মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার একটি চিকিত্সাসেবা প্রাপ্তি। বলা হয়ে থাকে স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আর তাই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী প্রজন্ম ছাড়া একটা সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্ন দিবাস্বপ্নই হয়ে থাকবে চিরকাল। কিন্তু দেশের চিকিত্সাব্যবস্থার অনিয়ম আর বেহাল দশায় দরিদ্র থেকে ধনী প্রায় সব শ্রেণির মানুষের দুর্ভোগ শুধু বাড়ছেই।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিক ও গণস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কার্যক্রমও পুরোপুরি সাফল্যের মুখ দেখেনি দুর্নীতি ও অব্যবস্থার দরুন। চিকিত্সাসেবার মতো মহান পেশা গ্রহণ করে দেশের চিকিত্সকগণ গ্রাম বা শহরতলীর তুলনায় শহরে ক্লিনিক বা প্রাইভেট চেম্বারে সময় দিতে ব্যস্ত—এ খবর পুরনো। সবচেয়ে আশংকাজনক এবং একইসঙ্গে দুঃখজনক খবর হচ্ছে, সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিত্সকগণ আজকাল নিজেদের চাকরি ক্ষেত্রে উপস্থিতির নামমাত্র লোকদেখানো প্রদর্শনের পরও (মাসে, ছ’মাসে কিংবা বছরে একবার উপস্থিত হয়ে) তাঁদের চাকরি টিকে থাকছে, নির্দিষ্ট হারে বেতনভাতা গ্রহণ করছেন। পেশাগত দুর্নীতি আর নৈতিকতার অভাবে ভুগছে চিকিত্সাব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো জাতি।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর বেহাল দশা নতুন করে বলার নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো— চিকিত্সকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, ওষুধ ও অন্যান্য চিকিত্সা উপকরণ রোগীদের সেবায় ব্যবহার না করে বাইরে উচ্চমূল্যে বিক্রি, অ্যাম্বুলেন্স ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, হাসপাতালে নিজস্ব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও প্রাইভেট প্যাথলজি ল্যাবগুলোতে পরীক্ষা করতে পাঠানো ইত্যাদি নানা অভিযোগ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুধু শুনেই যাবে? এসব বিষয় নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রচার, লেখালিখি কি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনোদিনও নজরে আসবে না? নাকি তা দৃষ্টিগোচর হলেও দেখে না দেখার ভান করে থাকবে সংশ্লিষ্ট মহল?
অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সাসেবার নামে সাধারণ ওয়ার্ড বয় থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ ডাক্তার এমনকি কোনো কোনো বিভাগের প্রধান পর্যন্ত দুর্নীতিবাজ। গ্রাম থেকে আসা নিরীহ মানুষ যাঁরা চিকিত্সার জন্য শহরমুখী হতে বাধ্য হন তাঁরাই প্রধানত দুর্নীতির শিকার। নিজেদের নৈতিক বোধকে জাগ্রত করার ‘ধর্মোপদেশ’ এখানে কার্যকরি না হওয়ায় আজ কঠোর নজরদারি ও তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
জরুরি প্রয়োজনে রক্ত সরবরাহ নিয়েও সরকারি হাসপাতালে রয়েছে ব্যাপক টালবাহানা। প্রয়োজনীয় রক্তের জোগান নিশ্চিত করতে রোগীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিকটাত্মীয়ের রক্তের খোঁজে। পেশাগত রক্তদাতাদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকায় বিশুদ্ধ রক্ত প্রাপ্তির বিষয়টিও অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই ঘটছে এই অনিয়ম তা বলাই বাহুল্য।
একইভাবে দরিদ্র জনসাধারণের এক বড় অংশ প্রতারিত হন তাঁদের রোগসংক্রান্ত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাঁকে পড়ে। দেশের রাজধানী শহরটিতেই সেখানে দক্ষ বিশেষজ্ঞের অভাব, সেখানে গ্রাম থেকে আসা সাধারণ মানুষ তাদের কাছে প্রতারিত হবেন এটাই স্বাভাবিক। এক একটি প্যাথলজি ল্যাবের এক এক ধরনের পরীক্ষার ফলাফল এবং তার বিনিময়ে বড় অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে সবার অগোচরে, কিন্তু এগুলো প্রতিরোধে এগিয়ে আসার জন্য কেউ নেই, না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, না আইন মন্ত্রণালয়।
চিকিত্সাক্ষেত্রে চিকিত্সকদের নৈতিকতা ও মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে যে কোনো রাজনৈতিক সহিংসতায়। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা এর প্রধান শিকার। যে কোনো রাজনৈতিক হামলায় আহত ব্যক্তি প্রথমে একজন মানুষ হিসেবেই চিকিত্সাসেবা দ্রুততম সময়ে পাওয়ার অধিকার রাখেন। অথচ বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দলের চাপ ও অন্যান্য হুমকির মুখে ডাক্তারদের অবহেলা অনেক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সবশেষে একটি কথা না বললেই নয়— স্বাস্থ্যখাতের সামগ্রিক দুর্নীতি ও অব্যবস্থা দূর করে একে মানব কল্যাণে যথাযথভাবে কাজ করানোর লক্ষ্যে আমাদের সকলের দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগও নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা
