‘চলো, আমরা সবাই মিলে আমাদের ভালোবাসার জিনিসের ওপর থুতু ছিটাই’ লুই আরগেঁর কবিতার উক্তির মতোই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইউরোপের শিল্পীরা ভালোলাগা বস্তু বর্জন করতে শুরু করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে আমরা দেখি, আমাদের অতি ভালোলাগা মোনাসিলার মুখে গোফ লাগাতে, তুচ্ছ বস্তু বাথরুমের কমোডকে ঝর্ণা হিসেবে উপস্থাপন করতে; এ ছাড়া বালতি, সাইকেলের হাতল, গাড়ির চাকা ইত্যাদি তুচ্ছ বস্তুও শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আর্টের গতানুগতিক ধারা পাল্টাতে দেখি। তার ধারাবাহিকতায় আর্ট এখন মাল্টি ডিসিপ্লিনারি, মাল্টি ডাইমেনশনাল, মাল্টি কালচারাল অলটারনেটিভ, কোলাবরেটিভ, সাইট প্যাসিফিক, হ্যাপেনিং, পারফরমিং—ইত্যাদি বহুবিধ ধারায় বিস্তৃত। আশির দশক থেকেই এসব কিছু ধারা আমাদের দেশে আছড়ে পড়ে। স্বাভাবিক চোখে দেখা বস্তুর বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক বস্তুর উপস্থিতি বেড়ে যায়। দেখি, চিত্রপটে নগণ্য বস্তু হ্যাম্পার, ফেলে দেওয়া ছেঁড়া জামা, পোড়া কাঠ, চিঠির খাম, স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের উপস্থিতি। সম্প্রতি ‘নগণ্যের অবয়ব ও আত্মা’ শীর্ষক ষষ্ঠ একক চিত্র প্রদর্শনী বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে উপস্থাপন করলেন শিল্পী তাসাদ্দুক হোসেন দুলু। শিল্পীর ছবির বিষয়বস্তু দৈনন্দিন ব্যাবহারিক জিনিস। চট্টগ্রামের এ শিল্পী বেছে নিয়েছেন তুচ্ছ, অতি পরিচিত জিনিস—পর্দা, কাপড়ের ভাঁজ, পর্দার গিঁট এবং এর ভেতরের নকশাধর্মী জীবজন্তু, পাখি, পুতুল ইত্যাদি। ছবির আঁকার মাধ্যমে হিসেবে বেছে নিয়েছেন দ্রুতগতির অ্যাক্রিলিক রং। তাঁর আঁকা ড্রইঙে দেখি পরিচিত বাল্ব, সকেট, তার রূপান্তরিত হয়ে যায় হাঁসের মুখে। বাল্বের রঞ্জিত লাল রং দেয় বিপদ-সংকেতের আভাস। অতি চেনা জগত হয়ে যায় অন্তঃসত্ত্বা নারী। কাগজের নৌকা হয়ে যায় ময়ূূরপঙ্ক্ষী, ফুলদানি হয়ে যায় প্রণয়িনী। ছবির শিরোনাম রেখেছেন ‘ইনসাইড সারফেস ইনসাইড’। যথার্থ শিরোনাম। প্রথমেই আলোচনা করতে হয় ‘সারফেস ইনসাইড সারফেস ৩’ নিয়ে। এই ছবিতে আমরা দেখি, পর্দার বাঁ দিকের কড়িকাঠে ফুল, পাতা, শঙ্খলতার একটি সুন্দর লোকজ ডিজাইন। এটিকে আমরা যদি শুভ দিক ধরে নিই, এর ডান পাশেই আমরা একটি অশুভ দিক দেখতে পাই। পর্দার আড়ালে কিম্ভুতকিমাকার এক জন্তুর ছায়া। ও কি জান্তব প্রেতাত্মা? বাস্তব- অবাস্তবের দোলাচল দর্শকদের ভাবিয়ে তোলে। পরক্ষণেই ফিল্মের দৃশ্যপটের মতো হয়তো