অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে পালিত হবে এবারের পহেলা বৈশাখ। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা ও রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাণী উচ্চারিত হবে। তাই চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রার এ বছরের থিম ‘রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ-মুক্তিযুদ্ধ অনিঃশেষ’।
পহেলা বৈশাখে গোটা জাতি মেতে উঠবে নতুন বছরকে বরণ করে নেবার আনন্দে। আর চারুকলার তরুণ শিক্ষার্থীরা জাতিকে সেই বরণের উপলক্ষ এনে দিতেই প্রতিবারের মত এবারও কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। সরা, ছবি আর মুখোশ বিক্রি করে উঠছে মঙ্গল শোভাযাত্রার খরচ। নতুন বছরকে বরণ করতে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিতে কর্মযজ্ঞ চলছে শাহবাগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের চত্বর জুড়ে। বর্ষবরণের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি ঘিরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ব্যস্ত সবাই। গেল বছরগুলোর তুলনায় আরো বর্ণিল উপস্থাপন কীভাবে করা যায় -তারই চেষ্টা সবার মাঝে।
ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানট পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু করেছিল বাঙালি সংস্কৃতিকে অবলম্বন করে জাতিসত্তার বিকাশের লক্ষ্যে। পাকিস্তানি আমলে ধর্মের ধুয়ো তুলে যখন শাসক গোষ্ঠী মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা করলো, তখন এ অপশাসনকে অগ্রাহ্য করে বাঙালি সংস্কৃতিকে জাতির জীবনে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা পায়, বাঙালি সংস্কৃতিকে জাতীয় জীবনে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে তারা। পহেলা বৈশাখ উদযাপন তাই হয়ে উঠেছে একটি আন্দোলন। ছায়ানট যার কান্ডারী। সঙ্গীতের সুরে সেই আন্দোলন ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিল। আজ সেই আলোড়ন পরিণত হয়েছে প্রতিটি বাঙালির প্রাণের উত্সবে।
বাংলার কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে নতুন ফসলকে কেন্দ্র করে যে উত্সবের সূচনা, কালক্রমে সেটাই পরিণত হয়েছে নববর্ষ বরণ উত্সবে। গ্রামবাংলায় সকালবেলা দই-চিড়া দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করার রেওয়াজ আছে। ব্যবসায়ীরা দোকানে দোকানে হালখাতার আনুষ্ঠানিকতায় মিষ্টি দিয়ে তাদের ক্রেতাদের স্বাগত জানান। কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে চৈত্র সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় বিজু উত্সব।
ছায়ানটের বর্ষবরণ: বাঙালির প্রাণের স্পন্দন
নববর্ষ উদযাপনের প্রধান আকর্ষণ রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান। আর একদিন পরেই পহেলা বৈশাখ। ১৪২০ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। অসাম্প্রদায়িক বাঙালির সার্বজনীন এ উত্সবকে ঘিরে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। রাজধানীবাসীর কাছে পহেলা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান আর পহেলা বৈশাখ উদযাপন এখন সমার্থক হয়ে উঠেছে। ছায়ানটের গানের সুরে নতুন দিনের সূর্যকে বরণ করার জন্য ছায়ানট যে সূচনা করেছে - সারা দেশের মানুষের কাছে, বাঙালির কাছে এখন সেটাই পরিণত হয়েছে বৈশাখ বরণের প্রথায়।
নগর জীবনে বৈশাখ বরণের এ আয়োজন শুরু করেছিল তারাই। ১৯৬৭ সাল থেকে শুরু হয় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় এবারো এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
চারুকলায় বর্ষবরণের প্রস্তুতি
পহেলা বৈশাখে প্রাণের জোয়ারে জেগে ওঠা মানুষের আরেকটি প্রধান আকর্ষণ থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঘিরে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয়ে এখন এ শোভাযাত্রা নববর্ষ উদযাপন সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।
প্রতিবারের মত ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে চারুকলায়। মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চারুকলার সব শিক্ষার্থীরাই এখন সকাল থেকে রাত অবধি কাজ করে চলেছে। এর তদারকি করছেন চারুকলার শিক্ষক ও শিল্পী আবুল বারক আলভি, শিশির ভট্টাচার্য, নিসার হোসেন প্রমুখ।
মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজক মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমন বৈদ্য বলেন, দুই বছর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার থিম নির্ধারণ করা হয়েছিল। গত বছরের থিম ছিল ‘বাংলার বিজয়ের অভিযাত্রা’। এ বছরের থিম হচ্ছে বাংলার ‘রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ - মুক্তিযুদ্ধ অনিঃশেষ’। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যারের সঙ্গে আলোচনা করেই এই বিজয় উদযাপনের থিম নির্ধারণ করেছি আমরা।
সুমন বৈদ্য জানান, রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ ও অপশক্তিকে বোঝাতে এবার সরীসৃপ থাকবে মঙ্গল শোভাযাত্রার সম্মুখভাগে। এই সরীসৃপের মুখ হবে রাজাকারের মুখ আর শরীরটা হবে সরীসৃপের মত।
শিল্পী আবুল বার্ক আলভী জানান, প্রতি বছরই চারুকলা উত্সবটি করে থাকে কোন রকম স্পন্সর ছাড়াই। এবারও তাই হচ্ছে। ছবি, সরা ও মুখোশ বিক্রি করে খরচ উঠছে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা নিজেরাও কিছু কিছু অর্থ দিয়ে ফান্ড করেছে। এছাড়া শিক্ষকরাও ছবি দিয়ে সহায়তা করে থাকেন।
জানা গেছে, এরই মধ্যে শিল্পী ও শিক্ষক সমরজিত্ রায় চৌধুরী, রফিকুন নবী, হামিদুজ্জামান খান, ফরিদা জামান, তরুণ ঘোষ, মোহাম্মদ ইউনুস, শেখ জামাল, মোহাম্মদ ইকবাল, শাকুর শাহ, রণজিত্ দাস, সুকুমার পাল প্রমুখ শিল্পী ও সিনিয়র শিল্পীরা তাদের কাজ জমা দিয়েছেন মঙ্গল শোভাযাত্রার তহবিল সংগ্রহের জন্য। এছাড়া শিক্ষার্থী ও চারুকলার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও তাদের ছবি জমা দিয়েছেন তহবিল সংগ্রহের জন্য। শিক্ষকদের চিত্রকর্ম ১০ হাজার টাকা থেকে লক্ষাধিক টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের ছবি পাওয়া যাচ্ছে আড়াই হাজার টাকা করে।
চ্যানেল আই ও সুরের ধারার হাজারও কণ্ঠে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ
বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা আয়োজন করেছে হাজারও শিল্পীর অংশগ্রহণে হাজারও কণ্ঠে বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। যা চৈত্রের শেষ বিকেল থেকে শুরু হয়ে নববর্ষের দিন বেলা ১২টা পর্যন্ত সরাসরি সমপ্রচার করবে চ্যানেল আই এবং কলকাতার রূপসী বাংলা টেলিভিশন। এ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার চ্যানেল আইয়ের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, সুরের ধারার অধ্যক্ষ ও সভাপতি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, এদিন সুরের ধারা ২০ বছরে পদার্পণ করবে। এজন্য এবারের আয়োজন আরো ব্যাপকভাবে করা হয়েছে। তিনি বলেন, চৈত্র সংক্রান্তির অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। ফরিদুর রেজা সাগর সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, এবারের আয়োজনে শিল্পীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আমাদের আশা।
