পয়লা বৈশাখ

বাঙালির দিনভর শিল্পকলা

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২০
বাংলা সনের যে ইতিহাস আমরা পড়ি, তাতে মনে হয় শুরুর দিকে নববর্ষ বাঙালির জন্য তেমন কোনো আনন্দের ব্যাপার ছিল না। বরং যতই এই দিনটি এগিয়ে আসত সাধারণ বাঙালিদের দুশ্চিন্তা ততই বেড়ে যেত। কারণ এই দিনের আগেই তাদের সারা বছরের খাজনাপত্র শোধ করতে হতো। তখনকার পয়লা বৈশাখ ছিল একটি ডেডলাইনের মতো; ওই দিনের আগে রাজাকে সব খাজনা শোধ দিতেই হবে। সম্রাট আকবর যে বাংলা সালকে একটু গোছানো রূপ দিয়েছিলেন, সেটা মূলত প্রজাদের কাছ থেকে সময়মতো খাজনা পাওয়ার জন্যই। আকবর বাঙালি ছিলেন না, কিন্তু অনুমান করি বাংলা নববর্ষের আগের দিনে বিশাল অংকের খাজনা পেয়ে ফুরফুরে মেজাজে তিনি নতুন বছর শুরু করতে পারতেন। কিন্তু এই খাজনা যাঁদের দিতে হতো, তাঁদের মনে নিশ্চয়ই সেদিন অত আমোদ আসত না। আর তা ছাড়া, পয়লা বৈশাখের ঠিক আগের দিন পর্যন্ত যাঁরা খাজনা শোধ করতে পারতেন না, তাঁদের ওপর নিশ্চয়ই নানা শাস্তি নেমে আসত। হয়তো পরবর্তী বছরের জন্য ফসলের জমিটুকু কেড়ে নেওয়া হতো। বাঙালি কৃষকের পিঠে দু-এক ঘা চাবুকও কি পড়ত না? বর্তমানে যাঁরা আয়কর দেন, তাঁরা জানেন কর দেওয়ার ব্যাপারটার মধ্যে কোনো রোমান্টিকতা নেই, শিল্পও নেই। দিতে পারলে এক বছরের জন্য বড়োজোর একরকম স্বস্তি আসে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিবছর ত্রিশ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর শোধ দিতে হয়; দিতে না পারলে কত রকম যে ঝামেলা এসে হাজির হয়, তার ঠিক নেই। তখনকার চৈত্র মাসের শেষ দিনে কৃষকের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখ বুঝতে হলে ত্রিশ সেপ্টেম্বর একবার নিকটস্থ করভবনে ঘুরে আসতে হবে। আর পয়লা বৈশাখ বুঝতে গেলে পয়লা অক্টোবরে কোনো আয়কর আইনজীবীর চেম্বারে একবার উঁকি দেওয়া যেতে পারে। দেখা যাবে, এই দুই স্থানেই মানুষ কপালে নানারকম ভাঁজ ফেলে সমবেত দুশ্চিন্তা করছে। শহুরে টাকাওয়ালা মানুষের খাজনা দেওয়ার এই দৃশ্য থেকে অবশ্য গ্রামের কৃষকের খাজনা দেওয়ার পুরো ব্যাপারটা বোঝা যাবে না। তবে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। এইসব ভালোভাবে দেখেশুনে তবে ভেবে দেখতে হবে, আমাদের কৃষক ‘পিতৃগণ’ বৈশাখ মাসকে আদৌ উদাত্ত সুরে বলতে পারতেন কি না, ‘এসো হে বৈশাখ...’