বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত মানুষকে কখনো সুন্দর দেখায় না। তারা থাকে দুর্বল, জরাজীর্ণ, রুক্ষ, শুষ্ক, কঙ্কালসার। তাদেরকে ওপরওয়ালা মানুষই মনে করে না। এজন্যই হয়তবা তাদের ন্যায্য দাবি অধিকারের কথা তাঁরা শুনতে পান না। কিন্তু এই মানুষগুলো যখন কোণঠাসা নিরুপায় হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে বিপ্লবী হয়ে ওঠে তখন তাদেরকে খুবই ‘সুন্দর’ দেখায়। দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে মানবতার। মানবমুক্তির প্রতীক হয়ে চিরজীবী হয়। তাই তো পৃথিবীতে যুগে যুগে গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিসংগ্রাম, বিপ্লব হয়ে আসছে। এদেশটিও একইভাবে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অকৃত্রিম ফসল। আর এই রাষ্ট্রকে অধিকতর সভ্য, রুচিবান ও উন্নত সংস্কৃতিবান করে তোলার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে আরো বেগবান করা হচ্ছে। কারণ গোটা জাতির চিন্তাধারা, ভাবধারা ও কর্মধারার গৌরবময় প্রতিচ্ছবিই হলো তার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিচর্চাকে নিরন্তন ও সুশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্যেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যাত্রা শুরু হয়। আর বিশ্ববিদ্যালয় হলো সংস্কৃতিচর্চার চারণক্ষেত্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এ গৌরবের দাবিদার। এখানকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এর অন্যতম নিদর্শন টিএসসি গঠন ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনীহা ও দীর্ঘসূত্রতা। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রটাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।
ছাত্র-শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের আন্দোলনের ফলে ১৯৮৪ সালে ব্যাপক জনমত যাচাইয়ের পর ছাত্র-শিক্ষক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (টিএসসি) রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়। তত্কালীন উপাচার্য টিএসসির রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটিও গঠন করেন। এ রূপরেখায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ ও প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চায় সহায়তা ও সমন্বয় সাধন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, অনুষদ, বিভাগ ও অন্যান্য ইউনিটের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন, সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গঠন ও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি, পরিচালনা পরিষদ গঠন এবং কেন্দ্রের কাজ ইত্যাদি স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এছাড়াও সাংস্কৃতিকখাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের শতকরা ছয় ভাগ বরাদ্দ এবং এ অর্থ পরিচালনা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করার কথা ছিল। সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে সেমিনার কক্ষ, মহড়া কক্ষ, পাঠগার, নাট্যাভিনয় ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর উপযোগী মিলনায়তন, আলোকচিত্রের স্টুডিও এবং মুদ্রণ ও প্রকাশনা খাতে সংগঠনগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অর্ধাংশ ভর্তুকির কথাও বলা ছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
বর্তমানে যে ভবনে টিএসসির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে তা কখনো সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি ছিল না বা টিএসসির রূপরেখায় এ রকম নেই। বিগত সরকারের আমলে নির্মাণাধীন এই ভবনের ছাদ ধসে পড়ে। কেন ধসে পড়লো তা বোধগম্য নয়। এজন্য একটি তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছিল কিন্তু কার্যত কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। আবার টিএসসিতে নাটক-সংগীত পরিচালক বা প্রশিক্ষক এ ধরনের কিছু পদ সৃষ্টি করে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ রূপরেখাতে এরকম নেই। শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতিচর্চাকে অব্যাহত রাখার জন্য নিজ উদ্যোগে অনেকগুলো সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে। কোনো কোনো সংগঠন ভবনের বারান্দায়, কেউ আবার খোলামাঠে, কেউবা ছাদে (দু-একটা বাদে) অনুশীলন বা মহড়া করছে।
পাঠ্যসূচির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একজন ছাত্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা মানুষের মেধা ও মননকে উর্বর করে। মানুষের বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা-চেতনাকে গতিশীল করে। মানুষকে নীতিবান ও আদর্শবান করে তোলে। কিন্তু সংস্কৃতিচর্চার উপযুক্ত পরিবেশ না পাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা সংস্কৃতিচর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রশাসন কি কখনো এই বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে?
বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা টিএসসির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে প্রস্তাবিত টিএসসির রূপরেখার বাস্তবায়ন, সাংস্কৃতিকখাতে পৃথক ও পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ (অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বা উন্নয়ন ব্যয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এই বাজেটের অতিরিক্ত), অপ্রয়োজনীয় লোকবল অপসারণ, বর্তমান নির্মাণাধীন ত্রুটিপূর্ণ ভবন ভেঙে কার্যোপোযুক্ত টিএসসি কমপ্লেক্স নির্মাণ, কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন আধুনিকীকরণ ও নাট্য মঞ্চ্যায়নের উপযোগী করে সংস্কার এবং বিভিন্ন উপযুক্ত স্থানে মুক্তমঞ্চ তৈরিসহ ১৫ দফা দাবি তাঁদের। আমরা আশা করছি, প্রশাসন অতিদ্রুত টিএসসির রূপরেখার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও কার্যকর করবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
