সুস্থ দাঁত ঝকঝকে সাদা থেকে ক্রীম বা হলদে সাদা বর্ণের হতে পারে। গায়ের রংয়ের সাথে দাঁতের রংয়ের এক মজার যোগাযোগ লক্ষ্য করা যায়। গায়ের রং পরিষ্কার হলে দাঁতের রং ক্রীম বা হলদে সাদা হয় এবং শ্যাম বর্ণের লোকদের দাঁত ঝকঝকে সাদা হয়। তাছাড়া দুধ দাঁত স্থায়ী দাঁতের তুলনায় বেশি সাদা হয় এবং বয়স্কদের দাঁতের রং ক্রমান্বয়ে গাঢ় হয়ে ধূসর বর্ণের হতে পারে। দাঁতের এ রং বিনষ্ট হওয়া দু’রকম হতে পারে। যেমন-
১. বাহ্যিক
২. অন্তর্গত
প্রথমটার ক্ষেত্রে দাঁতের বাইরের আবরণে দাগ দেখা যায়। অন্তর্গতের ক্ষেত্রে দাঁতগুলো এনামেল ও ডেন্টিনের বিন্যাসের মধ্যে জমা হয়। এদের আবার আছে, কারো কারো নানান কারণ। বাহ্যিক দাগের কারণ:যেমন- অতিরিক্ত মাত্রায় সিগারেট-বিড়ি, পান, চা, কফি, সুপারী, জর্দ্দা, গুল ইত্যাদির ব্যবহার। অতিরিক্ত আয়রণ সম্বলিত টিউবওয়েলের পানি পান, সঠিক নিয়মে নিয়মিত দাঁত ব্রাশ না করা, লৌহ জাতীয় সিরাপ খেলেও প্রথমে একটু হালকা হলুদ ও পরবর্তীতে কালো দাগ পড়তে পারে। অনেক দিন যাবত একটানা মাউথওয়াশ দিয়ে কুলি করলে অনেক সময় দাঁতের মধ্যে সাময়িকের জন্য হলেও দাগ পড়ে। তাছাড়া অনেক ধরণের ব্যাকটেরিয়াও এর জন্য দায়ী। অন্তর্গত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-বংশগত, দাঁত যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয়, গর্ভাবস্থায় মা যদি টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় ওষুধ সেবন করেন, শিশু বয়স থেকে টেট্রাসাইক্লিন জাতীয় ওষুধ সেবন করলে, মা গর্ভাবস্থায় মদ্য পান করলে বাচ্চা ও মায়ের দাঁতের অস্বাভাবিক রং ধারণ করে। এছাড়া অর্থডেন্টিকস চিকিত্সার অদক্ষতা, জন্ডিসের কারণে পিগম্যান্ট যদি ডেন্টিনে প্রবেশ করে তবে দাঁতের রং বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। রুট ক্যানেল দাঁতের পাল্প সরানোর সময় যদি অতিরিক্ত রক্তপাত হয়। অন্যদিকে কিছু ফিলিং ম্যাটেরিয়াল যেমন সিলভার ও কপার এ্যামাগাম, বিভিন্ন ধরণের কেমিক্যাল সিলভার, নাইট্রেট ও আয়োডোফম ইত্যাদি রুট ক্যানেল বা ক্যাভিটিতে দিলে, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দাঁতের রং বিনষ্ট হতে পারে, অতিমাত্রায় অ্যাব্রেসিভযুক্ত টুথপেষ্ট ব্যবহার করলেও দাঁতের আবরণ নষ্ট হতে পারে।
এবার আসা যাক কোন
কারণে কি রং হয়
বাদামী রং
বাদামী রং এর দাগ সাধারণত: উপরের চোয়ালের গালের দিকে পিছনের দাঁতে এবং নীচের চোয়ালের সামনের দাঁতের জিহ্বার দিকে দেখা যায়। সাধারণত: পর্যাপ্ত ব্রাশ না
করা ও উপযুক্ত টুথপেষ্ট ব্যবহার
না করাই এর কারণ।
টোব্যাকো দাগ
টোব্যাকো দাগ সাধারণত: কালো ও বাদামী রঙ্গের মিশ্রণ। সাধারণত: তামাকের রস দাঁতের এনামেল ও ডেন্টিনের পিট ও ফিসারে ঢুকে এ দাগের সৃষ্টি করে।
কালো দাগ
কালো রং এর দাগ মহিলাদের
