ইটের তলে বন্দী রুহু

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২১
‘বাপজান কেফাতউল্লা, শোনো, এত বছর ধইরা তুমি অতি কঠিন দিনি এলেম শিক্ষা করছ। সেই শিক্ষা কামে লাগাইয়া এখন টাকা-পয়সা রুজি-রোজগার করবা, এইটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দেওয়া বিধান। দিনি এলেম হইতাছে একের ভিতর দুই। এই এলেম কামে লাগাইয়া ইহকালে টাকা ইনকাম করার সাথে সাথে পরকালের লেইগা অটোমেটিক সওয়াব ইনকাম হইয়া...’ ছেলে কেফাতউল্লার চোখে রাগের আগুন ঝলসে ওঠায় বাতেন মুন্সী চুপ মেরে যায়। চিত হয়ে শুয়ে চোখ বুঁজে সে নাকিস্বরে আল্লাহু আল্লাহু জপতে থাকে। বাপ বাতেন মুন্সি চোখ বুঁজে আল্লার নাম জপতে থাকার পরেও কেফাতউল্লার চোখের ভাষা পাল্টায় না। চোখের তারায় অন্য কথা নিয়ে সে বাপের মুখের দিকে অনেকক্ষণ নিরিখ বেঁধে চেয়ে থাকে। একসময় চোখের তারা থেকে আগুন মুছে বাপকে সে নরম গলায় ডাকে, ‘আব্বাজান, আপনার কি বিশেষ কোনো খানা-খাদ্য খাওনের ইচ্ছা হয়? যেমন ধরেন রুই মাছের পেটা কিংবা খাসির সিনা কলিজা। মনের মধ্যে তেমন খায়েশ হইলে আমারে কন, আমি বন্দোবস্ত করতাছি।’ ‘না, বাপজান। আমার গায়ে অতি সামান্য ঘুসঘুসা জ্বর। তিন দিন গেলে এই জ্বর একলাই ঠিক হইয়া যাইব। এই সামান্য জ্বরে আমি মরাপড়া রোগীর মতো বিশেষ খানা-খাদ্যের ফিকির করব কোন হিসাবে? তুমি আমারে অতি অধিক মহব্বত করো বইলা আমার সামান্য রোগে তোমার মনে কুডাক ডাকতাছে। তয় আমি আমার বংশের নিয়ম-রীতি তোমার চাইতে ভালো বুঝি। আমি যে বংশের ফরজন্দ, সেই বংশে নব্বই বছরের কম বয়সী কারও কাছে আজরাইল ভিইড়া সাহস পায় না।’ বাপের কথায় কেফাতউল্লা কিছু সময় চুপ করে থেকে বলে, ‘টিমটিমা জ্বর সব সময় আপনার গায়ের ভিতর আঠার মতন লাইগা থাকে। এইটা অতি মন্দ লক্ষণ। অ্যালোপাথি বড়ি খাইয়া এই জ্বর যাইব বইলা আমার মনে লয় না। আমি আপনার লেইগা হোমিওপ্যাথি ওষুধের বন্দোবস্ত করতাছি। আর ভালো কথা, জ্বর নিয়া ঘরের মধ্যে একলা শুইয়া আপ্পই-তাপ্পই করলে বিপরীত কিছু ঘটনের আশংকা। আমি এখন ডাক্তারের কাছে যাওনের পথে জামতলা বাজার থেইকা ময়মুরুব্বিরারে আপনার কাছে পাঠাইয়া দিতাছি। তারা সবাই এখন বাজারে চায়ের দোকানে মজুদ আছে। এইখানে আইসা তারা আপনার লগে বইয়া আলাপসালাপ করলে আপনার রোগ এমনি ভালো হইয়া যাইব।’ ‘এমন বেহুদা কাম কইরা আমারে সত্যি বিমারি বানাইয়া দিয়ো না বাপজান। আমারে মরাপড়া রুগি ভাইবা লোকজন ঘরের মধ্যে আইসা ভিড় করলে নিজেরে সত্যি উত্তর সিথান মনে হইব। ঘুসঘুসা জ্বর তিন দিনের বেশি থাকে না। কাল গোসল সাইরা ঝরঝরা শরীলে আমি নিজেই বাজারে গিয়া চা খাইয়া আসুম।’ বাপের কথা শেষ হওয়ার আগেই ছেলে কেফাতউল্লা লম্বা পা ফেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বাতেন মুন্সি কপাল কুঁচকে দরজার দিকে চেয়ে থাকে। তার চোখে সন্দেহের ছায়া। কিছুদিন যাবত্ মুন্সি তার ছেলের মনের ভাষা পড়তে পারছে না। ছেলে কেফাতউল্লার কথার গায়ে আলগা খোলস। মুন্সির মনে হয়, তার মধুমাখা কথার তলে অন্য কোনো ভীষণ কথা লুকানো আছে। ছেলের কথার খোলস ভেঙে শাঁস বের করতে না পেরে মুন্সির মনে এখন বেদিশা ঘোর। তার ইচ্ছা করে, কালকের জন্য অপেক্ষা না করে জ্বর গায়ে বিছানা ছেড়ে উঠে আজই জামতলা বাজারে গিয়ে বসে দশজনের সাথে গল্প করে আসে। মানুষজনের সাথে আলাপ করলে তার মনের মধ্যে ভয়ের আনাগোনা খানিকটা কমবে। গায়ের মধ্যে আলসি ভাব নিয়ে উঠি-উঠব করতে করতে মুন্সির চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে আসে। বাড়ির উঠান থেকে নেয়ামত হাজির চড়া গলার খাকারি শুনে মুন্সির অবেলার পাতলা ঘুম ধা করে চটকে যায়। নেয়ামত হাজি চড়া গলায় মুন্সিকে ডাক দিয়ে হনহন করে ঘরের মধ্যে উঠে আসে। বলে, ‘তিন দিন মোটে জ্বরে ভুইগা তোমার মনে আবোলতাবোল চিন্তার উদয় হওয়ার কারণ কী? তুমি কি মুন্সিগিরি ছাইড়া গুণিনের কাম ধরলা না কি? গুইনা-পইড়া নিজের মরণ-বাঁচনের তারিখ নির্ধারণ শুরু করলা, বিষয় বুঝলাম না। শোনো মুন্সি, আবোলতাবোল ভাবনা ছাইড়া দিয়া তুমি ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল হইয়া যাও, মিয়া। আল্লার উপর ভরসা রাখো, সব ঠিক হইয়া যাইব।’ কথা বলতে বলতে নেয়ামত হাজি হাত বাড়িয়ে মুন্সির কপালে হাত রেখে জ্বরের মাত্রা বোঝার চেষ্টা করে। তারপর হেসে বলে, ‘আরে মিয়া, তোমার তো দেখি সামান্য গাও গরম। এইটারে কেউ জ্বর কয় নাকি? তুমি দেখি শহরের মানুষের মতো সাহেবি ভাব ধরছ। শহরের মানুষ অসুখের গন্ধ পাইলে কাতর হওয়ার ভান করে। শোনো, শহরের ভাব রাইখা বিছনা ছাইড়া উইঠা পড়ো। আছরের নামাজ পইড়া বাইরে গিয়া হাঁটাকুটা করো। দেখবা, মাগরেবের আগেই তোমার শরীল শীতল হইয়া যাইব।’ নেয়ামত হাজি কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। বাতেন মুন্সি হাজির কথার আও-বাও বুঝতে পারে না। গায়ে সামান্য জ্বর আসায় তার মরণ-বাঁচনের প্রশ্ন দেখা দিল কেন, সেইটা মুন্সির মাথায় খেলে না। নেয়ামত হাজির কথার মধ্যে কোথায় কী একটা ঘাপলার গন্ধ মুন্সির নাকে লাগছে, কিন্তু বুদ্ধি খাটিয়ে সে বদ গন্ধের গুমোর ভাঙতে পারছে না। দুই দিনের সামান্য জ্বরে মুন্সির মনে মরণের চিন্তা উঁকি দিচ্ছে—এমন আজগুবি কথা হাজি কোথায় পেল? হাজিকে ডাক দিয়ে তার কথার মর্ম ভাঙার জন্য অনুরোধ করার সুযোগ হলো না। ‘কাম আছে মিয়া, অখন যাই’ বলে হাজি চট করে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালে মুন্সি তাকে পেছন থেকে ডাকাডাকি করে না। তবে হাজি চলে যাওয়ার পরেও মরা-বাঁচার আজব প্রশ্ন মুন্সির মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। মুন্সির মনে মরণের ভয় না থাকলেও ইদানীং ছেলের চোখে ভীষণ চাউনি দেখলে তার মনে মরণের বাড়া ভয় জাগে। বাতেন মুন্সি শোয়া ছেড়ে বিছানার ওপর উঠে বসে। আছরের ওয়াক্ত পার হয়ে গেছে। পড়ন্ত বেলার লালচে আলোর ফালি বাঁশের বেড়ার ফাঁক