‘দিনের পর দিন মা আমার কলঙ্কের ভারে আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে’

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫৯
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের দেখেননি এ প্রজন্মের তরুণ-কিশোর-শিশুরা। কিন্তু তাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে বেড়ে উঠছেন নতুন প্রজন্ম। শহীদদের প্রতি যে ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা তারা ধারণ করছে অন্তরে, তা প্রকাশ পেল চিঠিতে। ‘বুক পকেটে রাখা হূদয়ের ভাষা’ গত ২০ ফেব্রুয়ারি তারা উড়িয়ে দিয়েছিলেন শহীদদের উদ্দেশে। সেই চিঠিরই কয়েকটি অনুলিপি গতকাল বুধবার প্রকাশ করল গণজাগরণ মঞ্চ। যে চিঠিতে তরুণ প্রজন্ম ‘দেশের মান রক্ষার’ প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এদিকে শিবিরের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে আজ বৃহস্পতিবার কালো পতাকা মিছিল করবে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল সন্ধ্যায় শাহবাগে মঞ্চের মিডিয়া সেলের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার। তিনি জানান, মিছিলটি শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে বাংলামোটর, মগবাজার ঘুরে আবার শাহবাগে ফিরবে। এ সময় সবার হাতে কালো পতাকা থাকবে। এছাড়াও সারাদিন গণজাগরণ মঞ্চে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে প্রতিবাদী গান এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলবে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গণজাগরণ মঞ্চে হলো ‘বুক পকেটের চিঠিগুলো’ শিরোনামে চিঠি পাঠের আসর শুরু হয়। শহীদদের প্রতি তরুণদের পাঠানো প্রতীকী চিঠি থেকে বাছাইকৃত কয়েকটি পড়েন আসাদুজ্জামান নূর, আহকাম উল্লাহ, শমী কায়সার, রেজিনা ওয়ালী লীনা, বেলায়েত হোসেন, রফিকুল ইসলাম এবং তামান্না তিথি। পঠিত একটি চিঠি ছিল কাকরাইলের শহীদ সন্তান লাকীর। চিঠিতে বাবার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘৪২ বছর আগে তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছো অজানা ঠিকানায়। তোমার শেষ রক্তবিন্দুটুকুও দিয়ে গিয়েছো দেশের জন্য। আজ আমি বুঝতে পারছি তোমার রক্ত বৃথা যায়নি। নতুন প্রজন্ম আমাদের সন্তানরা তোমার আত্মত্যাগ ভুলে নাই। আজ আমি গর্বিত শহীদ কন্যা হিসেবে। আমাদের সন্তানরা দেশের শত্রু রাজাকারের ফাঁসি দিবেই দিবে। সেই সাথে রাজাকারের দল জামায়াত-শিবিরকে করবে দেশ থেকে বিতাড়িত। অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল সুন্দর একটি সোনার বাংলা গড়বে আমাদের সোনার সন্তানরা। আব্বা তোমার রক্তদান আজ পূর্ণ সার্থক হতে চলছে।’ বদরুন্নেসা কলেজের ছাত্রী সুরমা শহীদদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা এই দেশে, তোমাদের এই সোনার বাংলাদেশে ফাঁসি দিয়েই ছাড়ব তাদের। তোমরা জেনে খুশি হবে যে, তোমাদের মতো আজো অনেক সাহসী যোদ্ধা আছে যারা বাংলার জন্য প্রাণ দিচ্ছে রাজীব তেমনি একজন যোদ্ধা। আমরা ১৯৭১ সালে ছিলাম না কিন্তু আজ এই মহত্ কাজে আমরা সবাই একত্র হয়েছি ১৯৭১ সালের দেশদ্রোহী রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে।’ মিজানুর রহমান নামে একজন লিখেছেন, ‘আজ বাংলা মায়ের ৩০ লাখ সন্তানের রক্তের ওপর সেই হানাদারদের দোসরদের অবাধ বিচরণ চলছে। আজো সেই জিয়া-মোস্তাকদের মত ইতিহাসের কলঙ্কের নীল-নকশা বাস্তবায়ন করার কাজ চলছে। দিনের পর দিন মা আমার কলঙ্কের ভারে আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে। কিন্তু ওরা জানে না আমরা প্রতিবাদ করতে জানি। সাঈদী, সাকা, কামরুজ্জামান, কসাই কাদেরদের বিরুদ্ধে বাংলা মায়ের সন্তানরা জেগে উঠেছে। এবার মা তোমরা কলঙ্কমুক্ত হবেই। এবার মুক্ত হবে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো স্বদেশ। এবার হানাদারদের দোসরদের হাত থেকে মুক্ত হবে তরুণ প্রজন্ম। এবার বিচার পাবে ৩০ লাখ শহীদ। এবার তরুণ প্রজন্ম ২ লাখ বীরাঙ্গনাকে ফিরিয়ে দিবে তার হারিয়ে যাওয়া গৌরব, আর আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে হবে না একজনকেও। এবার এসেছে ইনসাফের সময়।’ একজন প্রত্যয় ব্যক্ত করে লিখেন ‘এবার মা’কে ফিরিয়ে দেব তাঁর সোনার বাংলা। হে মহান পিতা তোমার সামনে বসে শপথ নিলাম এবার দ্বিতীয় বাংলা হবে আমাদের প্রত্যয়, দেশপ্রেম আর হায়েনার প্রতি হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশের ভাষা। জয় বাংলা।’ গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা মারুফ রসুল।