বুড়িগঙ্গার পানি ঠিক কতটা কালো, তা পত্রিকার ছবি প্রমাণ করে না। নৌকায় উঠেই মনে হলো, এ পানিতে পড়লে ডুবে মৃত্যুর অপেক্ষা করতে হবে না একঢোক পেটে গেলে মৃত্যু এমনইতেই নিশ্চিত। তবে এতক্ষণ যা দেখেছি, সেই রঙ আর নৌকা পার হয়েই যা যা দেখব সেই ইচ্ছেতে মেনে নিলাম বুড়িগঙ্গাকে। সদরঘাটে গিয়েছিলাম শাঁখারী বাজারের মিষ্টি খেয়ে আর বাংলাবাজারের বই দেখে ঘুরতে ঘুরতে। তবে যায়গাটা আকর্ষণীয়। ব্যস্ততা, লঞ্চের শব্দ, জলপথ পাড়ি দিয়ে কারও ঘরে ফেরা, কারও বিদায়, অনেকের ভেতর একলা হওয়া আর সবকিছু মিলিয়ে জীবনের এক আশ্চর্য ঘ্রাণ পাওয়া যায় এখানে। বাহারি দোকান রঙিন- বেকারির তিনকোনা বিস্কিট থেকে শুরু করে টিয়ে রঙের মশারি পর্যন্ত রয়েছে। ঘাটে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের পরিকল্পনা হলো—নদী পার হয়ে জিঞ্জিরা যাব। ওখানে ঘিঞ্জি গলির মাথার ওপর লক্ষ-কোটি তার ঝোলানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা সেমাই আর মোবাইল তৈরির কারখানা দেখব। মাঘের রোদ পিঠে চেপে নদী পার হয়ে জিঞ্জিরা। রাস্তার পাশে সদ্য গজানো চায়ের দোকান। পৃথিবীর কুিসততম চা খেতে খেতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, যেভাবেই হোক স্বচ্ছ নদী না দেখে আজ ফিরবন না বাড়ি। বুড়িগঙ্গার প্রতিশোধ আরকি! দোকানের অন্য চা-খোররা বললেন, কদমতলী বাসস্ট্যান্ড কাছেই, বান্দুরা যাওয়া যেতে পারে।
দিনে দিনেই ফেরা সম্ভব। অতএব রিকশা ও নৌকার পর শুরু হলো বাসযাত্রা। কিছুক্ষণ পরই বাতাসের ঘ্রাণ বদলাল। বাইরে তাকিয়ে দেখি হলুদ কার্পেট। সরষে ফুলে সয়লাব দুনিয়া। কেরানীগঞ্জের এই মাঠগুলো দেখলে হটাত্ মনে হতে পারে, পৃথিবীতে সরষেই একমাত্র ফসল এবং এ ছাড়া অন্য কোনো ফসলের চাষ অসম্ভব। আমাদের পাশের সিটে বসা নেলপলিশ দেওয়া এক রমণী হাত নেড়ে নেড়ে জানতে চাইল গন্তব্য কী? বললাম জানি না। এলোমেলো ঘুরতে বেরিয়েছি। প্রথমে বুঝল কি বুঝল না কিছুটা সময় নিল। তবে আমি কিন্তু বুঝেছি, আমার সুদর্শন বন্ধু কাজলের জন্য তার একটা বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেটা অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেল, আমাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে কাজলকে সে অতি আগ্রহে ব্রিজ, লালশাক, ইটের ভাটা, গাব গাছজাতীয় জিনিসপত্র দেখিয়ে যাচ্ছে। কাজলও অতি উত্সাহী। তার ওপর ও এসেছে কয়েক বছর পর আমেরিকা থেকে। সে ধুলা দেখলেও আহা আহা ভাব করে। সম্ভব হলে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এক রিকশায় ঘোরে। দুই অতি উত্সাহীর কণ্ঠেই হটাত্ ‘তুলসীখাল’ শব্দটা কানে এল। উঁকি দিয়ে দেখি, সরষে ক্ষেত থেকে আরও খানিকটা নেমে প্রায় গা-ঘেষে যাচ্ছে স্বচ্ছ জলের ধারা—ধলেশ্বরী। নদীর ওপর ব্রিজ, এই ব্রিজের নামই তুলসীখাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাঁশি কবিতা পড়েনি, এমন কবিতাপ্রেমিক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে কবিগুরু যখন বলেছিলেন, ‘ধলেশ্বরী নদতীরে পিসিদের গ্রাম তার দেওরের মেয়ে অভাগার সাথে ছিল তার বিবাহের ঠিকঠাক’ নিশ্চই সেই ধলেশ্বরীর জৌলুস ছিল অন্যরকম। ক্ষীণ হয়ে এলেও একটাই সান্ত্বনা যে এর জল স্বচ্ছ। ধলেশ্বরী নামটা যে কে রেখেছিল, তার রুচির প্রশংসা করতেই হয়। ব্রিজ পার হতেই আবার একটা নদী। এই নদীর ওপরও ব্রিজ। কায়কোবাদ সেতু আর নিচে বয়ে যায় ইছামতী। আবার শুরু হলো হলুদের আতিশয্য। তারপর খানিকটা ফাঁকা মাঠ। আরও ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট পার হয়ে বাস থামল বান্দুরা বাসস্ট্যান্ডে। আগেই বলেছিলাম রমণীর আগ্রহের কথা। গল্পে গল্পে এতক্ষণে সে জেনে গেছে, এখানে স্রেফ মনের খেয়ালে ঘুরতে আসা। যথেষ্ট আগ্রহ নিয়েই তাদের বাড়িতে খাওয়ার অনুরোধ করল। যাহোক, আমরা তার মুখ থেকেই জেনেছি যে, কাছাকাছি দুটো দেখার মতো গির্জা রয়েছে। একটা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঁয়ে আর অন্যটা ডানে। দুটোই পুরোনো, তবে বাঁয়ের গির্জাটা দেখতে হলে নদী পার হতে হবে আর এটা নাকি বলতে গেলে বনের ভেতরে। আবারও নদী-বনের হাতছানি। শুরু হলো রিকশা নিয়ে ঘাট খোঁজা। মিনিট পনেরোর রাস্তা। সত্যি বলছি, এমন পথে আমি কোনোদিনও যাইনি। বন নয় তবে বনের পথ আর তার ভেতরে ইট বিছিয়ে রাস্তা। বলতে গেলে বাঁশের ঝাড়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। রিকশাওয়ালাকেও মনে হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক কোনো মানুষ যার নিশ্বাস পর্যন্ত শব্দহীন। ভরদুপুর; পাখির শব্দ, ঘুঘু ডাকছে। আমরা হারিয়ে ফেলেছি শব্দ। কোথায় যাব মনে নেই। বেলা ছোট। কিছুক্ষণ পরই দেখা গেল দু-একটা মানুষ। তারপর চিকন একফালি নদী। কয়েকটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে পারে। ঘাট বলে যা বোঝায়, তার চিহ্ন নেই। অনেকটা উঁচু রাস্তা থেকে ঢালের দিকে নামতে হয়। বোঝা গেল বর্ষাকালে ইছামতীর এই ধারা মোটেও এত সুবোধ থাকে না। শুষ্ক মৌসুম বলে পানি নেমে গেছে অনেকটা। বিশাল এক ন্যাড়া বেল গাছের তলে দুটো বাঁশ গেঁড়ে ছালা বিছিয়ে বসে আছে এক তরুণ। ঘাটের ঠিকাদার। ঘাটের ভাড়া জনপ্রতি ৫ টাকা। প্রায় কাদার ভেতর পা দিয়েই নৌকায় উঠলাম। বড়জোর মিনিট পাঁচেক লাগল পার হতে। ঠিক মাঝখান দিয়ে যাবার সময় দু-দিকে তাকালে বোঝা যায়, নদী রঙধনুর মতো বেঁকে গেছে দু-পারে। ওপারে নেমে হাঁটা শুরু হলো। হাসনাবাদ আসার আগে আমার ধারণা ছিল, বাংলাদেশের সমস্ত গ্রাম-মফস্বল-শহরের একই চেহারা। কিন্তু এখন তা বদলে গেল। