প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা টিআইবির নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, নতুন নতুন ফর্মুলা গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে আরো জটিল করবে। এটা গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে না। নির্বাচনের আগে নতুন ‘ফর্মুলা’ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারে বলেও আশংকা প্রকাশ করে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে কীভাবে নির্বাচন হয় সেটাই সবার দেখা উচিত। নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে যারা ‘ফর্মুলা’ দিচ্ছেন, তাদের বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন তিনি।
গতকাল গণভবনে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগ তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বিরোধী দলীয় নেত্রী যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য মানুষ হত্যার পরিকল্পনা নিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন ‘লাশ ফেলে’ ক্ষমতায় যেতে চান। তিনি (খালেদা জিয়া) মনে করেন, কয়েকটা লাশ ফেললে আর্মি এসে তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। সব সময় এদেশের মানুষকে হত্যা করা, মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেলা এটাই ওনার চরিত্র। সেনাবাহিনীর ঘাড়ে বন্দুক রেখে ক্ষমতায় এসে তার স্বামী হাজার হাজার সৈনিক, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মানুষ হত্যা করেছেন। তিনিও সেটাই সব সময় চিন্তা করেন। তবে আল্লাহর রহমতে বিশ্বের পারিপার্শ্বিক যে অবস্থা তাতে এ ধরনের ব্যবস্থা আর আসবে না। তাছাড়া তাকেও মনে রাখতে হবে ফল যে পাড়ে, সেই খায় অন্যদের খাওয়ায় না। এ সময় তিনি বিরোধীদলের সমালোচনা করে বলেন, খালেদা জিয়া বোধহয় ইয়াহিয়ার মতো পোড়া মাটি নীতি গ্রহণ করেছেন। ইয়াহিয়া ১৯৭১ সালে পোড়া মাটি নীতি অনুসরণ করে বলেছিল, এদেশের মানুষ চাই না, মাটি চাই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে মানুষ হত্যার রাজনীতি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার অনেক ধৈর্য ধরেছে। কিন্তু ধৈর্য ধরার অর্থ দুর্বলতা নয় এটাও বিরোধী দলীয় নেত্রীকে মনে রাখতে হবে। মানুষ পুড়িয়ে হত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করুন। এগুলো করে মনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে না। অপরাধ যা করেছেন, মামলা থেকে বাঁচতে পারবেন না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় শুরু হয়েছে। তাদেরও রক্ষা করতে পারবেন না। বিরোধীদলের নেত্রীর যখনই মামলার তারিখ পড়ে তখনই হরতাল দেন, জ্বালাও-পোড়াও করেন, মানুষ হত্যা করেন। অপরাধ যদি না করে থাকেন তাহলে মামলায় হাজিরা দিতে তার এতো ভয় কিসের? অপরাধ করে থাকলে তার শাস্তি পেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ হবে আলবদর-রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীমুক্ত অসাম্প্রদায়িক দেশ। যেদেশে সব ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে উত্সবমুখর পরিবেশে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। যেটা আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তার মদিনা সনদ ও বিদায় হজ্বের ভাষণেও বলে গেছেন। ঠিক সেভাবেই এদেশ চলবে। তিনি বলেন, যেকোনো ধর্ম অবমাননা বরদাস্ত করবো না। নবী করিমকে (সা.) কটূক্তি করলে আমরা ব্যবস্থা নেবো। আবার কাবা শরীফের গিলাফ পরিবর্তনের ছবি বিকৃত বা নকল করার ঘটনাও আমরা বরদাস্ত করবো না।
প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মানুষের সহ্যের একটি সীমা আছে। এভাবে দিনের পর দিন যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য মানুষ হত্যা করা হবে আর আমরা বসে বসে দেখবো এটাতো হতে পারে না। দেশের মানুষকেও বলবো যারা এভাবে মানুষ হত্যা করছে, জ্বালাও-পোড়াও করছে—তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেদিনই খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলের মামলার তারিখ হয় সেদিনই তিনি হরতাল দেন। আর নিরাপত্তার অভাবের কথা বলে আদালতে হাজির হন না। নিরাপত্তার অভাব তো তিনি নিজেই ঘটাচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফটিকছড়িতে মাইকে মিথ্যা কথা বলে মানুষ জড়ো করে আওয়ামী লীগের মিছিলে ভয়াবহ হামলা করা হয়েছে। সেখানে তিনজনের লাশ পাওয়া গেছে, অনেকের খোঁজও পাওয়া যায়নি। ইসলাম ধর্মে মিথ্যা কথা বলা মহাপাপ। কিন্তু এভাবে মসজিদের মাইক ব্যবহার করে মিথ্যা কথা বলে তারা কোন ইসলামকে হেফাজত করতে চায়? মসজিদের মাইকের অপব্যবহার রোধ ও মাইককে কেবল ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের জন্য দেশের ইমাম ও আলেম-ওলামাদের সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি। এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আরো বলেন, চাঁদে কার মুখ দেখা গেছে—এ মিথ্যা কথা বলেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। মানুষ হত্যা করা হয়েছে। সেখানেও মিথ্যা কথা বলার জন্য মসজিদের মাইক ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের মাইক ব্যবহার হবে মানুষকে নামাজের আহ্বান জানানোর জন্য। অথচ সেই মাইক ব্যবহার করা হয় মানুষ খুন করার জন্য!
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, মানুষ মারার অধিকার তাকে কে দিয়েছে? এই যে গাড়িগুলো উনি পোড়াচ্ছেন, এগুলো তো জনগণের গাড়ি। তার ও তার ছেলেদের অনেক গাড়ি রয়েছে। এখন জনগণ যদি ব্যবস্থা নিতে থাকেন, এগুলো ভাঙচুর ও আগুন দিতে শুরু করেন, তাহলে তারা কী করবেন? তারা যেভাবে মানুষের বাড়িঘর পোড়াচ্ছেন, জনগণও যদি আগুন দিতে শুরু করে—তারা যাবেন কোথায়?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হেফাজতে ইসলাম যেসব দাবির কথা বলেছে, আমরা বলেছি এর যৌক্তিকতা যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। কিন্তু হেফাজতের ওপর তিনি নাখোশ হয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন হেফাজতে ইসলাম দুই-একদিন বসে থেকে তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে যাক। বিপুল পরিমাণ খাদ্য, পানি দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। এজন্য তিনি নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের দলের নেতাদের মোবাইলও কেড়ে নিয়েছেন!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মতবিনিয়ম সভায় দলের কেন্দপরিকল্পনা মন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) একে খন্দকার বীর উত্তম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক পরিচালনা করেন দলের রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন।
প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি শামসুর রহমান শরীফ ডিলু এমপিসহ উপজেলা সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক ও মহিলা আওয়ামী লীগ নেতারা বক্তব্য রাখেন। তৃণমূল নেতারা নিজ জেলার প্রকৃত সাংগঠনিক অবস্থান, বিদ্যমান সমস্যা, বিরোধীদলের ধ্বংসাত্মক রাজনীতি মোকাবেলায় দলের করণীয় সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সামনে খোলামেলা বক্তব্য রাখেন। কেউ কেউ কিছু নেতার বিরুদ্ধে গ্রুপিং-বিবাদ সৃষ্টিরও অভিযোগ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দল ও দেশের প্রয়োজনে যেকোনো বিবাদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
