পহেলা বৈশাখের সকাল। জেলার হরিপুর উপজেলার বেতনা সীমান্তে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন স্থানীয় আমগাঁওয়ের বাসিন্দা শ্রী অনিমেষ কুমার (৬৫)। ছেলে জ্যোতিন্দ্রনাথ থাকেন ওপারে ভারতের ইসলামপুরে। ৫ বছর আগে এই সীমান্তেই শেষ দেখা হয়েছিল তাদের। এবছরও এসেছেন ছেলেকে এক নজর দেখতে। সকাল থেকে তাই কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে অপেক্ষা করছেন অনিমেষ! দীর্ঘ অপেক্ষার পালা শেষে অবশেষে এলো সেই সুযোগ। কাঁটাতারের ৩০ গজ দূর থেকে দেখতে পেলেন ছেলেকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে পিতা-পুত্র কথা বললেন দূর থেকেই। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা থাকলেও কাঁটাতারের বেড়া তাদের সে আশা পূরণ করতে দেয়নি।
শুধু অনিমেষ-জ্যোতিন্দ্র নয়, এদিন তাদের মতো অনেকেই এসেছিলেন পাশের দেশে থাকা কাছের মানুষটিকে একনজর দেখার জন্য। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার বেতনা সীমান্তে নাগর নদীর পাড়ে কাঁটাতারের বেড়া ঘিরে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও বসেছিল দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলে এই দেখা-সাক্ষাত্ পর্ব।
অনিমেষের মতো স্থানীয় ধর্মপুর গ্রামের পান্না লাল রায় এসেছেন মেয়ে ও জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। শিলিগুড়িতে থাকা মেয়ে রিনা রানীকে ১১ বছর ধরে দেখেন না বাবা পান্না লাল। এবারও এত ভিড়ের মধ্যে জামাই-মেয়ের মুখ দেখতে পারেননি তিনি। বাধ্য হয়ে মোবাইল ফোনে কথা বললেন প্রিয় সন্তানটির সঙ্গে।
কাঁঠালডাঙ্গী গ্রামের সাদেকুল ভাই নূরুল ইসলামকে দেখলেন ৫ বছর পর। ইচ্ছা ছিল বুকে জড়িয়ে ধরার; কিন্তু মাঝখানে যে কাঁটাতারের বেড়া! উষা ও নিরলার ভাই বিশ্বনাথ থাকেন শিলিগুড়িতে। ভাইয়ের জন্য পিঠা এনেছেন বোনেরা। কথা হলেও নিজ হাতের তৈরি পিঠা দিতে পারেননি। তবুও দেখার আনন্দ নিয়েই বিদায় নিলেন তারা।
রানীশংকৈল উপজেলার বাচোর থেকে মাধবী রানী এসেছেন ভারতের কাকরমনি গ্রামে থাকা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। মায়ের সাথে দেখা করার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মাধবী বলেন, ‘বিয়ের পর এই প্রথম মাকে দেখলাম। তবে তেমন কথা হয়নি। অসুস্থ মাকে একনজর দেখে এলাম। এখন একটু ভালো লাগছে।’
হরিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন ফেরদৌস টগর জানান, উপজেলার অধিকাংশ এলাকা দেশ বিভক্তির আগে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অধীনে ছিল। দেশ বিভাগের কারণে আত্মীয়-স্বজনেরা দুই দেশে ছড়িয়ে পড়েন। ফলে সারা বছর তাদের দেখা-সাক্ষাত্ হয় না। তাই এই দিনটির অপেক্ষায় থাকেন প্রত্যেকেই ।
সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, দুই দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা আলাদা করা হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করে; কিন্তু সে কাঁটাতার আলাদা করতে পারেনি দুই দেশের মানুষের ভালবাসার টান। সুযোগ পেলেই এ টানেই তারা ছুটে যান কাঁটাতারের বেড়ার কাছে, মিশে যান একে অন্যের সঙ্গে। অনেকদিন পর আপনজনের দেখা পেয়ে এসময় আবেগে অনেকেই কেঁদে ফেলেন।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, গতকাল পহেলা বৈশাখে একইভাবে মানুষের ঢল নামে জেলার সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের অমরখানা ও বোদাপাড়া গ্রাম ও ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার রায়গঞ্জ থানার খালপাড়া, ভিমভিটা, গোমস্তাবাড়ি ও বড়ুয়াপাড়া গামের কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে। সীমান্তের ৭৪৪ নম্বর মেইন পিলারের ১ থেকে ৭ নম্বর সাব-পিলার পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার নোম্যান্সল্যান্ড জুড়ে এসময় উভয় দেশের নাগরিকদের মিলনমেলায় গোটা এলাকা উত্সবমুখর হয়ে ওঠে।