এর পরবর্তী সিকোয়েন্সে গল্পের কুশীলবদের দেখব শিকারীর হাতে খুন বা ধর্ষণ। এ যেন আলফ্রেড হিচকক বা ক্লদ শাব্রলের ছবির দৃশ্যপটের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইনসাইড ‘সারফেস ইনসাইড’ ১৫ নম্বর চিত্রে আমরা দেখি টুপির ভেতরে আরেকটি টুপি। এ যেন রাজকীয় মুকুটের প্রতীক আবার এটি রাজদণ্ডেরও প্রতীক। এর ওপরেই দেখি নারীর পরিহিত অন্তর্বাস। এ যেন পুরুষ দ্বারা নারীর নিষ্পেষণের ছবি। পুরুষশাসিত সমাজের সুন্দর প্রতিচ্ছবি। একই শিরোনামের ৪ নম্বর চিত্রে দেখি একটি সুন্দর ডিজাইনের পর্দা ঝুলছে। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে, পর্দার আড়াল থেকে লকলকে জিহ্বা নিয়ে বেরিয়ে আসছে ভয়াল সাপ। এ যেন আমাদের সমাজকেই নির্দেশ দেয়, যারা প্রতিনিয়তই আমাদের সমাজে নানা ঘটন-অঘটনের জন্ম দিচ্ছেন অথচ ঘটনার কুশীলবদের আমরা চিনি না। তারা পর্দার অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে এবং কলকাঠি নাড়ছে। ২১ নম্বর চিত্রে দেখা যায় বার্ডস আই-ভিউ পারসপেক্টিভ। একটু ওপর থেকে দেখলে সব বস্তুই বিন্দুতে পরিণত হয়। ছবিতে দুটি কোনাকুনি তারের ওপর ঝুলে আছে অসংখ্য কাক। নগরচিত্রের সুন্দর একটি দৃষ্টান্ত। মিনিমাইজ বিন্দু ও রেখার সমন্বয়ে চমত্কার একটি কাজ। ৭ নম্বর চিত্রে দেখা যায় একটি হুইল চেয়ারের চিত্র। এই চিত্রটি দেখলে ভ্যানগগের আঁকা চেয়ারের কথা মনে পড়ে যায়। বস্তুর ভেতরে যে মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান, ভ্যানগগের চেয়ার ছবিটি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাঁর ব্যবাহার করা জীর্ণ চেয়ারের ওপর টানা পাইপ তাঁর জীবনযাত্রার দিনলিপিকেই নির্দেশ দেয়। এখানে শিল্পী দুলু হুইল চেয়ার এঁকেছেন এভাবে, সেটি পড়ে আছে স্যাঁতসেঁতে কঙ্কালসার দেয়ালের মাঝখানে। প্রতীকী ব্যঞ্জনায় হয়তো বলতে চেয়েছেন তার থাকা-না-থাকার দিনলিপির কথা। তবে ছবিটিতে অতিমাত্রায় ডিজাইনের ব্যবহার ভাবের ব্যাঘাত ঘটায়। শিল্পীর সমস্ত ছবি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখব—ছবিগুলো প্রতীকী, বক্তব্যধর্মী; আছে গল্প বলার ঢং আবার কিছু ছবি স্রেফ রিপিটেশান বা তাতে ডিজাইনের ভাব স্পষ্ট। সাধু ও চলিত রীতি একই সাথে যেমন দূষণীয়, তেমনি গল্প বলা বা বক্তব্যধর্মী ছবিগুলোতে অযথা লোকজ মোটিফ—হাতি, ঘোড়া, পুতুলের ব্যবাহার বেখাপ্পা মনে হয়েছে। পর্দার ভেতর বিশৃঙ্খল আঁকিবুকি, লোকজ মোটিফের ব্যবহার কোনো নির্দিষ্ট বার্তা বহন করে না। শিল্পীকে সচেতনভাবেই বেছে নিতে হবে তাঁর কাঙ্ক্ষিত পথটি।
