ফটিকছড়ির ভুজপুর ইউনিয়ন এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা চট্টগ্রাম অঞ্চলে সমসাময়িক সময়ের সবচে বড় ঘটনা। এতে পুরো এলাকার কয়েক হাজার নারী-পুরুষ, মোটর শোভাযাত্রায় অংশ-গ্রহণকারী কয়েকশ লোকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মোটর শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। অপরদিকে এলাকাবাসীর সাথে ছিল জামায়াত-শিবির, হেফা-জতে ইসলামসহ আওয়ামী লীগ বিরোধী সর্বস্তরের জনগণ। এতে বিএনপিসহ এটিএম পেয়ারু বিরোধী আওয়ামী লীগের একটি অংশের লোকজনও সমর্থন যুগিয়েছে বলে অনেকে জানিয়েছেন। তবে পেয়ারুল ইসলাম বলেছেন, জামায়াত-শিবির পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তারা গ্রামবাসীকে ইন্ধন যুগিয়েছে। তাছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মানবতা বিরোধী মামলায় আটক সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর লোকজনও হামলায় অংশগ্রহণ করে। তিনি হামলার সময় পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে তাদের ইন্ধনেরও অভিযোগ করেন। এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ৩ শতাধিক মোটর সাইকেল, মাইক্রোবাস, পিকআপসহ হাজার খানেক লোকের মোটর শোভাযাত্রা কাজীরহাট এলাকা অতিক্রম করার সময় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জানা যায়, মোটর শোভাযাত্রা যাওয়ার সময় সড়ক পাশের মসজিদ থেকে মুসল্লিরা নামাজ পড়ে বের হতে ছিলেন। এ সময় ইট-পাটকেল নিক্ষেপকে কেন্দ্র করে মোটর শোভাযাত্রার একাংশের লোকজনের সাথে মুসল্লিদের সংঘর্ষ বেধে যায়।
বেশির ভাগ লোকজন যানবাহন রেখেই দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করে আত্মরক্ষা করতে থাকে। অনেকে ইট ভাটায় কর্মচারী শেডে এবং ইটের আড়ালে লুকিয়ে আত্মরক্ষা করতে থাকে। কিন্তু এলাকাবাসী যাকে সেখানে পেয়েছে পিটিয়ে-কুপিয়ে এবং ছুরিকাঘাত করে আহত করেছে। আহত অনেকে বলেছেন, সাপকে যেভাবে লাঠি দিয়ে পেটায় তাদের অনেককে সেভাবে পেটানো হয়। নারী-পুরুষ সকলেই একসাথে ধরধর বলে চিত্কার করতে থাকে। মহিলারা পর্যন্ত বলতে থাকে তাদের মেরে ফেল। অনেকে আত্মরক্ষার জন্য গ্রামে আশ্রয় নিতে চাইলেও মহিলারা ধাওয়া করে।
চট্টগ্রামের এক সাংবাদিক জানান, তার মামাতো ভাই এলাকাবাসীর রোষানল থেকে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে পুকুরের পানিতে তিন ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিল। কারণ এই বিশাল মোটর শোভাযাত্রার ওপর গ্রামবাসীর অতর্কিত হামলার কথা তারা চিন্তাই করতে পারেনি। তাছাড়া তাদের সাথে পুলিশ পাহারাও ছিল। শোভাযাত্রার কিছু লোক আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হলেও বিরাট অংশ গ্রামবাসীর আক্রমণের শিকার হয়। তাদের দুই শতাধিক মোটর সাইকেল, মাইক্রোবাস ও অন্যান্য যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গ্রামবাসীর তাণ্ডব এতোই ভয়াবহ ছিল পুলিশ, বিজিবি এবং ফায়ার সার্ভিসের গাড়িও রেহাই পায়নি। প্রায় ৩ ঘন্টা ধরে চলা তাণ্ডবে মোটর শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের রক্ষা করতে তেমন কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। বিজিবি, পুলিশ এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। পরে গুলিবর্ষণ ও লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ইতিমধ্যে ৩ জন ঘটনাস্থলে নিহতসহ অসংখ্য লোক আহত হয়।
২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ফটিকছড়িতে বেশ কয়েকটি কওমী মাদ্রাসা রয়েছে। তাছাড়া ভুজপুর ইউনিয়ন উত্তর ফটিকছড়ি এলাকায় অবস্থিত। ভুজপুরসহ তত্সংলগ্ন এলাকার ৪/৫টি ইউনিয়ন জামায়াত-শিবির এবং হেফাজতে ইসলামের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখানকার ৪টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানও জামায়াতের সমর্থক। তাদের একজনকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে।
পেয়ারুল শো-ডাউন কাল হয়েছে
বিগত সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এটিএম পেয়ারুল ইসলাম আগামী সংসদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। বিগত নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিকট পরাজিত হন। ফটিকছড়ি আসনের ইতিপূর্বেকার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য রফিকুল আনোয়ার ওয়ান ইলেভেনের সময় আটক হওয়ার পর প্রার্থী হতে না পেরে পেয়ারুল ইসলাম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। কিন্তু রফিকুল আনোয়ার পেয়ারুকে প্রার্থী হিসেবে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেননি। তাই নির্বাচনে পেয়ারুর পক্ষে রফিকুল আনোয়ারের মনোভাব নেতিবাচক ছিল বলে পেয়ারুর লোকজনের অভিমত। গত এক বছর পূর্বে রফিকুল আনোয়ার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত দু’জন দুই মেরুতে অবস্থান করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিল। বর্তমানে রফিকুল আনোয়ারের স্থলে কাজ করছেন তার ভাই ফরিদুল আনোয়ার ও মেয়ে। তাছাড়া ফটিকছড়ি এলাকা বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত লোকজনের প্রাধান্য রয়েছে। বর্তমানে কওমী মাদ্রাসার লোকজন বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের লোকজনও বিএনপি- জামায়াতের সমর্থনে মাঠে নেমেছে।
এটিএম পেয়ারুল ইসলাম গত বুধবার পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয় পুরো ফটিকছড়ির ২০ ইউনিয়নে মোটর শোভাযাত্রা করার। ফলে তার পক্ষের সংশ্লিষ্টদের অনেকের ধারণা প্রতিপক্ষ এই শোভাযাত্রা ভণ্ডুল কিংবা বাধাগ্রস্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। অনেকের মতে, মাইক দিয়ে প্রচার করার সাথে সাথে এতো লোকের বিশেষ করে নারী-পুরুষসহ সর্বস্তরের লোকজনের উপস্থিতি সবাইকে হতবাক করেছে। অনেকে এটাকে সাম্প্রতিক দেশের অসহিষ্ণু রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছেন।
