শকদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। ইতোমধ্যেই ছবিটি এশিয়ার অন্যতম দুটি চলচ্চিত্র উত্সব—পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সব ও ‘আবুধাবির’ মিডল ইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত হয়েছে। এরপর তিনি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত ‘টেলিভিশন’ ছবিতে অভিনয় করেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর দর্শকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই ছবি প্রসঙ্গে তিশা বলেন, ‘এই ছবিতে অভিনয় করে আমি সবার কাছ থেকে অনেক প্রশংসা পেয়েছি। সমাজের বিদ্যমান নানা ঘটনা নিয়ে এর গল্প বলেই দর্শকরা ভালোভাবেই এই ছবি নিয়েছে।’ এদিকে চঞ্চল চৌধুরী বর্তমানে অভিনয় নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। চঞ্চল ও তিশা দু’জনই একটি কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, তা হলো—কোনো শিল্পী যদি তার কাজটাকে অবহেলা করেন, কিংবা গুরুত্ব দিয়ে না করেন, তাহলে একসময় কাজও তাকে অবহেলা করে দূরে চলে যায়। আর এ কারণেই তারা যখন অভিনয় করেন, তখন সেখানে নিজের মন প্রাণ সঁপে দেন। দু’জনই তার প্রমাণ পেয়েছেন সব জায়গাতেই।