! তবে সেসব দিন শেষ হয়েছে, এখন বাংলাদেশে বা বাংলাদেশের বাইরে বাঙালিদের কোথাও আর পয়লা বৈশাখের আগের দিন ধান দিয়ে খাজনা শোধ করতে হয় না। পয়লা বৈশাখের দিনটি এখন বলা যায় ‘ট্যাক্স ফ্রি’। বর্তমানে পয়লা বৈশাখ পরিণত হয়েছে পুরোপুরি একটি সাংস্কৃতিক দিবসে। সত্যি বলতে কি, বাঙালির এমন আর একটি দিনও নেই, যেদিন সে পুরোপুরি সাংস্কৃতিক হয়ে উঠতে পারে। তুলনা করে বুঝতে চাইলে পয়লা জানুয়ারির সাথে পয়লা বৈশাখকে একবার পাশাপাশি রেখে ভাবা যেতে পারে। ইংরেজি নববর্ষে যেসব ঘটনা-অঘটনা ঘটে, তাতে বরং আমরা অনেক সময় শঙ্কায় থাকি। ওই নববর্ষ শুরু হয় ঠিক মধ্যরাতে। বাংলাদেশের বাঙালিদের যখন লেপ মুড়ি দিয়ে সুখে নিদ্রা যাওয়ার কথা, তখন ইংরেজি নববর্ষ এসে হাজির হয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একত্রিশ ডিসেম্বর রাত বারোটা বাজার পর মানুষের সুস্থবুদ্ধিরও প্রায় বারোটা বেজে যায়। মধ্যরাতের ঠিক পরপরই কাউন্ট ডাউনের সাথে সাথে প্রবল চিত্কার দিয়ে এই বছরের সূচনা ঘোষিত হয়। তারপর থাকে প্রচুর আলো আর আতশ বাজির খেলা ও হইচই। এখান থেকেই শুরু হয় আসল পাগলামি, যে পাগলামি চৌকি দিয়ে রাখার জন্য পুলিশ ডাকা লাগে। অনেক স্থানে রাতভর চলে কারণবারি পান। ওই নববর্ষের আগের দিনটাও মূলত পরিচিত একটি রাতের নামে—‘থার্টি ফাস্ট নাইট’। বাংলা নববর্ষের আগের দিন চৈত্রসংক্রান্তি। থার্টি ফাস্ট নাইট আর চৈত্রসংক্রান্তির মধ্যে কত তফাত! পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের সব দিকেই যেন শিল্প। এই শিল্পপার্বণের শুরুটা হয় ভোরে, শাস্ত্রীয় ভাষায় যাকে ব্রহ্মমুহূর্ত বা সুবেহ সাদেক বলা চলে। পয়লা বৈশাখের ভোরে ঘুম ভাঙার সাথে সাথেই যদি মনে পড়ে, আজ বাংলা নববর্ষ, তাহলে অকারণেই মনটা ভালো হয়ে যায়। এই মন ভালোর সাথে সাথে মনে পড়বে বাঙালির শোভন ও সুন্দর সব পোশাক, গান অথবা খাবারের কথা। এ দিন সকাল থেকে বাঙালিরা যে পোশাক পরে, যে গান গায়, যে নৃত্য পরিবেশন করে, কিংবা যে অন্ন-ব্যঞ্জন আহার করে, তার সব কিছুই শিল্পশোভাময়। সকালে সারা দেশে নানান রূপে ও রঙে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা নামটাও কত সুন্দর। র্যালি শব্দের বাংলা এ তো নয়ই, শোভাযাত্রার কোনো প্রতিশব্দই যেন ভালো লাগে না। এই যাত্রায় থাকে শুধু অশেষ শোভার সমারোহ—ফুল ও পরাগের শোভা, শুভ্রতা ও রঙের শোভা, পংক্তি সুর ও নৃত্যের শোভা, তরুণ-তরুণী ও শিশুর শোভা। পোশাক, চুলের সাজ, নখের রং, শাড়ি, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, রঙিন চুড়ি, মাথাল মাথায় কৃষক, গেরুয়া রঙের পোশাকের বাউল, শারীর আল্পনা, বাহারি ব্যঞ্জন ও পিঠা, যেদিকে চোখ যায় সেখানেই পাওয়া যাবে বাঙালির শিল্পবোধ ও সৌন্দর্যের ছোঁয়া। পশ্চিমের নববর্ষে তারা নানা পশুপাখি, মাছ ইত্যাদির আকার দিয়ে খাবার বানায়। হয়তো কেক দিয়েই বানিয়ে ফেলল একটি বড় আকৃতির শূকর। আর থাকে নানারকম মদ মিশিয়ে তৈরি ককটেল। আমাদের পয়লা বৈশাখে এসব কথা মুখে আনতেও লজ্জা করে। আমরা যে ডাবের পানি খাই, মোড়ে মোড়ে যে বেলের শরবতের দোকান অথবা লেবু মেশানো