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ রয়েছে, অধিকাংশ মানুষ থাকে মধ্যপ্রাচ্যে আবার মাদ্রাসাও আছে কয়েকটা। অথচ অদ্ভুত একটা শান্ত গ্রাম। ‘এই তো সামনে গির্জা’ শুনতে শুনতে অনেকটা পথ হেঁটেছি। সত্যি বলতে কি, এতটা পথ বুঝলাম সূর্য নরম হয়ে আসছে দেখে। এতটুকুও ক্লান্ত হইনি তখনো। এমন নির্জন বনপথ আর বিশুদ্ধ বাতাস মানুষকে সহজে ক্লান্ত করে না। শুনশান নীরবতায় মনে হচ্ছে কোনো বাড়িতেই মানুষ নেই। প্রথম দেখায় মনে হবে, কত যুগ আগে একদল মানুষ থাকবে বলে বনের ভেতর ইচ্ছেমতো ঘর-বাড়ি করেছিল; আবার খেয়ালের বশে চলে গেছে অন্য কোথাও। ধারে-কাছে কেউ নেই যাকে জিজ্ঞেস করব, ঠিক পথে যাচ্ছি কি না। তবে এরা খুব শৌখিন—সেটা বোঝা যায়। প্রতিটি টিনের ঘরের চালের সাথে কেটে কেটে নকশা বসানো। আর এক-একটা বাড়ি এক-একটা গাছের সাম্রাজ্যের ভেতর। এসব দেখতে দেখতে টের পেলাম সূর্যের তেজ পুরোই শেষ । পা চালাতে হবে দ্রুত। অনেকক্ষণ ধরে এক বৃদ্ধাকে দেখা যাচ্ছে লাঠি ভর দিয়ে এক-পা দু-পা করে হাঁটছেন। অগত্যা তাঁকেই জিজ্ঞেস করলাম, গির্জাটা কোন দিকে? শতবর্ষী বৃদ্ধা হাত দিয়ে যা দেখালেন তার মানে আমরা অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। আবার উল্টো দিকে হাঁটো এবার। আসলে গির্জার পথটা এত ক্ষীণ একটা রাস্তার ভেতর ঢুকে পড়েছে, তার ওপর চারপাশে গাছ-গাছালিতে ছাওয়া; আমরা বুঝতেই পারিনি। কিছু দূর যাবার পরই বিশাল বাউন্ডারি। প্রবেশের মুখেই বিশাল ফটক। তার ওপরে রয়েছে নিজের মৃত্যুর জন্য নিজেই বহন করে নেওয়া যিশুর ক্রশের প্রতিকৃতি। তার নিচে কাচের বাক্সে যিশুমূর্তি। মূর্তিকে ঘিরে ত্রিভুজ নকশায় লেখা, আমি উত্তম মেষপালক, সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার গির্জা। স্থানীয় নাম গোল্লার চার্চ। ভেতরে ঢুকেই মনটা কেমন হয়ে গেল। একপাশে মিকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত সেই ‘পিয়েতা’র রেপ্লিকা, অন্যদিকে মা মেরি দাঁড়িয়ে আছেন। দুটো মূর্তির পাশ দিয়ে সবুজ রঙের লোহার গেট। মোটা করে লেখা রয়েছে ‘মানব তুমি ধুলি, ধুলিতেই যাবে মিশে, ধার্মিকের আত্মা ভগবানের হাতে।’ সমাধির পথ। ভেতরে সারি সারি কবর। প্রতিটি কবরের গায়ে নম্বর দেওয়া। বাঁ-হাতের ভেতর লুকানো জপমালা নিয়ে বৃদ্ধা বসে আছেন একপাশে। যিশুর নাম জপছেন। ৫৮ নম্বর কবরে হয়তো তাঁর কোনো উত্তরসূরি বা কে যানে একমাত্র সন্তান। ওদিকে এক ছোট মেয়ে কবরের আবর্জনা পরিষ্কার করছে। সন্ধ্যার আলোয় সারি সারি কবরের শত শত সাদা ক্রুশ। শীতের হাওয়ায় পাতা উড়ে পড়ছে বনের ভেতরের কবরের গায়ে। আমাদেরও কথা নেই। এমন জায়গায় মানুষের শব্দ থাকে না। মৃত্যু কী, সেটা বলে যাওয়ার ক্ষমতা ঈশ্বর কাউকে দেননি কিন্তু একদিন যে সমস্ত দেখাই শেষ হয়—এটুকু বোঝার সব উপায়ই ঈশ্বর জীবনে রেখেছেন। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলাম, বেশ কিছু ক্রুশের ওপর ঝুলছে প্রার্থনার বাণী, ফুলের মালা। চলে এলাম উল্টো দিকের মাঠে। সেখানে প্রার্থনার খোলা জায়গা, বেদি। একটা ছাই-রঙা মূর্তি সন্ধ্যার আলোয় কালো দেখাচ্ছে। বারবার চোখ পড়ছে কবরগুলোর সাদা ক্রুশে। গোল্লা ধর্মপল্লির ইতিহাস পাথরে খোদাই করা। এর পেছন দিকটাতে কনভেন্ট আর প্রার্থনার মূল স্থান। ১৮৪৫ সালে গির্জাটি তৈরির পর কয়েকটা ঘূর্ণিঝড় আর ইছামতীর ভাঙনের মুখে পরে। ঝড়ের একটা আশ্চর্য মিল পেলাম। ১৮৬১ ও ১৯৬১ তে সবচেয়ে বড় ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়ে বিধ্বস্ত হয় গির্জা। এর পুরোনো নাম ছিল ‘মারিয়ার নির্মল হূদয়ের গির্জা’। ১৯৬১ সালে নতুন করে করা হয়েছে গোল্লার চার্চ। আমরা দুজনই অনেকটা ঘুরে আবার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। সারা দিন কত-শত কিছু পার করে সন্ধ্যার মুখে দাঁড়িয়ে আছি একটা সমাধির সামনে। শীতের বাতাস হু হু করে উঠছে আর ক্রুশের নিচের শুকনো পাতা গড়িয়ে যাচ্ছে। কুয়াশা পড়ছে, আমরা নিঃশব্দে অপেক্ষা করছি মৃত শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে। ইছামতীর পাশে কবরের ওপর ছড়িয়ে রাখা গোলাপের রং আরও অস্পষ্ট হয়ে আসছে।
ফিরতে হবে একই পথে। বেরিয়ে এলাম। অপরিকল্পিত পথে ঘুরতে গেলে অনেক কিছু দেখা হয় আবার অনেক কিছু থাকে না দেখা। যে গির্জাটি দেখতে যাইনি, সেটার নাম হোলি রোজারিও চার্চ। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। পর্তুগিজরা যাবার আগে ৪টি চার্চ বানিয়েছিল এ দেশে; তারই একটা। সংস্কার করা হলেও আদি ভাবটা বজায় রাখা হয়েছে। তাই ওটাতে নাকি একটা খুব পুরোনো গন্ধ আছে। বুঝলাম, আবারও আসতে হবে এখানে। এখন নদী পার হতে হতে রাত নামার আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। ইছামতীর জলে সূর্য ডুবেছে। ফিরে এলাম বনের পথ ধরে। সোজা বাসস্ট্যান্ড, ধলেশ্বরী আর ইছামতীর পর এবার আর বুড়িগঙ্গা দেখতে ইচ্ছে হলো না। বাসের জানলা ঘেষে বসে আছি। বাইরে অন্ধকার মুছে দিয়েছে ফসলের ক্ষেতের সীমানার দাগ। রাত যেন সরষের ঘ্রাণ আরও তীব্র করে তুলেছে। ঘণ্টা দেড়েকের ভেতর ফিরলাম গুলিস্তানে।
