হরতালের মতো সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যে বিপর্যয় নেমে এসেছে। মার্চে ৩১ দিনের মধ্যে ২২ দিনই কর্মহীন কেটেছে উদ্যোক্তাদের। আর এপ্রিলের প্রথম ১৪ দিনে হরতাল এবং ছুটি মিলিয়ে কর্মহীন কেটেছে ১০দিন। অর্থাত্ গত দেড় মাসে কাজ হয়েছে ১৩ দিন। ব্যবসায়ীদের আমদানি করা পণ্য পড়ে আছে বন্দরে। রফতানি পণ্যের স্তূপ পড়ে আছে কারখানায়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল আনতে না পারায় ঢাকা এবং এর আশপাশের কারখানাগুলোয় উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে বলে বিদেশি জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে চাচ্ছে না।
গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হরতালের পর যেসব ব্যবসায়ী দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে তাদের পণ্য ঢাকায় আনতে বা ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পাঠাতে চেয়েছেন তারাও হতাশ হয়ে পড়েছেন রাস্তার অবস্থা দেখে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩০ কিলোমিটারব্যাপী যানজটের কারণে পণ্যবাহী ট্রাকের অনেকগুলোই গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। অনেক রফতানিকারক ক্রেতাদের চাপে এয়ার কার্গোর মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে পণ্য রফতানি করছেন। ব্যবসায়ীদের হিসেবে হরতালের কারণে দেশের প্রধান খাতগুলো দৈনিক ১ হাজার ৬শ’ কোটি টাকার মতো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বছর শেষে দেশের মোট জাতীয় উত্পাদন বা জিডিপির ক্ষতি হবে প্রায় সাড়ে ছয় ভাগ। তাদের আশঙ্কা বছরে এই ক্ষতি ৬৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস না হওয়ার কারণে উদ্যোক্তারা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। আমদানিকৃত পণ্যের মধ্যে যেমন কাঁচামাল রয়েছে তেমনি বিভিন্ন কারখানার গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও রয়েছে। এসব যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করতে না পারার কারণে কারখানার উত্পাদন বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, হরতালের কারণে দৈনিক সর্বোচ্চ ৬শ’ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে দেশের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং শপিং মলগুলোর। তৈরি পোশাক শিল্প থেকে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফেরাতে শুরু করেছে। এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ দৈনিক ৩৬০ কোটি টাকা। আর অন্যান্য শিল্প-উত্পাদনে দৈনিক ক্ষতি শতকোটি টাকার বেশি।
ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হরতালের কারণে প্রতিদিন রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে আড়াইশ কোটি টাকার মতো। এছাড়া অর্থ বছরের প্রথম আটমাসে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৩১ ভাগ। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে আইএমএফ ও এডিবি। তারা ইতিমধ্যে সে কথা জানিয়েও দিয়েছে।
এদিকে, যেসব উদ্যোক্তা কাঁচামাল আমদানি করেন তাদের অবস্থা আরও করুণ। হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে অনেকের কাঁচামাল আটকে গেছে। তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল বিশেষ করে তুলা এবং অন্যান্য পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করা যাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বড় উদ্যোক্তা ইত্তেফাককে বলেন, গত ১০ দিন আগে তার আমদানি করা তুলা চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। কিন্তু পরিবহন সংকটের কারণে তিনি তা খালাস করতে পারছেন না। এদিকে কাঁচামাল না থাকায় তার কারখানায় উত্পাদন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অনেক চেষ্টার পর অবশেষে তিনি গতকাল রাতে উচ্চ ভাড়ায় বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের নিশ্চয়তা পেয়েছেন।
অপরদিকে, সমুদ্রপথে যেসব পণ্য ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পৌঁছানোর কথা ছিল, সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সেসব পণ্যের বেশিরভাই জাহাজ ধরতে পারেনি। বাধ্য হয়ে এসব পণ্য এখন আকাশ পথে পাঠাতে হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এর সিংহভাগই তৈরি পোশাক। রফতানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৫ থেকে ২০ গুন বেশি ভাড়া দিয়ে আকাশ পথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।
গতকাল শনিবার বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সামনে বিভিন্ন কার্টুনের বড় বড় স্তূপ। খোলা আকাশের নিচে এসব রাখা হয়েছে রফতানির জন্য। এছাড়া কার্গো ভিলেজের বাইরে আরও অন্তত আড়াইশ থেকে তিনশ কাভার্ড ভ্যান অপেক্ষা করছে পণ্য খালাসের জন্য। রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিকেজি পণ্য রফতানি করতে খরচ পড়ে ২০ সেন্টের (১৬ টাকা) কাছাকাছি। আর আকাশ পথে প্রতিকেজি পণ্য পাঠাতে খরচ হয় সাড়ে তিন থেকে চার মার্কিন ডলারের (৩১০টাকা) মতো।
এদিকে, হরতালের কারণে অনেক কারখানায় তৈরি পোশাকের স্তূপ জমা হয়ে আছে। সময়মতো রফতানি করতে না পারার কারণে অনেকের অর্ডার বাতিল হয়েছে। এ বিষয়ে নিটওয়্যার রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএ-র সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, প্রতিদিনই কারো না কারো পণ্য এয়ার শিপমেন্ট হচ্ছে। অনেকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে অর্ডার বাতিল হচ্ছে। অনেক ক্রেতা ডিসকাউন্টও দাবি করছেন। তিনি রফতানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবহনসহ অন্যান্য সেবাকে হরতালের আওতামুক্ত রাখার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি দাবি জানিয়েছেন।
অপরদিকে, গত একমাসের ব্যবধানে পরিবহন খরচ ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। চট্টগ্রামের সর্ববৃহত্ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন গোডাউনে আমদানি পণ্যের স্তূপ পড়ে আছে। উচ্চসুদে ব্যাংক ঋণ নিয়ে আমদানি করা এসব পণ্যের জন্য ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন। এই বাজারে প্রতিদিন নয়শ থেকে এগারশ কোটি টাকার পণ্য বেচাকেনা হয়ে থাকে। গত কয়েকদিন পরিবহনের অভাবে তা দুই থেকে আড়াইশ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
