সরকার কঠোর হবে, ছাড় দেবে না বিরোধী দল

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৬
আন্দোলনের নামে ‘সহিংসতা’ ও ‘নাশকতা’ প্রতিরোধে সরকার আরো কঠোর হবে। যত বড় নেতাই হোক, নৈরাজ্য ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত কাউকেও ছাড় দেয়া হবে না, আইনের আওতায় আনা হবে। এ রকম সিদ্ধান্ত রয়েছে সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহলের। অন্যদিকে, বিরোধী দলও মনে করছে সামনের দিনগুলোতে সরকার আরো কঠিনতর পদক্ষেপ নেবে। এমনকি বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমন আশঙ্কাও রয়েছে বিএনপির। দলটিও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারাও সরকারকে কোনো ছাড় দেবে না। সরকার কঠোর হলে তারাও কঠোর হবে। সরকারের কঠোর অবস্থান মোকাবিলায় আন্দোলনের নতুন ছকও তৈরি করেছে বিএনপি। বৃহস্পতিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সভায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, হরতালের নামে সহিংসতা ও প্রাণহানী রোধ এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় আরো কঠোরতম পদক্ষেপ নিতে সরকারকে পরামর্শ দেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। তারা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি আর চলতে দেয়া যেতে পারে না। তাদের দমনে আরো কঠোর হতে হবে। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড যত বাড়বে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ্যাকশন আরো বাড়াতে হবে। নইলে জনগণের আস্থা হারাতে হবে। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, সরকারের কাজ সরকার করবে। অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গেই সরকার দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় ব্যবস্থা নেবে। যেখানেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটবে, সরকার সেখানেই মানুষের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় পদক্ষেপ নেবে। এর আগে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস ও দেশ বিরোধী ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখাবে সরকার। কোন অশুভ শক্তির নৈরাজ্য-অরাজকতার কাছে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার কোনভাবেই মাথানত করবে না। জানা গেছে, বুধবার রাতে অনুষ্ঠিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আন্দোলনের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনাসহ উদ্ভূত সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বৈঠকে ক্ষোভ ব্যক্ত করেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সূত্র মতে, বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের খালেদা জিয়া বলেছেন ‘এ সরকার ফ্যাসিস্ট সরকার, ধরে নিন আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করবে, তারপরেও সরকারের পতন ঘটাতে হবে। গ্রামের মানুষ জেগে উঠেছে। যে যার মত করে প্রতিবাদ করছে। এখন আর কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম গতকাল ইত্তেফাককে জানান, অযৌক্তিক ও অসাংবিধানিক দাবির কাছে মাথানত করবে না বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত যা করছে সেটা কোন আন্দোলন নয়। একাত্তরের ঘাতকদের বাঁচাতে এবং দুঃশাসন ফিরিয়ে আনতে তারা হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। এদের কোন আদর্শ নেই। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তারা এখন মানুষ হত্যা করে ফায়দা লুটতে চায়। তাদের অব্যাহত হত্যা-সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, দেশ বিরোধী ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে সরকার কঠোর থেকে কঠোরতর হতে বাধ্য হবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটও তাদের নৈরাজ্য রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে উল্লেখ করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জনগণকে সচেতন করার জন্য বিএনপি-জামায়াতের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরে লিফলেট প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দেশজুড়ে সাংগঠনিক সফরে এসব লিফলেট বিলি করবেন। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী মাহবুব-উল-আলম হানিফ ইত্তেফাককে জানান, যে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি দেয়ার অধিকার রয়েছে। আর রাজনৈতিক কর্মসূচির শেষ অস্ত্র হলো হরতাল। তবে হরতালের নামে বিরোধী দল ধ্বংসাত্মক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, মানুষ হত্যা করেছে। তিনি বলেন, বিরোধী দল যদি আবারো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় তাহলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে সরকার আইনানুগ সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বুধবার বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য ইত্তেফাককে জানান, কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকে বর্তমানে কারাগারে থাকায় জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে নির্ভরযোগ্য নেতাদের সমন্বয়ে ‘আপদকালীন নেতৃত্ব’ তৈরির বিষয়ে বৈঠকে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকা মহানগরসহ কেন্দ্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে সম্ভাব্য এই নতুন নেতৃত্বের মাঝে সাময়িক সময়ের জন্য দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হবে। আর বিষয়টি সরাসরি পর্যালোচনা করছেন দলের চেয়ারপারসন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য জানান, আন্দোলনের নতুন কর্মকৌশল নিয়েও বুধবারের বৈঠকে আলোচনা হয়। আটককৃত নেতাদের মুক্তির দাবিতে আগামী ১৭ ও ১৮ এপ্রিল ৩৬ ঘণ্টার হরতাল কর্মসূচি দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এরপরে আটক নেতাদের মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত লাগাতার হরতালের কর্মসূচি দেয়ার বিষয়টিও সক্রিয় বিবেচনায় নেয় স্থায়ী কমিটি। এ প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে যে, এখন রাজধানীকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হবে না। ঢাকার বাইরে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। জানা গেছে, শতাধিক কেন্দ্রীয় উল্লেখযোগ্য নেতা জেলে, সাংগঠনিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের চেয়েও বিএনপি এখন বেশি চিন্তিত সরকার এরপর আর কী কী ঘটাতে যাচ্ছে, কিংবা ঘটাতে পারে—এ ভাবনায়। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যারা এখনো বাইরে রয়েছেন তাদেরও জেলে নেয়া হবে কিনা, বিশেষ করে দলীয় প্রধানকেও গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা সরকারে রয়েছে কিনা, এসব নিয়েই দলটিতে এখন বেশি আলোচনা। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের চেয়ারপারসনকেও গ্রেপ্তার করতে পারে সরকার, এ রকম আশঙ্কা আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে। সরকার যেভাবে পাইকারি হারে সব নেতাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং সরকার যেভাবে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে, তাতেই আমাদের এ আশঙ্কা। দলের বর্তমান সাংগঠনিক সংকট ও আন্দোলনের পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে বিএনপির এ জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, দলের চেয়ারপারসনকে গ্রেপ্তার করলেও সংগঠনে কোনো বিপর্যয় দেখা দেবে না। কারণ বিএনপি সমর্থকভিত্তিক একটি দল, এ দলের শক্তি তৃণমূলে। সরকার যখন ‘ফ্যাসিবাদ’-এর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে তখন বিএনপির তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরাই তা রুখে দাঁড়াবে। এদিকে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের কারণে সৃষ্ট সাংগঠনিক সংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব পদে দু’জনকে কয়েকদিনের মধ্যেই নতুন করে দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে একজন হতে পারেন দলীয় সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভুঁইয়া। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন। তবে দলের মুখপাত্র কিংবা সমন্বয়কারী হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত এ দায়িত্ব তাকে দেয়া হচ্ছে না। এসব বিষয় আপাতত খালেদা জিয়া নিজেই দেখভাল করবেন বলে জানা গেছে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দাপ্তরিক কাজগুলো সম্পাদনের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদুকে। তিনিও গ্রেপ্তার হলে এরপর কাকে দায়িত্ব দেয়া হবে সেটিও ঠিক করে রাখা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, বিএনপির সব ধরনের প্রস্তুতিই রয়েছে। দলীয় নেতাদের গ্রেপ্তার আন্দোলনের গতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। সরকার যত নিপীড়ন বাড়াবে, আন্দোলন তত তীব্রতর হবে। তার দাবি, বিএনপিতে কোনো সাংগঠনিক সংকট নেই, ভবিষ্যতেও হবে না।