ক্যাম্পাসে অবসরের সৃজনশীলতা

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৫৮
সোহাগ, রুহী, ইন্দু। পড়ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে। প্রথমদিকে ক্লাসের ফাঁকে অবসরে আড্ডা দিয়েই তাদের সময় কাটতো। পরে একসময় তারা চিন্তা করলো, কীভাবে এ অবসরটিকে কাজে লাগানো যায়। অনেক কিছু ভাবনা-চিন্তার পর তারা একাডেমিক বিষয়ভিত্তিক একটি ছোট কাগজ বের করার সিদ্ধান্ত নিলো। যেই ভাবা, সেই কাজ। গুণীজনদের লেখা চেয়ে ক্যাম্পাসে পোস্টার সাটানো হলো। নিজেরা এক হাজার টাকা করে চাঁদা দিয়ে ক্যাম্পাসের ব্যাংকে একটি যৌথ অ্যাকাউন্টও খুললো। শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রকাশ পেল উন্মেষ নামক মিডিয়া অধ্যয়ন বিষয়ক ত্রৈমাসিক ছোট কাগজটি। পরেও পড়ালেখার পাশাপাশি তাদের এই প্রয়াস অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে তারা নিরলস প্রচেষ্টায় নিজেদের একাডেমিক কারিকুলামের একটি অনুবাদনির্ভর গ্রন্থ প্রকাশেও সক্ষম হন। সোহাগ-রুহী-ইন্দুদের মতো যেকোনো ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরাই নিজেদের প্রতিদিনের অবসর সময়টিতে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত হতে পারেন। সামান্য একটি উদ্যোগই এর জন্য যথেষ্ট। গড়ে তুলুন পাঠচক্রঃ বলা হয়ে থাকে, কোনো কিছু বোঝাপড়া বা জানাশোনার সবচে উত্তম উপায় হলো পাঠচক্র বা স্টাডি সার্কেল। কয়েকজন বন্ধু মিলে বিকালের অবসরে কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে মেতে উঠুন গঠনমূলক তর্ক-বিতর্কে। ভ্রান্ত কোনো তথ্য এ ধরনের আলোচনায় তুলে ধরবেন না। ভালো হয় যদি গ্রুপ গঠনের আগেই আলোচনার বিষয় নির্ধারণ ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের বিষয়টি গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে নিশ্চিত করা যায়। নীরব কোনো স্থানে নিয়মিত আলোচনায় বসুন। আলোচ্য বিষয়ের কোনো ডকুমেন্ট বা আর্টিকেল ফটোকপি করে নিজেদের মধ্যে বিতরণও করতে পারেন। ক্যাম্পাসে অনেক শিক্ষকই এ ধরনের অবসরের পাঠচক্রে নিজেদের যুক্ত করতে চান। সম্ভব হলে সমমনা শিক্ষক বা অভিজ্ঞ কাউকেও গ্রুপে রাখতে পারেন। এ ধরনের আলোচনায় নির্ধারিত বিষয়ে অবারিত গঠনমূলক বির্তকের সুযোগ রাখুন। মনে রাখবেন, কোনো বিষয়ের পরিপূর্ণ ধারণা পেতে পক্ষ-বিপক্ষ দুই ধরনের যুক্তিরই খোঁজ রাখতে হয়। হয়ে উঠুন নাট্যকর্মীঃ নিজেকে নাট্যকর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যদলগুলোতে যোগ দিন। এক্ষেত্রে আপনাকে অভিনয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। নাট্যগ্রুপে সক্রিয় এমন কোনো পরিচিত বড় ভাই থাকলে তার সাহায্য নিতে পারেন। কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় এ ধরনের একটি নাট্যদলে ওঠা-বসার মাধ্যমেই বাংলাদেশের অভিনয় জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠেছিলেন। নাট্যদলে যে শুধু অভিনয়েরই সুযোগ থাকে এমন নয়। এখানে আপনি নাটক রচনারও সুযোগ পাবেন, নাটক নির্দেশনাও শিখতে পারবেন। ব্যস্ত থাকুন স্বেচ্ছাসেবায়ঃ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাসেবী অনেক সংগঠনই কাজ করে। ক্লাসের ফাঁকে এসব সংগঠনে নিজেকে যুক্ত করে সমাজসেবীও হয়ে উঠতে পারেন। যেমন-বিভিন্ন ক্যাম্পাসে রক্তদাতা সংগঠন হিসেবে বাঁধন, স্বজন, সন্ধানী কাজ করে থাকে। আবার বন্যা বা তীব্র শীতে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে অনেক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এসব সংগঠনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করে অবসরকে কাজে লাগান। মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার ভালো প্ল্যাটফর্ম হতে পারে এ ধরনের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সাংবাদিকতাকেও বেছে নিতে পারেনঃ শিক্ষার্থীদের অনেকেরই সাংবাদিক হওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় নিজেকে নিয়োজিত করে আপনি আপনার ইচ্ছার বাস্তবায়ন করতে পারেন। সাংবাদিকতা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগেই পড়াশোনা করতে হবে-এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো বিষয়ে পড়ালেখায় থেকেও আপনি সাংবাদিকতা করতে পারেন। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই দেশের প্রথমসারির দৈনিক পত্রিকাগুলোর সংবাদ প্রতিনিধি রয়েছে। এসব প্রতিনিধি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। আপনি সাংবাদিকতা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি বা প্রেসক্লাবে ওঠা-বসা শুরু করুন। সাংবাদিকতায় আপনার আগ্রহের কথা সেখানে কর্মরত আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী সাংবাদিকদের জানান। তাদের সময় দিন। তাদের সংবাদ সংগ্রহে আপনিও সাথে থাকুন। তাদের কাছ থেকে শেখার আগ্রহ দেখান। সংগঠনে যুক্ত হয়েই যে আপনি কোনো পত্রিকার প্রতিনিধি হতে পারবেন-এমন নয়। সেখানকার সিনিয়রদের সাংবাদিকদের পড়াশোনা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। দেখবেন, তারাই একসময় আপনাকে তাদের নিজেদের জায়গায় বসিয়ে নিজেরা ক্যাম্পাস থেকে বিদায় নিচ্ছেন। আপনি ভালো কোনো পত্রিকার ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হতে পারবেন কিনা সেটি নির্ভর করবে আপনার দায়িত্বশীলতা ও সাংবাদিকতায় আপনার সময় দেয়ার উপর। আবৃত্তিকার বা বিতার্কিকও হতে পারেনঃ নিজেকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে আপনার অবসর সময়ে আপনি ক্যাম্পাসের কোনো বিতর্ক সংগঠনেও যুক্ত হতে পারেন। ভালো একজন বিতার্কিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলে নিজের নেতৃত্ব গুণকে ঝালিয়ে নিন। এছাড়া ভালো একজন বক্তা হয়ে ওঠার কার্যকরী প্ল্যাটফর্মও হলো বিতর্ক। আর আপনার ভাষাগত উচ্চারণে কোনো সমস্যা থাকলে যোগ দিতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো আবৃত্তি সংগঠনে, এখানকার উচ্চারণ-পরিচর্যা আপনার উচ্চারণ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে। এসব ছাড়াও খেলাধুলায় আগ্রহ থাকলে আপনি যেসব খেলায় আগ্রহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই খেলার কেন্দ্রীয় দলের অনুশীলনে অংশ নিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া ও শরীর চর্চা বিভাগ আপনাকে সাদরে গ্রহণ করবে। ক্যাম্পাসে আপনার অবসর অবহেলায় না কাটিয়ে কোনো সৃজনশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। ভবিষ্যতে অবশ্যই এর প্রতিদান পাবেন।