আখের রস—এসব আয়োজনের একটা একটা করে ভাবলে বোঝা যায় উত্সবের দিনে এগুলো কত অসাধারণ হয়ে ওঠে। কত সামান্য এসব আয়োজন কিন্তু কত অসামান্যও। এত অল্পে যে এত প্রাচুর্য সৃষ্টি করা যায়, তা দেখতে হলে বাঙালির নববর্ষ দেখতে হবে। গত বছরের পয়লা বৈশাখে এক গ্রাম্য কৃষকবধূর একটি আয়োজন দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। এই কৃষাণীর গোয়ালে ছিল আটটি গরু। নববর্ষের সকালে তিনি তাঁর সব গরু নদীতে স্নান করিয়ে তাদের গলায় রক্তজবা আর রঙ্গনের মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন। দুটো বাছুরের কপালে দিয়েছিলেন বড় করে দুটো কাজলের ফোঁটা। প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে তিনি নাকি এই কাজ করেন। নববর্ষে আমাদের গ্রামে গ্রামে এ রকম অনেক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা হয়। গ্রামের দরিদ্র কৃষক থেকে রাজধানীর অট্টালিকার চুঁড়োয় বাস করা ধনাঢ্য বাঙালি—সকলের জন্যই নববর্ষে রয়েছে অসংখ্য শিল্প-উপচার; বাংলার নববর্ষ সত্যিই সর্বজনীন। নববর্ষে আমাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ যা করেন, তাও সুন্দর। নেহাত পানি ছিটিয়ে যে এত নির্মল আনন্দ করা যায়, বৈশাবি না দেখলে তা কখনও অনুভব করা সম্ভব নয়। নববর্ষে প্রত্যেক বাঙালি যেন এক-একজন শিল্পীতে রূপান্তরিত হন। কেউ কণ্ঠশিল্পী, কেউ বাদ্যশিল্পী, কেউ নৃত্যশিল্পী, কেউ সৌন্দর্যশিল্পী, কেউ পোশাকশিল্পী, কেউ শিশুশিল্পী, কেউ ফেরিশিল্পী আর কেউ ক্রেতাশিল্পী, কেউ রন্ধনশিল্পী, কেউ ভক্ষণশিল্পী কেউবা আবার প্রণয়শিল্পী; আর এসব শিল্পচর্চার যাঁরা ধার ধারেন না, তাঁরা সকলে হয়ে যান দর্শন ও শ্রোতৃশিল্পী। সকাল হওয়ার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশ যেন সুরের ভেরী বাজিয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। রমনার বটমূলে সকাল থেকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান হচ্ছে, আর বাসার টেলিভিশনে তা শুনতে শুনতে অনেকবারই আমার পয়লা বৈশাখের ঘুম ভেঙেছে। এই মধুময় জেগে ওঠার যে আনন্দ তার তুলনা হয় না। রমনার এই বর্ষবরণ এমন এক শোভন সৌকর্যের মেলা, যেখানে ছোট একটি শিশুও তার পুরো পরিবার নিয়ে সারা দিন আনন্দ করতে পারে। মাত্র দুই দশক আগেও গ্রামে গ্রামে ভাড়া করে ভিসিআর আনা হতো সিনেমা দেখার জন্য। গ্রামশুদ্ধ মানুষ মাঠে অথবা কারও বাড়ির উঠোনে সেই ভিসিআর দেখতে বসে যেতেন। সেখানে দেখতাম, সিনেমার নায়ক ও নায়িকা যখন গান শুরু করতেন এবং পরস্পরকে আলিঙ্গন করতেন কিংবা খুব ঘন হয়ে আবেগ প্রকাশ করতেন, তখন বয়স্করা অনেকে উঠে মিনিট পাঁচেক এদিক-ওদিক ঘুরে আসতেন। মহিলারা অনেকে হঠাত্ বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন; কেউ হয়তো হাই ছাড়তে ছাড়তে বলছেন, ‘আজকে কি বিস্যুদবার?’ অল্প বয়সের ছোকড়ারা কিছুটা ভয় ও কিছুটা আনন্দে এই আলিঙ্গন চেয়ে চেয়ে দেখত। কিন্তু তাতে তাদের বেশ লজ্জা ও সঙ্কোচ হতো। এখন অবশ্য এসব সকলের চোখ-সওয়া হয়ে গেছে। তবুও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আজও টেলিভিশনে হলিউডি-বলিউডি চুম্বন কিংবা খল চরিত্রের ধর্ষণদৃশ্য সপরিবারে দেখার মতো ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ হতে পারেনি। ইংরেজি সিনেমা দেখার সময় টেনশনে থাকতে হয়, কখন সবার সামনে ‘ইংরেজি চুম্বন’ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কখনো পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে এই অভিনব ধরনের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না। আমার বিশ্বাস আমাদের দেশের সবচেয়ে ধর্মভীরু ও পর্দানশীন পরিবারটিও পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে অস্বস্তিকর কিছু দেখার টেনশন থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। এই অনুষ্ঠানে বাঙালির জন্য অস্বস্তিকর কোনো দৃশ্য নেই। পয়লা বৈশাখ শুরু হয় সকালে, দিনেরই অনুষ্ঠান; ফলে এখানে আলোকসজ্জার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। মূলত, মাঠে মাঠে আর পথে পথেই এই অনুষ্ঠান হয়। আমাদের সব মাঠ এ দিন রূপান্তরিত হয় সবুজ অডিটরিয়ামে। এই নববর্ষ উদ্যাপনে কোনো রংমহল লাগে না। পৃথিবীর কোনো জাতির এমন নববর্ষ আছে, যাদের বর্ষবরণের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি শুরু হয় জ্বলজ্যান্ত একটি অশ্বত্থ গাছের ছায়ায়! সারা বছর ওই অশ্বত্থশাখায় অজস্র শিল্পীপাখিরা বসে গান গায়, নববর্ষের দিনে সেইসব পাখিদের সাথে যোগ দেয় শিল্পী-মানুষেরা। বাংলার সব পাখি ও মানুষের সব সুর ওই রমনার অশ্বত্থ গাছটির শোনা আছে। ওটি যেন বাঙালির গানের বটগাছ। পয়লা বৈশাখে বাঙালির পোশাকের প্রধান রং হয় সাদা। সাদা শাড়ি, সাদা জামা, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, সাদা ওড়না। সাদার পাশাপাশি লালও আছে—লালপাড়ের শাড়ি, লাল ওড়না, লাল আলতা, লাল মেহেদি এবং লাল নখ ও ওষ্ঠরঞ্জনী। এ ছাড়া দু-হাতভর্তি রংধনুর মতো রঙের চুড়ি। অধুনা লালের সাথে সবুজও দেখছি প্রচুর। পয়লা বৈশাখের বাংলার নারীদের পোশাক দেখে মনে হয় যেন আজ তারা কোথাও ধ্রুপদি নৃত্য পরিবেশন করতে যাচ্ছে। তাদের পায়ের কনিষ্ঠা ও চুলের খোঁপায় উড়তে থাকা চিকচিকে চুলটি যেন এ দিন নৃত্যশিল্পীর মতো সুন্দর হয়ে ওঠে। পয়লা বৈশাখের বাংলার শিশুরা যেন এখনই স্বর্গ থেকে নেমে আসা দেবশিশু। বাংলার মা, বাংলার কিশোর ও তরুণ-তরুণী, বাংলার শিশু ও প্রবীণতম মানুষটিকে যদি বাঙালির