বিপ্লবী বিনোদ বিহারীর মরদেহ আজ পৌঁছাবে

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৫
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে মাস্টারদা সূর্যসেনের অন্যতম সহযোদ্ধা ও চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্ল¬বী বিনোদ বিহারী চৌধুরী আর নেই। বুধবার রাত সোয়া ১০টায় কলকাতার ফরটিস হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ১০৩ বছর। পরিবারের সদস্যরা জানান, আজ শুক্রবার কলকাতা থেকে তার মরদেহ চট্টগ্রামে আনা হবে। সন্ধ্যায় নগরীর অভয়মিত্র শ্মশানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে। তার মৃত্যুর খবর চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ার পর নগরবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিনোদ বিহারী চৌধুরীর স্ত্রী ও দুই ছেলে সুবীর চৌধুরী ও বিবেকানন্দ চৌধুরী প্রয়াত হয়েছেন আগেই। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ছোট ছেলের স্ত্রী রুপালি চৌধুরী ও নাতি সৌম্য শুভ্র চৌধুরী। এরা কলকাতার বারাসাতে থাকেন। চট্টগ্রামের মোমিন রোডের বাসায় প্রবীণ এ বিপ্ল¬বীর দেখাশোনা করতেন বকুল নামে এক পালিতা কন্যা। চট্টগ্রামের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম নেতা বিনোদ বিহারী চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা ব্যাধি এবং শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। উন্নত চিকিত্সার জন্য গত ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি কলকাতার বারাসাতে পুত্রবধূ ও নাতির বাসায় যান। স্থানীয় ক্লিনিকে তাকে দুই দফা চিকিত্সা দেয়া হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে এক সপ্তাহ আগে তাকে দক্ষিণ কলকাতার ফরটিস হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। গত ৩দিন তাকে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের সাহায্যে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল। চিকিত্সকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে বুধবার রাতে মহাপ্রয়াণ ঘটে এই সাহসী সৈনিকের। বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালি থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কামিনী চৌধুরী আইনজীবী ছিলেন। তিনি স্বদেশি এবং ব্রিটিশবিরোধী প্রথম অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ফটিকছড়ি অঞ্চলে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তিনি যেতেন, সঙ্গে নিয়ে যেতেন শিশুপুত্র বিনোদকে। ১৯২৯ সালে বিনোদ চৌধুরী প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং রায়বাহাদুর বৃত্তিলাভ করেন। বিনোদ বিহারী কিশোর বয়সে মাস্টারদা সূর্যসেনের সংস্পর্শে এসে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালে যুব বিদ্রোহের সময় মাস্টারদার নেতৃত্বে ব্রিটিশ অস্ত্রাগার দখল করে ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে তিনি স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। চট্টগ্রামের জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্যদের গুলিতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। এসময় ব্রিটিশ সরকার পলাতক অথবা জীবিত অবস্থায় তার মাথার দাম ৫০০ টাকা ঘোষণা করেছিল। বিনোদ বিহারীর পথপ্রদর্শক মাস্টারদা সূর্যসেন ১৯৩৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হন। সে বছর ১৪ আগস্ট সূর্যসেন ও তারকেশ্বরের ফাঁসির আদেশ হয়, নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কারাগারের একই ফাঁসি মঞ্চে সর্বাধিনায়ক মাস্টারদার সঙ্গে বিপ্লবী তারকেশ্বরের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিনোদ বিহারী চৌধুরী ১৯৩৩ সালের জুন মাসে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও পাঁচ বছর চট্টগ্রাম জেল, কলকাতা প্রেসিডেন্সি ও বহরমপুর জেল এবং দেউলি বন্দীশিবিরে কারাজীবন অতিবাহিত করেন। ১৯৩৮ সালের শেষদিকে কারাগার থেকে মুক্তি পান। এক বছরের মাথায় ব্রিটিশ সরকার তাকে এক বছর গৃহবন্দী করে রাখে। চট্টগ্রামের বিপ্ল¬বীদের মধ্যে অনেকেই জেল-দ্বীপান্তর থেকে ছাড়া পেয়ে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেও বিনোদ বিহারী চৌধুরী কংগ্রেসের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সহসম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ব্রিটিশবিরোধী ভারত ছাড় আন্দোলনের প্রস্তুতিকালে তিনি আবার গ্রেফতার হন। ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেল, ঢাকা জেল এবং হিজলি ও খোকশা বন্দীশিবিরে আটক থাকার পর ১৯৪৫-এর শেষ দিকে ছাড়া পান। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় এক বছর চট্টগ্রাম কারাগারে বিনা বিচারে তাকে কাটাতে হয়। জেলখানা, বন্দীশিবির ও গৃহবন্দী অবস্থায় জীবনের ১২ বছর অতিবাহিত করেন বিপ্ল¬বী বিনোদ চৌধুরী। তিনি অবিভক্ত ভারত কংগ্রেস দলের সভানেত্রী নেলি সেনগুপ্তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসাবে কাজ করেন। ১৯৪৮ সালে অবিভক্ত বাংলার পার্লামেন্টে তিনি সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সালাম, বরকত, রফিককে হত্যার প্রতিবাদে সংসদে তত্কালীন গভর্নর নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃত স্বরূপ তিনি ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। স্বাধীন দেশে তিনি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার নিয়ে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। মরদেহ আনা হবে আজ শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বিপ্ল¬বী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শেষকৃত্য হবে জন্মভূমি চট্টগ্রামে। শুক্রবার বিকালে একটি হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আনা হবে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রাখা হবে জেএম সেন হলে মাস্টারদা সূর্যসেনের আবক্ষ মূর্তির পাদদেশে। সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ ীয় শহীদ মিনারে। রাত সাড়ে ৮টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সত্কারের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে বলুয়ার দীঘি অভয় মিত্র মহাশ্মশানে। এর আগে বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মরদেহ কলকাতা থেকে বিমানযোগে ঢাকায় আনা হবে বেলা সাড়ে ১১টায়। ঢাকায় পৌঁছার পর দুপুর ২টায় সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তত্ত্বাবধানে নেয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির শোক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট শতাব্দীর অগ্নিপুরুষ ও বিপ্লবী নেতা বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। খবর বাসস’র। তিনি গতকাল এক শোকবার্তায় বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত্ মাস্টারদা সূর্যসেনের সহযোদ্ধা এই বিপ্লবী নেতার জীবন ও কর্ম বাঙালি জাতির বিবর্তন ও উত্তরণের সাথে সম্পৃক্ত। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, মহান ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এমনকি সাম্প্রতিক জঙ্গিবাদ বিরোধী আন্দোলনে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে সব ধরনের অন্যায়, অপশাসন, সাম্প্রদায়িকতা, মানবতাবিরোধী আন্দোলন ও সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছেন। এই প্রবীণ নেতা আজীবন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবাদপ্রতিম বিপ্লবী ও সমাজকর্মী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিপ্লবী বিনোদ বিহারী সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক। সকল অন্যায় ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি জনগণের জন্য অনুপ্রেরণা ছিলেন। শেখ হাসিনা মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলন এবং পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে উপমহাদেশের জনগণকে উদ্দীপ্ত করতে যুববিদ্রোহে এ বিপ্লবীর অবদানের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, সামাজিক শান্তি ও অগ্রগতির আন্দোলনে আজীবন সংগ্রামী এই যোদ্ধার ভূমিকার কথাও স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী বিনোদ বিহারীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।