ফটিকছড়িতে ছাত্রশিবির ও হেফাজতে ইসলামসহ এলাকাবাসীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ব্যাপক সংঘর্ষে তিনজন নিহতের পর গতকাল ছয় হাজার মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ভুজপুর থানায় দায়ের করা মামলায় একশ’ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ভুজপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীরসহ ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এলাকায় এখনও ১৪৪ ধারা বহাল রয়েছে।
ফটিকছড়ির ঘটনায় আহত ও নিখোঁজদের সন্ধানে উপজেলায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালাচ্ছে র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি। গতকাল এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা যায় ব্যাপক তাণ্ডবের চিত্র। বাতাসে শুধু পোড়া গন্ধ। অজানা আশঙ্কায় রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। কাজীরহাট বাজারের সব দোকান বন্ধ। ভুজপুর থানার এসআই নূরুন্নবী বাদী হয়ে ১০০ জনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতনামা ৫/৬ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, গাড়ি পোড়ানো, পুলিশের কাজে বাধাদানসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ভুজপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর শফিউল আলম নূরীসহ ৩৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
হামলায় গুরুতর আহত হেলালের মত ৪১ জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ২৫ জন রয়েছেন নিউরোসার্জারি বিভাগে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, এরা সবাই মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। গতকাল ৯ জনকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকিদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এছাড়া নগরী ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে আরও ৩২ জন চিকিত্সাধীন।
ফটিকছড়ি আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম এ হামলার জন্য জামায়াত-শিবিরের ক্যাডার ও হেফাজতে ইসলামকে দায়ী করেছেন। তাদের উস্কানির মুখে কাজীরহাট গ্রামবাসী হামলাকারীদের সাথে যোগ দেয় বলে তিনি ইত্তেফাককে জানান। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ সুপরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হামলার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ঘটনার সময় পুলিশ নীরব দর্শকের মত দাঁড়িয়ে থেকে আওয়ামী লীগ কর্মীদের মার খাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেছে। পেয়ারুল ইসলাম জানান, জামায়াত-শিবিরের হামলায় তাদের ৩ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০। এদের মধ্যে ৭/৮ জনের অবস্থা সংকটাপন্ন। এছাড়া শওকত ও নূরুসসাফা নামে দলের দুই কর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানান তিনি। প্রায় ৩ ঘণ্টাব্যাপী তাণ্ডবে হামলাকারীরা কমপক্ষে ৩০০ মোটর সাইকেল এবং ২৬টি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ভাংচুর করেছে বলে জানান তিনি।
চমেক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ধুরুং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি জাফর আহমদ জানান, আমরা একটি হরতাল বিরোধী মিছিল নিয়ে যাচ্ছিলাম। কাজীরহাট ন্যাশনাল স্কুলের সামনে যাওয়ার পর হঠাত্ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে লাঠিসোটা, ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। পালানোর কোনো পথই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। একটু আশ্রয়ের জন্য মিছিলকারীরা যেদিকেই যাচ্ছিলেন, সেদিক থেকেই আক্রমণ হচ্ছিল। মসজিদের মাইকে গুজব ছড়িয়ে গ্রামবাসীকেও মিছিলকারীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়া হয়। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বাড়ির ভেতর থেকে মহিলারা লাঠিসোটা ও রামদা নিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালাচ্ছিল।
রিফাইতনগর এলাকার বাসিন্দা বেলাল হাসপাতালের বেডে শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। তার বোন জানালেন, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা বেলালকে মাথায় আঘাত করেছে। তারপর টানতে টানতে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে গেছে হত্যা করার জন্য। রাস্তার ঘষা খেয়ে বেলালের বুকের চামড়ার অনেকখানি অংশ উঠে গেছে। সেখানে বিরাট দগদগে ক্ষত তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কামাল উদ্দিন ইত্তেফাককে জানান, এ ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া ২৫ জনের মধ্যে ৯ জনকে প্রয়োজনীয় চিকিত্সার পর শুক্রবার সকালে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বাকিদের মধ্যে ২ জনের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। হেলাল উদ্দিন নামে একজনকে আইসিইউতে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) রাখা হয়েছে। এখনও তার জ্ঞান ফেরেনি।
এটিএম পেয়ারুল ইসলাম বলেন, আমরা হরতাল বিরোধী শান্তিপূর্ণ একটি মিছিল বের করেছিলাম। মাদরাসায় আক্রমণ করা আমাদের লক্ষ্য ছিল না। সেখানে আমাদের কোনো কর্মী পাথর নিক্ষেপ করেনি। অথচ মসজিদের মাইক থেকে গুজব ছড়ানো হয় আওয়ামী লীগের লোকজন মসজিদ ও মাদরাসায় আক্রমণ চালিয়েছে। মাদ্রাসার বড় হুজুরকে হত্যা করেছে। এরপরই জামায়াত-শিবির ও হেফাজত কর্মীসহ অসংখ্য গ্রামবাসী উত্তেজিত হয়ে আমাদের ওপর হামলা করে।
তিনি অভিযোগ করেন, এ হামলার ঘটনায় পুলিশের ইন্ধন ছিল। ওই এলাকায় মিছিল নিয়ে যাওয়ার আগে ফটিকছড়ির ওসিকে জানানো হয়েছিল। তার কাছ থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর আমরা মিছিল নিয়ে সেখানে যাই। ফটিকছড়ির ওসি সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে আমাদের কর্মীদের হামলাকারীদের সামনে ঠেলে দিয়েছে। হামলাকারীরা আমাদের ওপর চড়াও হওয়ার পরও পুলিশের সহায়তা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা জানায়, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কিছু করা যাবে না। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে অসহায়ের মত মার খাওয়া ছাড়া আমাদের আর কিছু করার ছিল না। আমি মাদ্রাসার বড় হুজুরের কাছেও ফোন করে মারামারি বন্ধ করার জন্য তার সহযোগিতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনিও কোনো ভূমিকা পালন করেননি।
এ ব্যাপারে কাজীরহাট এমদাদুল ইসলাম মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা জুনায়েদ বিন জালালী বলেছেন, আমাদের মাদ্রাসা থেকে কে বা কারা এ ঘোষণা দিয়েছে আমি দেখিনি। তবে ঘোষণা শোনার সাথে সাথে আমি আক্রমণের খবর সত্য নয় বলে জনগণকে শান্ত থাকার অনুরোধ জানিয়ে বারবার ঘোষণা দিয়েছি।