শ্রেষ্ঠতম মোহন রূপে দেখতে হয়, তাহলে চলে যেতে হবে বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এই সজ্জা ও সম্মিলনের কোনো কোরিওগ্রাফার নেই; কিন্তু কী সুন্দররূপে বাঙালি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে, পয়লা বৈশাখের দিনে তা বোঝা যায়। এমন স্বস্তিকা সুন্দর মাতৃরূপ, এমন প্রজাপতির মতো তরুণী, এমন দুর্বোধ্য সুন্দর কিশোর-কিশোরী, এমন ফোঁকলা হাসির দেবশিশু আর গাছের ছায়ায় চাদর বিছিয়ে গান গাইতে থাকা শিল্পীসমাজ—এই বাংলা ছাড়া আর কোথায় মিলবে! পয়লা বৈশাখে আমাদের ধুলোভর্তি রাস্তাগুলো হয়ে যায় চিত্রশিল্পীদের ক্যানভাস, আমাদের সকল চিত্রকর সেদিন ছবি আঁকার জন্য রং-তুলি হাতে রাস্তায় ছুটে যায়। আমাদের অশ্বত্থ আর বটের ছায়ায় এ দিন সৃষ্টি হয় অসংখ্য জলসাঘর, বাংলার তাবত্ শিল্পী সেখানে ঘাসের ওপর বসে গান গায়। চিত্রকর ও গায়কদের মতো আমাদের সকল গৃহিণী এদিন শিল্পীতে রূপান্তরিত হন। আটপৌরে হাঁড়ি-কড়াই আর বাসন-কোসন সম্বল করেই এদিন তাঁরা হয়ে ওঠেন এক-একজন শেফ। এদিন তিনি নতুন কিছু সৃষ্টি করবেনই। নববর্ষের পান্তা আর ইলিশ অথবা শুকনো মরিচ দিয়ে মাখানো আলুভর্তা—কিছু একটা নতুন তিনি রাঁধবেনই। পাশাপাশি হেলেঞ্চার সুক্ত, উচ্ছে ভাজি, আম-ডাল, পিঠা কিংবা পায়েস, পঞ্চশাখ, পঞ্চমিষ্টি, গব্যঘৃত, পঞ্চশস্য, পঞ্চফল—এসব অনিয়মিত পদের কিছু না কিছু বাঙালি গৃহিণী তাঁর আয়োজনে রাখেবেনই। অনেকে একভাড় দইও পাতেন। ঘোল টানাও হয়, এমনকি শহরের ভাড়া বাসায়ও। অনেকে অবশ্য পয়লা বৈশাখের খাদ্যসম্ভার নিয়ে খুব রাগ করেন। রাগ করেন এই কারণে যে, বাঙালি কখনো পান্তাভাতে ইলিশ মাছ খায় না, অথচ তাইই হয়ে উঠেছে পয়লা বৈশাখের ব্র্যান্ড খাবার। তাঁদের মতে, গরিবরা ইলিশ মাছ খাওয়া তো দূরের কথা, ছুঁয়ে দেখার সাহস পর্যন্ত পায় না। এ ছাড়া মাটির থালা আর মাটির গ্লাসে খাওয়াও তাঁদের রাগের কারণ। পান্তার মতো সস্তা খাবারের পাশাপাশি ইলিশের মতো দামি মাছ মাটির সানকিতে নিয়ে খাওয়ায় নাকি গরিবদের ব্যঙ্গ করা হয়। আমাদের মাছে-ভাতে বাঙালি বলা হয়, আর মাছ এবং ভাতের জোগান দেন মূলত জেলে এবং কৃষকেরা। কৃষকের জন্য পান্তা রাঁধতে যেমন কোনো বাড়তি খরচ হয় না, জেলের জন্য ইলিশ ধরতেও তেমনি বাড়তি খরচ হয় না। বাঙালির প্রধান খাবারের একটি মাঠে চাষ করে কৃষক পায়; অন্যটি চাষও করা লাগে না, নদী ও সমুদ্রে জাল ফেললেই উঠে আসে। আমরা শহুরে মানুষ সাধারণত বহুদিন আগে পরলোক গমন করা ইলিশ খাই। আমাদের জেলেরা খান সদ্য সদ্য, এবং অনেক ক্ষেত্রে খেতে খেতে তাঁদের এতে রুচিও থাকে না। যা-ই হোক, পান্তা-ইলিশ নিয়ে যাঁরা গোস্বা করেন, তাঁরা এতটা রাগ করার পরও প্রায়ই ‘সবার অনুরোধে’ ওই দিনের মতো পান্তা-ইলিশ খেয়ে