আমার ছোট ছেলেটি বেকার। পড়াশোনায় তেমন আগ্রহী না হলেও কম্পিউটারে ভালো হাত। বাস্তব অভিজ্ঞতায় একজন পাস করা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারের অনেক যোগ্যতাও অর্জন করেছে। কিন্তু চাকরি জুটছে না। অবশ্য চাকরির জন্য এখনো অবধি তেমন উঠেপড়ে লেগে দরখাস্তই করেনি। দরখাস্ত করতে বললেই বলে, ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি হয় না হবে না। ঘুষ না দিলে কোথাও চাকরি হবে না। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনে কিছুটা নিরুত্সাহীও বটে। শারীরিক যোগ্যতায় পুলিশের বা রেলওয়ের চাকরির কথা বললে ঐ এক কথাই বলে— দাও পাঁচ লাখ টাকা, দেখো চাকরি পাই কিনা। সার্টিফিকেট অনুসারে বেশকিছু ক্ষেত্রে ওর দরখাস্ত করারই যোগ্যতা নেই। তাহলে ওর যোগ্যতা কোথায় প্রয়োগ করার সুযোগ পাবে?
বন্ধুদের মুখেও শুনি, ঘুষ ছাড়া চাকরি নেই। রিটেনে ভালো করা কত প্রার্থী ঘুষ দিতে না পেরে ভাইবা নামক ‘বৈতরণী’তে পিছিয়ে পড়ছে। অথচ কে ঘুষ খায়? খুঁজে বের করতে পারবেন দু’ একজন? কোনোদিনই পারবেন না। তবু একথা আজ ‘ওপেন সিক্রেট’— অমুক অধিদপ্তর, তমুক অধিদপ্তরের চেয়ার টেবিল পর্যন্ত ঘুষ খায়। নাম প্রকাশে অক্ষম দু-একজন বন্ধু তাঁদের পুত্রদের জন্য লাখ তিনেক টাকার বিনিময়ে চাকরি নামক ‘সোনার হরিণ’ ধরে ফেলেছেন এমনও শুনি। তাহলে এ প্রজন্ম জাতিকে কী উপহার দেবে? তারা কি এ প্রতিজ্ঞা নিয়েই চাকরিতে প্রবেশ করছে না যে, যত টাকা দিয়ে চাকরিতে ঢুকছি দু বছরেই তা সুদে আসলে দ্বিগুণ কি চতুর্গুণ করে তুলে আনতে হবে এবং সেভাবেই তারা টাকার ডিমে তা দিয়ে বাচ্চা ফোটাবে। ঘুষ বীজ বপন করলে কর্মক্ষেত্রে তো ঘুষ শস্যই উত্পাদিত হবে। এ শতভাগই সত্য। ঘুষ গ্রহণকারী হয়তো ভাবছেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি কী? বরং আর্থিক লাভই হচ্ছে। কিন্তু দেশ? দেশ নিয়ে ভাববার অবকাশ তাঁর কোথায়?
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুষ চাইতে হয় না। চেলা-চামুণ্ডাদের মাধ্যমে বড় কর্তার অ্যাকাউন্টে তা আপসেই জমা হয়ে যাচ্ছে।
শুনতে পাই, জনৈক সাবরেজিস্ট্রার টাকা ছাড়া দলিলে সিগনেচার করেন না। তাঁর বক্তব্য পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল থেকে ঢাকায় এসেছেন সে কি এমনি এমনি? তিনি ঢাকায় এসেছেন টাকা কামাতে এবং ৫ বছরে ৫ লাখকে ২৫ লাখে পরিণত করতে তিনি বদ্ধপরিকর। হতে পারে এটা মন্দলোকের বানানো মুখরোচক গল্প। আসল চিত্রটা তা হলে কী?
সরকারি বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তথা গার্মেন্টস ক্ষেত্রেও এখন সেলামি ছাড়া চাকরি জোটে না। গরিব নিঃস্ব দিনমজুরের একমাত্র বালিকা কন্যাটিকেও ঠেলেঠুলে ঘুষ দিয়ে হলেও চাকরিতে পাঠাচ্ছে বহুবিধ কারণে। পরিশ্রম করে খাতা দেখবেন? সেখানেও খাতা আনতে উেকাচ না দিলে এক সময় খাতা মিলতো না। সে ক্ষেত্রে দুবছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও খাতা মিলতো। তাহলে এই অনভিজ্ঞ শিক্ষক কতটুকু মূল্যায়ন করবেন ছাত্রছাত্রীদের উত্তরপত্রের?
আচ্ছা বেশ, ঘুষ না দিন, যথাযোগ্য অভিজ্ঞতা তো চাই? সে কথা ঠিক। কিন্তু চাকরি না করলে অভিজ্ঞতা জুটবে কীভাবে? সে ক্ষেত্রে তো দেখছি অভিজ্ঞতার স্কুল খুলতে হচ্ছে সবার আগে। তাই প্রচলিত স্কুলগুলোতে শিক্ষা কারিকুলামটাই বদলে কর্মমুখি শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করাটা কি বেশি জরুরি নয়? কেন তা হলে এত যত্ন করে স্কুলগুলোতে সারাংশ, সারমর্ম, ভারসম্প্রসারণ, ব্যাখ্যা শেখানো, শেখানো অংক কষা, টেবিল মেলানো, শূন্যস্থান পূরণ করা? অন্যদের মতো আমারও যে বলতে ইচ্ছে করছে— বাঁশে তেল না মেখে বানরকে সহজেই উঠতে দিন না, আর চৌবাচ্চায় ছিদ্র না করে নিশ্ছদ্র চৌবাচ্চা বানাবার কারিগর তৈরি করুন। আছে কি এমন প্রতিষ্ঠান— সত্ভাবে কর্মী নিয়োগ করে দেশকে একটি সুন্দর আগামী উপহার দিতে এ প্রজন্মকে সত্ভাবে জীবিকা উপার্জনের সুযোগ করে দিতে এগিয়ে আসার? আছেন কি তেল মসৃণ বাঁশের পরিবর্তে ঘন কোয়া বিশিষ্ট মই আর নিশ্ছিদ্র চৌবাচ্চার বন্দোবস্তকারী?
ঢাকা
