খাদ্য নিরাপত্তা বিল কি ভারতে সুফল বয়ে আনবে?

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ১৬:১৩
ভারতীয় সরকার প্রত্যাশা করছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও বহু প্রতীক্ষিত খাদ্য নিরাপত্তা বিল সংসদে পাস হয়ে যাবে চলতি মাসেই অথবা আসছে মে মাসের শুরুতে। একথা জানান দেশের খাদ্যমন্ত্রী। বিলটি অনুমোদিত হলে দেশের উপচে পড়া সঞ্চয় কেন্দ গুলো থেকে বিপুল পরিমাণের খাদ্যশস্য দেশের ১২০ কোটি লোকের ৭০ শতাংশের কাছে ৯০ শতাংশ ভর্তুকিতে পৌঁছে যাওয়ার স্বীকৃতি পাবে। কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন কোয়ালিশন সরকারের জন্য এটি হতে পারে বিরাট এক সফলতা। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৪ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে এবং ভোটযুদ্ধে আবারো জিতে যেতে পারে কংগ্রেস। বিলটি অনুমোদিত হলে ৫০ শতাংশ শহুরে বাসিন্দা এবং ৭৫ শতাংশ গ্রামীণ জনগণ সস্তায় গম, চাল ও ভুট্টার মতো মোটা খাদ্যশস্যের হকদার বনে যাবে। এজন্য ভারতে বছরে প্রয়োজন হবে ৬০ মিলিয়ন মেট্রিক টন খাদ্যশস্য।এজন্য ভর্তুকি বাবদ বছরে গুণতে হবে ১,০০,০০ কোটি রুপি। সমালোচকরা বলছেন, এতে করে খাদ্য বাবদ সরকারের ভর্তুকি খরচ আরো বেড়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে বাড়বে বাজেট ঘাটতি। এই মুহূর্তে ভারত সরকারের ভর্তুকি বাবদ ব্যয়ের ৪০ শতাংশেরও বেশি হয় খাদ্য বাবদ। গত মাসে শেষ হয়ে যাওয়া অর্থবছরে এ খাতে খরচের পরিমাণ ছিল ১.০ ট্রিলিয়ন ভারতীয় রুপি (১৮.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। খাদ্যমন্ত্রী কে.ভি থমাস এ সম্পর্কে গত ফেব্রুয়ারির শুরুতে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘নানা চিন্তা-ভাবনা করেই আমরা এ ধরনের বিল পাসের উদ্যোগ নিয়েছি। বাজেট সেশনের প্রথমার্ধেই আমরা বিলটি উপস্থাপন করব এবং ধারণা করছি বাজেট সেশনের দ্বিতীয়ার্ধেই বিলটি পাস হয়ে যাবে। কেউই তেমন বিরোধিতা করবে না।’ কেন্দ ীয় মন্ত্রিসভায় এরইমধ্যে বিলটি অনুমোদিত হয়েছে। বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় সেশন শেষ হবে ১০ মে। বিলটি পাস হলে ভারতীয় রাজনীতির জন্য এই অধিবেশনটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে এই বিলটি সংসদীয় প্যানেলে প্রথম উপস্থাপিত হযেছিল ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। বিলটি সংসদে উপস্থাপনে দেরি হওয়ার পেছনে যাচাই-বাছাই ছাড়াও অন্য কারণ রয়েছে। বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকার সুবিধাভোগীদের সংখ্যা এবং বিতরিত হবে এমন খাদ্যশস্যের পরিমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। তবে তামিলনাড়ু ছাড়া বাকি সব রাজ্যই বিলের ব্যাপারে তাদের আপত্তি তুলে নিয়েছে। কে. ভি থমাস প্রত্যাশা করছেন, তামিলনাড়ুও শেষ পর্যন্ত তাদের আপত্তি তুলে নেবে। অনেকে বলছেন, এই এক হাজার কোটি রুপিই যদি রাস্তাঘাট, বিদ্যুত্, বিদ্যালয় ও আইন-শৃঙ্খলার পেছনে খরচ করা হয় তাহলে বেশি সুফল আসবে। এত করে উদ্যোক্তারা নতুন ব্যবসা খোলার জন্য উত্সাহিত হবে। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হবে দীর্ঘস্থায়ী চাকরি, বাড়বে সরকারের কর রাজস্ব এবং এতে করে বাড়বে লোকজনের জীবনমান। তাদের কথামতে, খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস হওয়ার মাধ্যমে কাজের কাজ কিছুই হবে না: বাড়বে দুর্নীতি ও কালোবাজারি। ভোটের যুদ্ধে জিততেই কংগ্রেস সরকার জাতীয় খাদ্র নিরাপত্তা বিলটি সামনে নিয়ে এসেছে। তবে বিলের একটি দিক খুবই ভাল— শিশু, গর্ভবতী ও স্তন্যপান করানো মায়েদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা বিল উপস্থাপনের উদ্যোগ নেয় কংগ্রেস সরকার। নানা চিন্তা-ভাবনা থেকেই তাদের এমন সিদ্ধান্ত। অপুষ্টি ভারতীয়দের কাছে নতুন কোন বিষয় নয়। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিইউট প্রদত্ত ২০১১ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দেখা যায়, ভারতের ৬০ মিলিয়ন শিশু কম ওজন ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। আর মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে, ব্যাহত প্রবৃদ্ধি, আয়োডিন ও আয়রনের ঘাটতিতে উত্পাদনশীলতার ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ৩ শতাংশের সমান। ঔপনিবেশিক আমলের দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টির কথা না হয় মানা যায়। কিন্তু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বর্তমান ভারতে অপুষ্টির বিষয়টি কিছুতেই মানা যায় না। সেজন্যই আইনপ্রণেতা ও অর্থনীতিবিদদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িযেছে এই অপুষ্টি। খাদ্য নিয়ে দুর্ভোগের চিত্রটা ভারতে নতুন নয়। এখানে শেষ মহাদুর্ভিক্ষ হয়েছিল ১৯৪৩ সালে। ভারতের নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর ‘পোভার্টি এন্ড ফ্যামিনস’ শিরোনামের কেইস স্টাডিতে দেখিয়েছেন, ওই দুর্ভিক্ষে খাদ্যাভাবের অবদান খুব কমই ছিল। বড় ভূমিকা রেখেছিল হস্তক্ষেপ করা যায় এমন অর্থনৈতি ফ্যাক্টরগুলো, যেমন—বেকারত্ব, হ্রাসমান মজুরিএবং দুর্বল খাদ্য বিন্যাস ব্যবস্থা। ভারতের বর্তমান অপুষ্টি সমস্যা অনেকটা সেরকম। এমনটা নয় যে, শুধুমাত্র পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের অভাবেই তারা অপুষ্টির শিকার। বরং বলা যায়, ফুড সাপ্লাই চেইনের দুর্বলতার কারণেই অপুষ্টিতে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা দিনে দিনে আরো বাড়ছে। একটি উদাহারণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে—ওয়াল স্ট্রীট জার্নাল এশিয়া রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, ভারতে উত্পাদিত মোট টমেটোর বিশ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায় পথিমধ্যে। তার ওপর রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। ফুড সাপ্লাই চেইনের অদক্ষতার কারণেই মূলত ভারতের বেশিরভাগ লোকজন অপুষ্টির শিকার। খাদ্য নিরাপত্তা বিল পাস করে লোকজনকে কম মূল্যে খাবার পাওয়ার অধিকার প্রদান করা যাবে, কিন্তু তাদের খাবার পাওয়া নিশ্চিত করা যাবে না। কাজই বিলটি নিয়ে সমালোচনার সুযোগ থেকেই যাবে। সবার আগে প্রয়োজন ফুড সাপ্লাই চেইনকে শক্তিশালী করা। এটির দিকে খুব বেশি নজর দিচ্ছে না কোনো সরকারই; দিলে আমজনতার খাদ্যকষ্ট লাঘব হত। বিল পাসের আগে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবা জরুরী। —দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া অনুসরণে