ইলিয়াস ‘নিখোঁজের’ এক বছর

থেমে গেছে তদন্ত, এখনো প্রতীক্ষায় স্ত্রী ও সন্তানরা

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১৬
এক বছর পরও খোঁজ মিলেনি ইলিয়াস আলীর। স্ত্রী ও সন্তানরা এখনো প্রতীক্ষায় রয়েছেন। এই ‘নিখোঁজ’ রহস্য এখনও রহস্যের অন্তরালে রয়ে গেছে। এক বছর আগে বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’ হওয়ার কোন কূল-কিনারা হয়নি। খোঁজ মিলেনি তার গাড়িচালক আনসার আলীর। ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’, ‘গুম’, ‘অপহরণ’ নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে- এমন সব প্রশ্নের কোন তথ্য কেউ দিতে পারেনি। তার সন্ধানের ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তেমন কোন তত্পরতা নেই। নিখোঁজের ঘটনায় দায়ের করা জিডির তদন্তও থেমে গেছে। র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইলিয়াস আলী নিখোঁজের বিষয়টি র্যাব ছায়া তদন্ত করছে। এর আগেও ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য র্যাব কয়েকটি অভিযান চালিয়েছিল।’ বনানীর ২/১ নম্বর রোডের সিলেট হাউসে ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুসদীর লুনা এখনও তার স্বামীর প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। ইলিয়াসের মা তার ছেলের সন্ধানে প্রতিদিন চোখের জল ফেলছেন। তার বিশ্বাস পুত্র জীবিত অবস্থায় ফিরে আসবে। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলে তাহসিনা রুশদীর লুনা সাংবাদিকদের বলেন, তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে একটি বছর কেটে গেল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাকে খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনের কাছ থেকেও কোনো খবর পাচ্ছি না। প্রথম তিন-চার মাস আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও এখন তাদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাচ্ছেন না জানিয়ে লুনা বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকবার র্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। আমার স্বামীর কোন খবর তাদের কাছে আছে কি-না জানতে চাইলে কেউ সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর আমাকে দিতে পারেননি। এ অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই।’ ইলিয়াস আলী নিখোঁজের সংবাদ পাওয়ার পর থেকে তার বৃদ্ধা মা সূর্যবান বিবি পাগল প্রায়। কাউকে দেখলেই তিনি চিত্কার করে বলেন, ‘তোমরা এসেছো। আমার ইলিয়াস কোথায়। আমার ছেলেকে এনে দাও।’ প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সূর্যবান বিবি বলেন, ‘সরকারের কাছে ছেলেকে ভিক্ষা চাইছি। আপনিও সন্তানের মা।’ গত বছরের ১৭ এপ্রিল রাত দেড়টায় বনানীর সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ঘটনায় তার স্ত্রী বনানী থানায় একটি জিডি করেন। দায়ের করা জিডির তদন্ত কাজের অগ্রগতি রিপোর্ট প্রতি এক মাস পরপর আদালতে দাখিল করা হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তা বনানী থানার ওসি (তদন্ত) কাজী মাইনুল ইসলাম প্রতি মাসে সর্বশেষ অবস্থা জানিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে যাচ্ছেন। এসব প্রতিবেদনে ইলিয়াস আলীর গাড়ির বর্ণনা, ঘটনাস্থলের বিবরণ, ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য ও গাজীপুরের পূবাইলে উদ্ধার অভিযানের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ইলিয়াস আলীর মোবাইল ফোনের কললিস্ট পরীক্ষা, হোটেল রূপসী বাংলায় উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ, নিয়মিতভাবে স্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার বাইরে তদন্ত কর্মকর্তারা আর কোন তথ্য উদঘাটন করতে পারেননি। এ ব্যাপারে বনানী থানার ওসি (তদন্ত) কাজী মাইনুল ইসলাম বলেন, শুরুতে দুই কার্যদিবস শেষে তদন্তের অগ্রগতি আদালতে উপস্থাপন করা হতো। এরপর আদালতের নির্দেশে ১০ কার্যদিবস শেষে তদন্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করা হয়। এখন সর্বশেষ পরিস্থিতি জানিয়ে প্রতি এক মাস পরপর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হচ্ছে। গত এক বছরে এ পর্যন্ত ২৫টি তদন্ত রিপোর্ট অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার ইত্তেফাককে বলেন, ‘শুধু আমাদের নেতা ইলিয়াস আলী নন, এই সরকারের আমলে কয়েকশ’ মানুষ গুম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ইলিয়াস আলীকে ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু কই ইলিয়াসকে তো ফেরত দেয়া হলো না। যারা এসব গুমের ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের একদিন মুখোশ খুলে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।’ ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ১২ দিন আগে ৪ এপ্রিল উত্তরা থেকে সিলেট ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমেদ দিনার ও জুনেদ আহমেদ নিখোঁজ হন। ঐ ঘটনায় দিনারের স্ত্রী পিন্সিলার পিংকি বাদী হয়ে রাজধানীর উত্তরা থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। এই মামলাটির এখনও কোন তদন্ত এগোয়নি। এদিকে বিশ্বনাথ (সিলেট) সংবাদদাতা তজম্মুল আলী রাজু জানান, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তার জন্মস্থান সিলেটের বিশ্বনাথবাসী। ইলিয়াস আলীর ছোট ভাই আছকির আলী বলেন, ‘ইলিয়াস আলী মাটি ও মানুষের নেতা। তিনি কোনদিন কারো ক্ষতি করেননি। এই মানুষটিকে কেন গুম করা হলো ?’