গলে বিছানার ওপর গড়িয়ে পড়েছে। মুন্সি উদাস চোখে বেড়ার দিকে চেয়ে আছে। বিকেলের নরম আলোর ওপর চোখ রেখে ছেলের কথা নিয়ে ভাবতে তার ভালো লাগছে না। ছেলে কেফাতউল্লার কথার গায়ে মরণের আঁধার। বিকেলের এমন সুন্দর আলোর সাথে মউতের মিল পড়ে না। চৌকি থেকে নেমে মুন্সি বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। দেখে, কেফাতউল্লা উঠোন পার হয়ে হাসিমুখে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার হাতে বাদামি রঙের কাগজে মোড়ানো হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি। ২. রাত পোয়ানোর সাড়া নিয়ে মোরগ ডাক দিতে ভীষণ পিপাসায় বাতেন মুন্সির বুকের ছাতি ফেটে যেতে থাকে। কিন্তু মুন্সির শরীর অচল। তার বুকে হাজার মন পাথরের ভার। তার বউ পাশে শুয়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মুন্সি তাকে ডাকবে বলে গলা তুলতে গেল কিন্তু তার মুখে শব্দ ফুটল না। সে হাত তুলে বউকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দিতে চাইল কিন্তু হাতে কোনো সাড়া পেল না। মুন্সির সমস্ত শরীর অচল-অবশ, কিন্তু তার মাথার মধ্যে হাজারটা হ্যাজাক বাতি জ্বলে গেছে। কেফাতউল্লার চোখের তারায় ঝলসে ওঠা আলগা আগুনের মানে সে এখন পষ্ট পড়তে পারছে। নিজের ভয়ংকর ভুল বুঝতে পেরে তার বুক চাপড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু সে বুক চাপড়াবে কী দিয়ে! তার দুখানা হাত মরণের ভারে অসার। ছেলেকে হেদায়েত করতে গিয়ে মুন্সি কী ভয়ঙ্কর ভুল করেছে, সেটা সে মরণের দুয়ারে দাঁড়িয়ে টের পাচ্ছে। দুই বছর ধরে কেফাতউল্লা গ্রামের মসজিদের ইমাম। গেল মাসে এক জুম্মাবারে সে জামাতে ইমামতির কাজ ফেলে জলভাঙ্গায় মন্তা শাহের মাজারের ওরসে গিয়েছিল। ওরশের তিন দিন সে মাজারে কাটিয়ে চার দিনের মাথায় বাড়ি ফিরল। মন্তা শাহের ওরশে খানাপিনার খুব রবরবা—এ কথা মুন্সিও মানে। কিন্তু ওরসের খানাপিনার রমরমা বছরে মোটে তিন দিন, আর মসজিদের ইমামতির চাকরি বছরে বারোমাস। ওরসের তিন দিন ছাড়াও কেফাতউল্লা ইদানীং ঘনঘন মন্তার মাজারে যাতায়াত করছে। মাঝে মাঝে ওয়াক্তের নামাজে ইমাম খুঁজে পাওয়া যায় না। বিনা ওজরে ইমামতির কাজে গাফলতি করলে মসজিদ কমিটির লোকজন যেকোনো দিন বিপরীত ভাবনা ভাবতে পারে। ছেলে কেফাতউল্লাকে মাজারের ওরস থেকে মন ফিরিয়ে স্থায়ী রুজি-রোজগারের পথে আনার জন্য মুন্সি তার কাছে মন্তা শাহের মাজারের গুমোর ভেঙে দেওয়া খুব জরুরি মনে করেছিল। সেই তাগিদ থেকে বাতেন মুন্সি সেদিন সন্ধ্যায় মাগরিবের পরে ছেলে কেফাতউল্লাকে ডেকে কাছে বসিয়ে বলে, ‘বাপজান, মসজিদের ভিত সত্যের উপরে শক্ত কইরা গাঁথা। মাজার খাড়াইয়া থাকে শয়তানের পায়ের উপর। মন্তা খাদেমের কবররে মন্তা শাহের মাজার বানানির ফন্দির মধ্যে মন্তার কোনো মাজেজা, কেরামতি নাই। এই কেরামতি তার পোলা সবুর মিয়ার। বিষয়টা তোমারে ভাইঙ্গা কইলে তুমি আমার কথার মানে সঠিক বুঝতে