নেন। বাঙালির চিরকালীন সমালোচনামুখরতা পয়লা বৈশাখে আরেকবার চর্চিত হয়। বিদেশে থাকা বাঙালিদের জন্য অবশ্য নতুন ঘটনা ঘটছে। টরেন্টোতে পয়লা বৈশাখের গড় তাপমাত্রা থাকে দশ ডিগ্রি সেলসিয়াস মতো। যেকোনো সময় তা শূন্য ডিগ্রিতে বা মাইনাসেও নেমে যেতে পারে। খাঁটি বাঙালিয়ানা করতে গিয়ে সেখানকার কেউ যদি আগের রাতে ভাত রেঁধে তাতে পানি দিয়ে রাখেন, তাহলে সকালে তা জমে বরফ-ভাত হয়ে যেতে পারে। নিউ ইয়র্কের তাপমাত্রাও পাঁচ ডিগ্রি থেকে বিশ ডিগ্রির মধ্যে ওঠা-নামা করবে। ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশে তাপ থাকবে দশ থেকে বিশ ডিগ্রির মধ্যে। বাঙালি সেখানে গেলে একাধিক জাম্পার গায়ে তবে তাকে বাইরে বেরোতে হবে। ইউরোপজুড়ে এখন তাপমাত্রা কখনো শূন্যে নামছে, কখনো বেড়ে পনেরো-বিশ ডিগ্রি হচ্ছে। ইংল্যান্ডে অনেক বাঙালির বাস, তাদেরও পয়লা বৈশাখ শূন্য ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রায় করতে হতে পারে। ফলে ইচ্ছে থাকলেও নেহাতই সাদা শাড়ি কিংবা সাদা পাঞ্জাবি পরে তাদের রাস্তায় বের হওয়া চলবে না। দরকার হবে মোটা কোটের। বরং সৌদি আরব কিংবা ইরাকে যাঁরা আছেন, তাঁরা এ দিন বাংলাদেশের মতো গরমের স্বাদ পাবেন। কিন্তু সেখানে কতটা ‘গান গেয়ে আর পান খেয়ে’ পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন সম্ভব, কে জানে। মেলবোর্নেও শীত চলছে। দশ-বারো ডিগ্রির মতো তাপ। মজার ব্যাপার হলো ওই প্রবল শীতেও সেখানকার বাঙালিরা পান্তাভাত খান। আর গায়ে কম্বল জড়িয়ে ডায়াস্পোরিক এই বাঙালিরা গাইতে থাকেন ‘তাপস নিঃশ্বাস বায়ে...’। প্রবল শীতের মধ্যে তাপস নিঃশ্বাস বায়ে গাওয়া কম সাহসের ব্যাপার নয়। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রধানতম নন্দনমেলা। সংগীত, বাদ্য, কবিতা, নাটক, আল্পনা, চিত্র, ভাস্কর্য, ঘুড়ি, মুখোশ, মঙ্গলপ্রদীপ, কুলা, মৃত্পাত্র, পান্তা-ইলিশ, মাটির গয়না, রঙিন চুড়ি, একতারা, মন্দিরা, মেহেদি—এসব অসংখ্য উপচার ও অনুষঙ্গ নিয়েই পয়লা বৈশাখ। পয়লা বৈশাখ নির্বিরোধ ও নম্র, অহিংস ও সুশোভন; এই একটি দিনে বাঙালি কল্পনার সমান সুন্দর হয়ে উঠতে চায়। পহেলা বৈশাখ অশেষ শক্তিমানও; সৌন্দর্য, শিল্প, সমপ্রীতি ও চারুচর্চার শক্তিতে শক্তিমান এই দিনটি। শিল্পকলা ও সংস্কৃতির শক্তি আসলে সার্বভৌম ও অনন্ত। কতবার কত ফরমান, রাজদণ্ড, রক্তচক্ষু ও বিস্ফোরক দিয়ে ধ্বংস করার চেষ্টা হয়েছে এই সৌন্দর্য-দিবসটি; কিন্তু প্রতিবারই দুর্দান্ত সুকুমার সৌন্দর্য নিয়ে টগবগিয়ে ফিরে এসেছে এই বিশাখা নক্ষত্রের দিন। পৃথিবীর সমস্ত বিস্ফোরকে আগুন লাগিয়ে দিলেও এই নক্ষত্রদিনের উত্তাপ ও আলো তাতে ম্লান হয়? হায়! বিস্ফোরক-দানব জানে না, নন্দন-দেবতার শক্তি আসলে কী!