যানজটে স্থবির দুই মহাসড়ক

আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪২
আগের সপ্তাহের টানা চারদিনের হরতালের প্রভাবে গত দুই দিন ধরে দেশের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়ক ও ফেরিঘাট এলাকা যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৬০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিশাল এলাকা জুড়ে ভয়াবহ যানজট ও তীব্র গরমে দুর্ভোগে পড়েন উত্তরাঞ্চলের ১৭ জেলার হাজার হাজার যাত্রী। সেখানে যানজট এড়াতে বিকল্প সড়কে যানবাহন চলাচলের চেষ্টা চলছে। এদিকে শুক্রবার থেকে একযোগে নদী পারের জন্য যানবাহন আসায় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটমুখী সড়কে শত শত পণ্যবাহী যান আটকা পড়ে বলে জানা গেছে। কুমিল্লা প্রতিনিধি এবং চান্দিনা ও বুড়িচং সংবাদদাতা জানান, শুক্রবার ভোর থেকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তীব্র যানজটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গত কয়েকদিনের হরতালের পর বিভিন্ন স্থানে আটকেপড়া যানবাহনের চাপ, মহাসড়কে চার লেনের কাজ চলমান থাকায় এবং বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিংয়ের কারণে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি টোল প্লাজা এলাকা থেকে আলেখারচর পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার সড়কজুড়ে সৃষ্টি হয় এ যানজট। হাইওয়ে পুলিশের ময়নামতি থানার ওসি মশিউর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, শুক্রবার ভোর ৪টা থেকে এ যানজট শুরু হয়। শনিবার তা আরো তীব্র হয়। পথে পথে যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যানজটে আটকে থাকতে দেখা গেছে মুমূর্ষু রোগী বহনকারী এ্যাম্বুলেন্সও। ইলিয়টগঞ্জ ফাঁড়ির সার্জেন্ট আসাদ জানান, শুক্রবার সরকারি ছুটি এবং কয়েকদিনের হরতালের কারণে শুক্রবার মহাসড়কের যানবাহনের চাপ ছিলো বেশি। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ ও চালকদের এলোপাতাড়ি গাড়ি চালানোর কারণেই এ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। পথে আটকাপড়া মালবাহী ট্রাকের হেলপার ফরিদ মিয়া জানান, তারা শনিবার ভোর ৪টায় ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে দুপুর দেড়টায় ময়নামতি এলাকায় পৌঁছেছেন। কুমিল্লাগামী এশিয়া লাইনের বাসযাত্রী নাছিমা মজুমদার জানান, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে সীমাহীন সমস্যায় পড়েছি। সকাল ৬টায় ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে বাসে উঠে এখন বেলা পৌনে ২টায় ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় এসেছি। অথচ যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতে সময় লাগে মাত্র দেড় থেকে ২ ঘন্টা। এদিকে এ যানজটের কারণে শাক-সবজি ও কাঁচামাল বিক্রেতারা দারুণ বেকায়দায় পড়েছেন। তারা নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে না পারায় একদিকে এসব কাঁচামাল বিক্রি করতে পারছেন না, অপরদিকে অনেক কাঁচামাল নষ্ট হয়ে লোকসানের আশংকা দেখা দিয়েছে। হাইওয়ে থানার ওসি আরো জানান, যানজট নিরসনের জন্য মহাসড়কের সংশ্লিষ্ট এলাকার হাইওয়ে ও থানা পুলিশ নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে রাত প্রায় ৮টা বাজতে পারে বলে তিনি জানান। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখার সময় মহাসড়কে ধীরগতিতে যানবাহন চলছিল। টাঙ্গাইল থেকে মির্জাপুর সংবাদদাতা জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও বঙ্গবন্ধু সেতু একসেস রোডের বিশাল এলাকা জুড়ে গত দুই দিন ধরেই ভয়াবহ যানজট লেগে আছে। বিশাল এলাকা জুড়ে যানজট থাকায় তীব্র গরম ও প্রখর রোদের মধ্যে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজার হাজার যাত্রী । বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকেই এ মহাসড়কে অসহনীয় যানজট চলছে। যানজট এড়াতে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বাস ও উত্তরাঞ্চল থেকে আসা বাস বিকল্প পথে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়ক দিয়ে ও ঘাটাইল-সখীপুর রোড হয়ে ভালুকা এবং সখীপুর-গোড়াই রোড দিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলাচলের চেষ্টা করছে বলে পুলিশ এবং বাস শ্রমিকরা জানিয়েছেন। এদিকে এ রোডে তীব্র যানজট থাকায় গতকাল এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেকে নির্ধারিত সময়ের এক থেকে দেড় ঘন্টা পর পরীক্ষার হলে পৌঁছান। তবে যানজটে সবচেয়ে বেশী দুর্ভোগে পড়েন রোগী নিয়ে চলাচলকারী এ্যাম্বুলেন্স এবং নারী ও শিশুরা। যানজটের কারণে অনেকেই রাস্তায় রাত কাটান। গতকাল শনিবার মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে ভয়াবহ যানজটের দৃশ্য। হাইওয়ে পুলিশ এবং থানা পুলিশ যানজটের সত্যতা স্বীকার করে বলেন , যানজট নিরসনে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। জানা গেছে, তিন দিনের হরতাল এবং পহেলা বৈশাখের ছুটি থাকায় বিভিন্ন রোডের যানবাহন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করার কারণে এই তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ জানায়, একদিকে রাস্তায় প্রচুর যানবাহন অপরদিকে গতকাল রাতে এবং সকালে মহাসড়কের ১০/১২টি স্থানে কয়েকটি মালভর্তি ট্রাক বিকল হয়ে পড়ায় যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে মহাসড়কের চন্দ্রা-বাইপাইল, চন্দ্রা-জয়দেবপুর এবং চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত যানজটে নাকাল হন হাজার হাজার যাত্রী। যাত্রীরা অভিযোগ করেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে তাদের দুই ঘন্টার স্থলে ১৫/২০ ঘন্টা লাগছে। তবে গোড়াই হাইওয়ে থানার ওসি যোবাইদুল আলম দাবি করেন, যানজট আগের চেয়ে কমেছে। যানজট নিরসনের জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট পাঠানোর সময় পর্যন্ত এ মহাসড়কে যানজট অব্যাহত ছিল। গোয়ালন্দ সংবাদদাতা জানান, হরতালের প্রভাবে দৌলতদিয়ায় দুইদিন ধরে আটকে আছে তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক। হরতাল শেষে শুক্রবার থেকে যানবাহন চলাচল শুরু হলে দক্ষিণাঞ্চল থেকে একযোগে শত শত ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন আসতে থাকায় ঘাট এলাকায় চাপ বাড়তে থাকে। নৌরুটে বারোটি ফেরি সচল থাকলেও যানবাহনের বাড়তি চাপের কারণে গত দুইদিন ধরে তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক নদী পারের অপেক্ষায় আটকে আছে। ঘাটের দুই নম্বর ফেরি ঘাটটি বন্ধ রেখে সংস্কার কাজ চলায় মাত্র দুটি ঘাট দিয়ে যানবাহন পারাপার করাতে গিয়ে সমস্যা আরো প্রকট হয়। এ ব্যাপারে বিআইডব্লি¬উটিসি দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক আবু আলম বলেন, একটানা হরতাল শেষে সব গাড়ি একত্রে ঘাটে এসে পৌঁছেছে। ফেরির সংখ্যা পর্যাপ্ত থাকলেও অতিরিক্ত গাড়ির কারণে ঘাটে চাপ পড়ছে। এছাড়া শনিবার সকাল আটটা থেকে দুই নং ফেরি ঘাটের সংস্কার কাজ চলায় দুপুর পর্যন্ত ঘাটটি বন্ধ রাখা হয়। একারণেও গাড়ি পারাপার কিছুটা ব্যাহত হয়।