এবং জিনটিভার (মাড়ির) মার্জিনে বেশী দেখা যায়। সাধারণত: বিশেষ এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া
এর জন্য দায়ী।
কমলা রং এর দাগ
সামনের দাঁতের ভিতরের দিকে বেশী পরিমাণ দেখা যায়।
সবুজ রং এর দাগ
সবুজ বা সবুজ হলদে দাগগুলো শিশুদের বেশী পরিলক্ষিত হয়। উপরের চোয়ালের সামনের দাঁতে বেশী দেখা যায়। সাধারণত: যক্ষ্মা ও সারভাইক্যাল লিমফনোড এর কারণে এই দাগ হয়।
মেটালিক দাগ
নানা ধরণের ধাতু বা ধাতুযুক্ত যৌগ দাঁতের উপরিভাগে পেলিকলের সাথে যুক্ত হয়ে দাগের সৃষ্টি করে।
ক্লোরহেক্সিডিন দাগ
হলদে বাদামী বা বাদামী রং এর দাগের সৃষ্টি হয় কিন্তু এই দাগগুলো কখনও চিরস্থায়ী নয়। চিকিত্সা পদ্ধতির মাধ্যমে এই দাগ সহজেই দূর করা হয়। দাঁতের রং বিবর্ণ হলে নিম্নলিখিত চিকিত্সা পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। যেমন- স্কেলিং ও পলিসিং এর মাধ্যমে দাঁতের রং ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব। স্টেইন
রিমোভার দিয়ে দাগগুলো
উঠানো সহজ।
তবে ঘন ঘন মাত্রাতিরিক্ত করা
দাঁতের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। গ্লাস আয়নোমার ফিলিং দ্বারা
দাঁতের রং এর সাথে ফিলিং করা উচিত। রুট ক্যানেল করা দাঁতে পোরসিলিন ক্যাপ করে দিতে হবে। বর্তমানে লেজার চিকিত্সার
মাধ্যমেও দাঁতের দাগ
ওঠানো সম্ভব।
প্রতিরোধ করবেন কিভাবে
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। কাজেই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো মেনে চললে এ সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা যাবে অনেক খানি।
১. অতিরিক্ত মাত্রায় চা, কফি, সিগারেট, বিড়ি, জর্দ্দা, গুল, তামাক পাতা, পান ইত্যাদি ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
২. নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করতে হবে।
৩. অপুষ্টি দূর করতে হবে।
৪. গর্ভাবস্থায় ট্রেটাসাইক্লিন জাতীয় ওষুধ না খাওয়া।
৫. লৌহ জাতীয় ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে বা খাওয়ার পর কুলি ও ব্রাশ করে নিতে হবে।
৬. সারাক্ষণ চিন্তামুক্ত থাকতে হবে।
৭. ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেষ্ট ও টুথপাউডার ব্যবহার করতে হবে।
৮. খাবার তালিকায় প্রচুর পরিমাণে ফলমুল এবং আঁশযুক্ত খাবার রাখতে হবে।
৯. চকলেট জাতীয় খাদ্য খাবার তালিকায় যত কম রাখা।
১০. টুথব্রাশ সাধারণত:৬ মাসের বেশী ব্যবহার না করা এবং দু’সপ্তাহ পর গরম পানি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা ভালো।
১১. রুট ক্যানেল চিকিত্সায় দক্ষ চিকিত্সকের শরনাপন্ন হতে হবে।
১২. দাঁত ও মুখের কোন আঘাত বা রোগ অবহেলা করা উচিত নয়। ছয় মাস অন্তর অন্তর ডেন্টাল সার্জনের শরণাপন্ন হয়ে সমস্যা থাকলে তা জেনে নিতে হবে।
