গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ডুমুরিয়া উপজেলার ধামালিয়া ইউনিয়নের চেঁচুড়ি গ্রামে জামায়াত-শিবিরের সাথে সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলিতে মুনসুর আলী গাজী (৪৩) নামে এক জামায়াত কর্মী নিহত এবং চেঁচুড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই রুহুল কুদ্দুসসহ কমপক্ষে অর্ধশত লোক আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে পুলিশের গুলিতে দলীয় কর্মীর হত্যার প্রতিবাদে খুলনা মহানগর এবং খুলনা উত্তর ও দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামী কাল শনিবার খুলনা মহানগরী ও জেলায় অর্ধদিবস হরতালসহ তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী, এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, ইসলামী ছাত্রশিবিরের ডাকা হরতালের সমর্থনে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই জামায়াত-শিবির কর্মীরা চেঁচুড়ি গ্রামের বকুলতলা মোড়ে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। সকাল পৌনে ৯টার দিকে বকুলতলা মোড় থেকে জামায়াত-শিবির কর্মীরা হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করে স্থানীয় কে, বি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দিকে রওনা দেয়। মিছিলটি চেঁচুড়ি পালপাড়া মন্দিরের কাছে পৌঁছালে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে পুলিশের গুলিতে মুনসুর আলী গাজী ঘটনাস্থলেই মারা যান। তিনি পেশায় একজন ভ্যানচালক। এছাড়া পুলিশের গুলিতে জামায়াত কর্মী চেঁচুড়ি গ্রামের কামরুল, মুজিবর মোড়ল, রাসেল, রফিকুল ইসলাম, ছাত্রশিবির কর্মী বিএল কলেজের ছাত্র ইয়ামিন, ভবদাহ কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ইউসুফ মোল্লা ও কাটেঙ্গা গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক বজলুর রহমান গাজী এবং জামায়াত-শিবিরের হামলায় চেঁচুড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস, কনস্টেবল ইমান আলী, কনস্টেবল হামিদুর রহমান, কনস্টেবল আমিরুল ইসলাম, ল্যান্স নায়েক আলাউদ্দীন ও আনসার সদস্য আব্দুর রাজ্জাকসহ কমপক্ষে অর্ধশত আহত হয়। গুলিবিদ্ধ জামায়াত-শিবির কর্মীদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে এলাকাবাসী জানিয়েছে। তাদের খুলনা ও যশোরের বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আহত পুলিশ সদস্যদের খুলনা পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের পর পুলিশ চেঁচুড়ি গ্রামে অভিযান চালিয়ে ১৩ জন জামায়াত-শিবির কর্মীকে আটক করেছে। আটককৃতরা হচ্ছে:রফিকুল মোল্লা, সবুর, মুনছুর হাওলাদার, আলমগীর, মিঠু, সুমন, রবিউল, শফিকুল, মোশাররফ, কুদ্দুস, শরিফুল, রমজান ও ইসমাইল।
তবে নিহত ভ্যানচালক মুনসুরের স্ত্রী রেহানা খাতুনসহ পরিবারের সদস্যরা আর্তনাদ করতে করতে বলেন, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না। পালপাড়ায় মজুরির টাকা আনতে গিয়ে নিহত হয়েছেন তিনি। রেহানা বলেন, এখন আমার চার চারটি মেয়ের কি হবে? কে আমাদের দেখবে?
ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম মশিউর রহমান জানান, সংঘর্ষকালে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে চাইনিজ রাইফেলের ২৫ রাউন্ড, শর্টগানের ৬২ রাউন্ড ও থ্রি নট থ্রি রাইফেলের ৬ রাউন্ডসহ মোট ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছে।
এদিকে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পেয়ে খুলনার পুলিশ সুপার আব্দুর রউফ খান ঘটনাস্থলে যান। তিনি বলেন, পুলিশের ওপর জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালালে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
লবণ পানি তোলাকে কেন্দ্র করে সংষর্ষে নিহত ১
এদিকে বুধবার রাতে ডুমুরিয়া উপজেলার চণ্ডিপুর গ্রামের শ্যামনগর বিলে স্ল্যুইচগেটের বাঁধ কেটে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ করাকে কেন্দ্র করে ঘের মালিকদের সঙ্গে গ্রামবাসীদের সংষর্ষে ১ নিহত ও ১০ জন আহত হয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, বুধবার রাত ১০টার দিকে চণ্ডিপুর গ্রামের কয়েকজন চিংড়ি ঘের মালিক জোর করে শ্যামনগর বিলে স্ল্যুইচগেটের বেড়িবাঁধ কেটে লবণ পানি তুলে বিলে চিংড়ি চাষ করার চেষ্টা চালায়। এ সময় গ্রামবাসী বাধা দিলে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়। এদের মধ্যে ঘের মালিক সেলিম শেখ (৩২), মফিজুল (২৮) ও সিরাজুল (২৫) এবং গ্রামবাসী লাল্টু বাছাড় (৩২), প্রশান্ত ঢালী (৩৫) ও স্বপন ঢালীকে (৩৮) প্রথমে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে স্বপন ঢালীর অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ওইদিন রাতেই ঢাকায় প্রেরণ করা হলে পথিমধ্যে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় ডুমুরিয়া থানায় মামলা হয়েছে।