পারবা। সবুইরার বাপ মন্তা খাদেম কোনো কামেল লোক ছিল না। সে আমার মতো তার গাঁয়ের মসজিদের খাদেম ছিল। লোকে ডাকত মন্তা খাদেম। মন্তা খাদেম তার পোলা সবুর মিয়ারে এতিমখানায় রাইখা দিনি এলেম শিক্ষা দিছে। দিনি এলেম শিক্ষা শেষে সবুর মিয়া বাড়ি ফেরার সাত দিন পার না হইতে বেচারা মন্তা তিন দিনের জ্বরে ফট কইরা মইরা গেল। তার মরণের পরে সবুর মিয়া আছারি-বিছারি কান্দাকাটি শেষে বাজার থাইকা বাপের লাইগা কাফনের কাপড়ের লগে এক বস্তা ছোলা-বুট কিইনা ঘরে ফিরল। লোকে ভাবল, বাপের দাফন-কাফনের সাথে সাথে সে মোল্লা-মুন্সিরে কুলখানির খানা খাওয়ানির বন্দোবস্ত নিয়া ঘরে ফিরছে। আলহামদুলিল্লা। পোলার মনে অতিমাত্রায় আল্লা পরস্তি।’ কেফাতউল্লা তার বাপের মুখে এত লম্বা গল্প এর আগে কোনোদিন ধৈর্য ধরে শোনেনি। কিন্তু আজ তার কান কুকুরের মতো সজাগ। বাপের গল্পের মধ্যে সে টাকা বানানোর মাজেজার সুলুক সন্ধান পাচ্ছে। মন্তা শাহের ওরসে গিয়ে সবাই যখন তবারকের খিঁচুড়ি, গোস্তের গন্ধে মত্ত থাকে, কেফাতউল্লা তখন মাজারের দেয়ালের ফুটায় চোখ রেখে নিরিখ করে মেঝেতে টাকার পুঞ্জি দেখে। মাজারের ভেতর দুজন মানুষ সারাক্ষণ শতেক পদের নোট দু-হাতে জড়ো করে অকুলান। এবারের ওরসে টাকার নোটের ফাঁকে মেয়েমানুষের গলার স্বর্ণের হার পর্যন্ত মাটির ওপর পড়েছিল। ‘আব্বাজান, সবুর মিয়া যে ছোলার বস্তা সাথে নিয়ে বাড়ি ফিরল, তার সাথে মাজারের রহস্য কী? কথাটা ভাইঙ্গা বলেন।’ ‘আরে পুত, ছোলার বস্তার মধ্যেই তো মাজারের রহস্য। মন্তা খাদেমরে বাড়ির পাছে কবর দিয়া তার পুত সবুর মিয়া বাপের কবরের পাশ ছাইড়া আর নড়ে না। বাপের কবরের পাশে দিন-রাত সে ইবাদত বন্দেগিতে মশগুল। তার চারপাশে এতিমখানা থেইকা আসা ষন্ডা-গুন্ডা চেহারার আরও চার-পাঁচটা জোয়ান পোলা। মন্তার বউ তার বাপজাউট্যা পোলা সবুর মিয়ার কায়কারবার দেইখা অবাক। বেটি খেয়াল কইরা দেখে, জিকির আজগারের ফাঁকে ফাঁকে পোলাগুলা ভাটির ঝোপে লুকাইয়া রাখা ছোলার বস্তার গায়ে বদনা দিয়া পানি ঢালে। মন্তার বউ পুতের কামের আও-বাও বোঝে না। আবার পুতের মারমুখি ভাব দেইখা মুখ ফুইটা পুতেরে কিছু জিগাইতে সাহস পায় না। তয় পুতের কাজের মধ্যে রহস্যের গন্ধ পাইয়া বেটি তার উপর নজরদারি করতে থাকে। বেটি গভীর রাতে দেখে সবুর মিয়ার দল কবরের মাটি সরাইয়া ছোলার বস্তা মুর্দার গায়ের উপর রাইখা ফের মাটিচাপা দিল। সবুরের মা সেই বেলা পুতের কামের মানে বুঝল না। কুলখানির মিলাদের সময় মন্তা খাদেমের কবর বিকট আওয়াজে ফাইটা গিয়া কবরের ছাউনি যখন ছত্রখান হইল, সেই বেলা বেটি সব গুমোর টের পাইল। তয় জানের ডরে সে মুখে কুলুপ দিয়া বইয়া রইল। এতিমখানা থেইকা আসা সবুর মিয়ার সাঙ্গোপাঙ্গ কবর ফাটনের সঙ্গে সঙ্গে লাইলাহা ইল্লা আন্তা রবে জিকির তুইলা সালু কাপড় দিয়া কবর ঘিইরা খাড়াইয়া গেল। ব্যাস। ঘটনা শেষ। মন্তার কবর ফাটার গল্প দ্যাশদিগালে আগুনের মতো ছড়াইয়া গেল। বাপ মরণের তিন মাসের মাথায় সবুর মিয়া বড়লোক। তিন মাসে তার মাজার-ব্যবসা রমরমা জইমা গেছে। মন্তা খাদেমের কবরের গায়ে বাঁশের ছাউনির বদলে ইট-সিমেন্টের পাক্কা মাজার শাঁ শাঁ কইরা খাড়াইয়া গেল। বাঁইচা থাকতে অতি সাধারণ মন্তা খাদেম ইটের তলে চাপা পইড়া হইল মন্তা শাহ।’ ‘ছোলার বস্তার রহস্য আপনে এখনও ভাঙ্গেন নাই। কবর ফাটার আওয়াজের সাথে সেইটার যোগ আছে। ছোলার বস্তার গুমোর আগে ভাঙ্গেন, পরে অন্য কথা।’ ‘বাপের লাশ লইয়া পুতের ব্যবসার কথা কী কমু, বাজান। এই গুনাগারির কথাা কইতেও লজ্জা, শুনতেও লজ্জা। তবুও তোমারে বলি, শোনো। পানিতে ভেজা ছোলার বস্তার মুখ টাইট দিয়া বাইন্ধা সবুর মিয়া বাপের কবরে ঢুকাইয়া দিয়া দলবল রেডি রাইখা বইসা ছিল। মুর্দার গায়ের গ্যাস আর বস্তাবন্দী ভেজা ছোলার গ্যাস মিইশা এক দিনের মধ্যে মন্তার কবর হইয়া গেছে একটা অ্যাটম বোমা। গ্যাসের চাপে কবর বিকট আওয়াজে ফাইটা যাইতে তার পুতে গল্প কইল...’ কেফাতউল্লা এর চেয়ে বেশি আর শুনতে চায় না। বলে, ‘আসল ঘটনা ঘইটা যাওয়ার পরে গল্পের অভাব হয় না। মরা মানুষরে পির-ফকির বানানির আসল মাজেজা সাইরা ফেলার পরে একটা ক্যাঁচড়া পোলায়ও হরেক পদের মারফতি গল্প বানাইতে জানে।’ এন্তার চিন্তা বাদ দিয়ে বাতেন মুন্সি অসার শরীরে নিজের মনে তার নিজের বাঁচা-মরার হিসাব মেলাতে শুরু করে। সে ভাবে, কেফাতউল্লা পয়লা বাজারে বসে তার বাপের মরণের খবর আগাম জানান দেওয়ার কাজ সেরে নিয়েছে। তারপর কেফাতউল্লা হোমিওপ্যাথি ওষুধের নামে বিষ কিনতে শহরে গেছে। শিশিভরা বিষের সাথে নিশ্চয়ই এক বস্তা ছোলা কিনে সে বাড়ির পাছে চারা বট গাছের তলে লুকিয়ে রেখে বাড়িতে ঢুকেছে। বস্তার মাজেজা তিন দিন পরে লোকে জানবে। তার আগেই আরেক মাজেজার রব ফাটতে শুরু করবে। লোকজন আজ তার লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বলবে, বাতেন মুন্সি কামেল মানুষ ছিল। না হলে দু-দিনের ঘুসঘুসা জ্বরে তার মরণ হবে, এমন খবর সে আগাম জানল কীভাবে। মন্তা খাদেমের কবর ফাটার আওয়াজ বাতেন মুন্সি লোকমুখে শুনেছে। সেই আওয়াজ সে নিজকানে শোনেনি। বাতেন মুন্সির নিজের কবর ফাটার বিকট আওয়াজ তার কানে আগাম বাজতে থাকে। কবর ফাটার আওয়াজ কানে বেজে উঠতে ভয়ে মুন্সির গা ঘামে ভিজে ওঠে। তার মনে হয়, শীতল মরণ চৌকির পায়া বেয়ে তার সিথানে এসে বসে আছে। এই মরণ আজরাইলের হাতে জান কবচ হওয়ার মতো সোজা মরণ নয়। রোগ-বিমারে মরণ হলে আজরাইল মানুষের রুহু হাতে খোলা আসমান বেয়ে আল্লার দরবারের দিকে উড়ে যায়। সেই মরণের মধ্যে মুক্তির সুখ। মুন্সি ভাবে, তার নিজের রুহু আজরাইলের হাত ফসকে ছেলের হাতে বন্দী। তার বন্দী রুহু কোনোদিন পক্ষীর মতো আসমানে উড়াল দিতে পারবে না। তিন মাসের মধ্যে সেটা মাজারের ইটের তলে চাপা পড়বে। রোজ কেয়ামত পর্যন্ত রুহু সেখানেই চাপা পড়ে থাকবে। বুকের ওপর হাজার মণ পাথরের চাপে মুন্সির দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে।