ভোঁ কাট্টা!

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২৮
আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগের কথা। চীন দেশে দুই রাজার মধ্যে ধুন্ধুমার যুদ্ধ বেঁধেছে। যে আমলের কথা, সে আমলে না ছিল কামান, না ছিল বন্দুক। তীর ধনু ঢাল তলোয়ারই ভরসা। যুদ্ধে কোন পক্ষই হঠতে চায় না। একদিন যুদ্ধের সময় হঠাত্ এক দল সৈন্য তাকিয়ে দেখে, মুখ দিয়ে আগুন ছুঁড়তে ছুঁড়তে আকাশ থেকে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে বিরাট এক ড্রাগন। তারপর আরো একটা, তার পেছনে আরো...। ব্যস আর দেখতে হল না। তারা হাতের অস্ত্র শস্ত্র ফেলে প্রাণ বাঁচাতে ভোঁ দৌড়! লোকে বলে, সাহসের দুই চোখ; ভয়ের হাজারটা। একবার ভয় পেলে ভয় কেবল বাড়তেই থাকে। তারা পালিয়ে না গিয়ে ভালো করে তাকিযে দেখলে বুঝতে পারত, আসলে সেগুলো ড্রাগন নয়। অনেক গুলো ঘুড়ি এক সঙ্গে জুড়ে রূপকথার ড্রাগনের মত বানানো হয়েছে। এরকম ড্রাগন ঘুড়ি আজো ওড়ানো হয় চীন দেশে। তবে সে আমলে সবে ঘুড়ি বানাতে শিখেছে মানুষ। সবাই ঘুড়ির কথা জানতও না ভালোমত। তাই ভড়কে গিয়েছিল সৈন্যরা। তোমরা তো জানোই, ছাপার অক্ষর, কাগজ, সিল্ক কাপড়, দিগ্দর্শন যন্ত্র—এমন সব গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের মত ঘুড়িও প্রথম বানাতে শেখে চীনারা—আজ থেকে ২হাজার ৮শ বছর আগে। তবে ওপরের দিকটা ধনুকের মত বাঁকানো যে ঘুড়ি দিয়ে আমরা ‘ভোঁ কাট্টা’ খেলি—তেমন ঘুড়ি কিন্তু ওরা বানাতে জানত না। এই ধরনের ঘুড়ি প্রথম বানাতে শিখি আমরা। অর্থাত্ এই উপমহাদেশের মানুষ। চীনাদের কাছ থেকে ঘুড়ি বানানো শিখে উপমহাদেশের মানুষই প্রথম এই ধরনের ঘুড়ি বানায়। সেটা আবার আমাদের কাছ থেকে শিখে নেয় চীনারা। বিশ্বে এই ধরনেরই ঘুড়ি চল এখন সবচেয়ে বেশি। চীনারা প্রথমে ঘুড়ি বানাত, সিল্কের কাপড়, আর বাঁশের শলা দিয়ে। তবে এরও অনেক আগে তারা বিশেষ এক ধরণের গাছের পাতা দিয়ে ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে ওড়াত। সিল্কের ঘুড়ি বানানোর কয়েক শতাব্দী পর কাগজ দিয়ে ঘুড়ি বানাতে শেখে তারা। ইউরোপীয়রা ঘুড়ি বানাতে শিখেছে অনেক পরে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষের দিকে মার্কো পোলোই প্রথম ঘুড়ি বানানোর কৌশল নিয়ে যান ইউরোপে। মজার ব্যাপার হল, চীনের প্রতিবেশী হওয়া সত্ত্বেও জাপানিরা ঘুড়ি বানাতে শেখে ইউরোপীয়দের কাছ থেকে। ছোটদের খেলার জিনিস হলেও ঘুড়িকে কিন্তু হেলাফেলার ভেবে বসো না। ব্রিটিশ পন্ডিত যোশেফ নিডহ্যামের মতে, ইউরোপ চীনের কাছ থেকে যা কিছু পেয়েছে, তার মধ্যে ঘুড়িই হল সবচেয়ে দামি। রাইট ভাইয়েরা যে বিমানখানা প্রথম আকাশে উড়িয়েছিলেন, সেটা কিন্তু যন্ত্র লাগানো এক রকমের ঘুড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। অর্থাত্ আমরা যে বিমানে চড়ি, তা আসলে ঘুড়িরই উন্নত অবস্থা। প্রথম দিকে ঘুড়ির ব্যবহার হত নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে। চীনারা শুরুর দিকে ঘুড়ি ব্যবহার করত গ্রাম থেকে ভূত তাড়াতে। তারা পাতলা ফিতের মত করে কাটা এক টুকরো বেত বেঁধে দিত ঘুড়ির সঙ্গে। সেই ঘুড়ি ওড়ালে বাঁশির মত আওয়াজ বের হত। চীনারা মনে করত, সেই আওয়াজে ভূত পেত্নি সব পালিয়ে যায় গ্রাম থেকে। ৬৩৭ সালে কোরিয়ায় একদল বিদ্রোহী সৈন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে দেখে, আকাশে একটা লোক দুই হাতে আগুনের গোলক ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। এর পর বিদ্রোহী সৈন্যদের আর এক জনকেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আসলে কিম উ-সিন নামে এক জেনারেল ঘুড়ি দিয়ে এভাবে ভয় দেখিয়ে শত্রু খেদানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৫৯২ সালে কেরিয়া যখন জাপানে হামলা চালায় তখন কোরীয় অ্যাডমিরাল য়ি ঘুড়ি ব্যবহার করেন তার যুদ্ধ জাহাজগুলোর মধ্যে সংকেত আদান প্রদান করার কাজে। সেই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত তাঁরই জয় হয়েছিল। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সময় ঘুড়ির সাহায্যে চিঠি আর সংবাদপত্র বিলি করা হত। স্যামুয়েল ফ্রাঙ্কলিন কোডি নামে এক ব্রিটিশ ১৯০৮ সালে এক রকমের ঘুড়ি তৈরি করেন যা দিয়ে মানুষও অনেক্ষণ ভেসে থাকতে পারত আকাশে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর সময় ব্রিটিশরা শত্রু সৈন্যরা কোথায় আছে, তা জানতে এধরনের ঘুড়ি ব্যবহার করত। লন্ডন ও ব্রিস্টলের মধ্যে এক ধরণের কোচ সার্ভিস চালু হয়েছিল ১৮২৬ সালে। তাতে না থাকত ঘোড়া না, কোন যন্ত্র। ঢাউস ঢাউস আকারের ঘুড়ি বেঁধে দেয়া হত কোচের সঙ্গে। সেই ঘুড়িতেই টেনে নিয়ে যেত কোচ। এই লেখাটার চার দিকে নানা রঙের চাকতির মত যেটা দেখছ, এটাও কিন্তু এক ধরনের ঘুড়ি। এখন যে কত ধরনের, কত সুন্দর সুন্দর ঘুড়ি ওড়ানো হয়, তার কোন লেখাজোখা নেই। ঘুড়ি নিয়ে সব চেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে ১৮৬০ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত। এই সময়টাকে বলা হয় ঘুড়ির স্বর্ণযুগ। ঘুড়ি ওড়ানো সবার খুব প্রিয় খেলা হলেও সব সময় ঘুড়ি ওড়ানো সহজ ছিল না। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয় খোদ চীনেই। সে আমলে চীনে কেউ ঘুড়ি ওড়ালে তাকে তিন বছর পর্যন্ত জেল খাটতে হত। লোকজন কাজ কর্ম বাদ দিয়ে বেশি বেশি ঘুড়ি ওড়াত বলে ১৭৬০ সালে জাপানেও ঘুড়ি ওড়ানো নিষিদ্ধ হয়। পূর্ব বার্লিনেও ঘুড়ি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এক সময়। ঘুড়ি ওড়াতে তোমাদের ভালো লাগে সেটা জানা কথা তবে তামরা শুনলে অবাক হবে, ছোটদের চেয়ে বিশ্বে বড়রাই ঘুড়ি ওড়ায় বেশি। থাইল্যান্ডে এক ঘুড়ি প্রতিযোগিতায় ৭৮ রকমের আইন মানতে হয় প্রতিযোগিদের। চীনের শ্যানডংকে বলা হয় ঘুড়ি রাজধানী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘুড়ি জাদুঘর আছে এখানেই।