দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আমার দেশ কার্যালয় থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। রাষ্ট্রদ্রোহ ও তথ্য প্রযুক্তি আইনে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় মাহমুদুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত ১৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। এছাড়া শাহবাগ থানায় করা চারটি ও রমনা থানায় করা একটি মামলায়ও তাকে গ্রেফতার দেখানো হতে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে। গ্রেফতারের পরপরই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টু রোডস্থ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দফতরে। সেখান থেকে দুপুর ২টার দিকে তাকে কড়া পুলিশ পাহারায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের ব্লগারদের ঢালাওভাবে ‘নাস্তিক’ আখ্যায়িত করে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে বেশ কিছুদিন ধরেই মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে আসছিল সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম ও গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সময়ও বেঁধে দিয়েছিল গণজাগরণ মঞ্চ।
যেভাবে গ্রেফতার হন ঃ গত বছর তেজগাঁও থানায় মামলা দায়েরের পর থেকে মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার এড়াতে অফিসে অবস্থান করছিলেন। তবে এর মধ্যে তিনি একবার জামিন নিতে উচ্চ আদালতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জামিন আবেদনের শুনানি হয়নি।
গ্রেফতার অভিযানে অংশ নেয়া পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, গতকাল সকাল সাড়ে আটটার দিকে থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা সাদা পোশাকে আমার দেশ অফিসের গেটে যান। এ সময় গেটের নিরাপত্তা কর্মী— ‘কোথায় যাবেন’ জানতে চান। কিন্তু কথা বলার মধ্যেই পুলিশের সদস্যরা দ্রুত আমার দেশ কার্যালয় প্রবেশ করেন। তখন লুঙ্গি পরিহিত মাহমুদুর রহমান নিজ কক্ষে একা বসে চা খাচ্ছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে তাদের আসার কারণ জানান। এরপর চা খাওয়া শেষ করে প্যান্ট পড়ে পুলিশের সঙ্গে তিনি বের হন। পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, আমার দেশ অফিসে তখন হাতে গোনা কয়েকজন অফিস স্টাফ অবস্থান করছিলেন।
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রতিবেদক মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আমার দেশ কার্যালয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ দেখান কর্মীরা। তিনি আরও বলেন, গ্রেফতারের সময় পুলিশ আমার দেশ কার্যালয়ের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের কম্পিউটার ও নথিপত্র নিয়ে গেছে।
ব্রিফিং ঃ মাহমুদুর রহমান গ্রেফতারের পর গতকাল সকাল ১০টায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিং করে ডিসি (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, কথিত স্কাইপে কথোপকথন আমার দেশে প্রকাশ করায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে তেজগাঁও থানায় গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এবং তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০০৬-এর ৫৬ ও ৫৭ ধারায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
মামলা দায়েরের অনেক পরে কেন গ্রেফতার করা হলো—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুদুর রহমান বলেন, নানা ধরনের সমস্যা ও তদন্তের কারণে মাহমুদুর রহমানকে আগে গ্রেফতার করা যায়নি।
আদালতে মাহমুদুর রহমান ঃ আমাদের কোর্ট রিপোর্টার জানান, গতকাল দুপুর ২টার দিকে কড়া পুলিশ পাহারায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা দফতর থেকে মাহমুদুর রহমানকে আদালতে হাজির করা হয়। পরে তিনটি মামলায় পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২৪ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায়। এর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই শাহনুর আলম ১০ দিনের রিমান্ড চান। তেজগাঁও থানার ১৭ (৩) ১৩ মামলায় এসআই সাদেকুল ইসলাম ও ৩৩ (৩) ১৩ মামলায় এসআই হারুন অর রশিদ ৭ দিন করে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সহিদুল ইসলাম রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ৭ দিন ও অপর দুই মামলায় ৩ দিন করে ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনের উপর শুনানি শুরুতে মাহমুদুর রহমানের পক্ষে অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার তাকে আইনজীবী নিয়োগের জন্য ওকালতনামায় স্বাক্ষর করার অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, ‘‘আমি কোনো আইনজীবী নিয়োগ করবো না। কেননা এ আদালতের প্রতি আমার কোনো আস্থা নেই।’’ মাহমুদুর রহমান নিজেই আদালতে বক্তব্য রাখেন। তিনি আদালতকে বলেন, “প্রসিকিউটর সর্বৈব মিথ্যাচার করছেন।” এতে আদালতে হৈ চৈ শুরু হয়। হৈ চৈ থামলে তিনি ফের আদালতকে বলেন, “আমার দেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে কোনো কটূক্তি করেনি। বিচারপতি ও ব্রাসেলসভিত্তিক আইন বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিনের স্কাইপের কথোপকথন-সংলাপ কোট-আনকোট ছেপেছে আমার দেশ।” তিনি আরও বলেন, ‘‘এ মামলা চলতে পারে না। কেননা একই বিষয় নিয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলায় হাইকোর্ট রুল জারি করলে সুপ্রিম কোর্টে তা স্থগিত হয়ে যায়।” আদালতের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘আমি এ মামলায় কোনো আইনজীবী নিয়োগ করি নাই। কেননা তারা রিমান্ড বাতিল করে জামিন চাইবেন। আমি জানি এ আদালতে জামিনও পাওয়া যাবে না। রিমান্ডও বাতিল হবে না। সুতরাং বোকার মতো এ কাজ আমি করবো না। আমাকে ক’দিন রিমান্ডে দেয়ার জন্য আপনার ওপর নির্দেশ আছে তা আমাদের শুনিয়ে দিন।’’
গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের (সিএমএম) আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহ ও সাইবার অপরাধ আইনে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইদুর রহমান। ম্যাজিস্ট্রেট এসএম আশিকুর রহমান মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই গতকাল মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের প্রতিবাদে নিন্দা ঃ মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতারে নিন্দা জানিয়েছে বিএনপিসহ বিভিন্ন সংগঠন। রাজধানীর নয়া পল্টানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গতকাল বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান বলেছেন, এভাবে হঠাত্ করে অনেকটা গোপনে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করাটা ন্যক্কারজনক। তিনি মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবি করেন। এছাড়া বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশ, ‘আমার দেশ’ পরিবার জাতীয় প্রেসক্লাব সামনে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে, ২৪ ঘন্টার মধ্যে মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি না দিলে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি রুহুল আমিন গাজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, সদরুল আমিন, সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল প্রেস ক্লাবের আশপাশ এলাকা প্রদক্ষিণ করে। মাহমুদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর কামরাঙ্গিচরে হেফাজতের সহযোগী সংগঠন খেলাফত আন্দোলনও তাত্ক্ষণিক বিক্ষোভ করে। এছাড়াও প্রতিবাদ জানিয়েছে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন।
যেভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মাহমুদুর রহমান: ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন মাহমুদুর রহমান। ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান তিনি। ২০০৬ সালের শেষ দিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর ওই বছর ২৪ নভেম্বর উত্তরায় নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের নিয়ে গোপন বৈঠক করে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে আসেন মাহমুদুর রহমান। ২০০৮ সালে বিএনপি নেতা মোসাদ্দেক আলী ফালুর মালিকানাধীন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পান তিনি। আর ওই সময় থেকেই তিনি পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০১০ সালের ২ জুন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক হাসমত আলী হাসুর দায়ের করা প্রতারণার মামলায় পুলিশ মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করেছিল। তখন পুলিশের কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে আরও একটি মামলা হয়। পরবর্তী সময়ে মানহানিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মোট ৪৯টি মামলা দায়ের করা হয়। তবে আদালত অবমাননার একটি মামলায় ওই বছর মাহমুদুর রহমানকে এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এ মামলায় সাত মাস সাজা খাটার পর গত বছর ১৭ মার্চ কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
২০১২ সালের শেষ দিকে ব্রাসেলসভিত্তিক আইন বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান নিজামুল হকের কথিত স্কাইপে কথোপকথন প্রকাশ করে দৈনিক আমার দেশ। এ কথোপকথন প্রকাশের মধ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন মাহমুদুর রহমান।
মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারে ইসলামী দলগুলোর নিন্দা
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ ও নিন্দা জনিয়েছে বিভিন্ন ইসলামী দল ও সংগঠন। হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর শাখা এক বিবৃতিতে বলেছে, এ গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সরকার নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সুপরিকল্পিতভাবে ইসলাম বিরোধী, নাস্তিক-মুরতাদদের খুশি করতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, মুফতি ফয়জুল্লাহ, জাফরুল্লাহ খান, মাহফুজুল হক, মঞ্জুরুল ইসলাম, আবুল হাসানাত আমিনী, ঢাকা মহানগর সদস্য সচিব জুনায়েদ আল হাবিব প্রমুখ।
ইসলামী ছাত্র খেলাফত বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি আনছারুল হক ইমরান ও সেক্রেটারি জেনারেল মো. খোরশেদ আলম এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করলে নবীপ্রেমিকদের আন্দোলন দমে যাবে না। অবিলম্বে মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি দিতে ও তার বিরুদ্ধে সকল মামলা প্রত্যাহার করার আহ্বান জানান তারা।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল জব্বার এক বিবৃতিতে বলেন, মাহমুদুর রহমান সময়ের সাহসী সৈনিক। তাকে গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সকল মামলা প্রত্যাহারসহ বিনাশর্তে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান শিবির নেতা।
বি. চৌধুরীর নিন্দা
বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী এক বিবৃতিতে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ বিরোধীদলীয় নেতাদের মুক্তি দাবি করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিবৃতিতে তিনি বলেন, সরকারের আচরণ দেখে মনে হয় তারা একদলীয় অথবা একজোটীয় বাকশালীয় পদ্ধতি কায়েমের চেষ্টা করছে।
শেকৃবির সাদা দলের শিক্ষকদের নিন্দা
আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতারে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থি সাদা দলের শিক্ষকরা। মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি প্রদানের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে শিক্ষকগণ।
