মঙ্গলবার ও বুধবার কালবৈশাখী ঝড়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হয়। বহু বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়। গাছপালা ভেঙ্গে যায়। একই সাথে বজ পাতে একাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটে।
পিরোজপুর
মঙ্গলবার রাতে কালবৈশাখী ছোবলে পিরোজপুর জেলার পাঁচটি উপজেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলাগুলো হচ্ছে সদর, জিয়ানগর, নাজিরপুর, ভান্ডারিয়া ও কাউখালী। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষয়ক্ষতি বেশী হয়েছে জিয়ানগরের পাড়েরহাট ইউনিয়নের আটটি গ্রাম। রাত সাড়ে সাতটার দিকে কালৗবশাখী ঝড়ের প্রচন্ড আঘাত হানে পিরোজপুর জেলার উপর। মাত্র ৩০ মিনিট স্থায়ী এই ঝড়ে পিরোজপুর, জিয়ানগর, ভান্ডারিয়া, নাজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়ির টিনের চালা উড়ে যায়, বাতাসের তীব্রতায় বেশ কিছু ঘর দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘরের উপর গাছ উপড়ে পরে ভেঙ্গে গেছে ঘর-বাড়ি। ঘরে চাপা পড়ে বিভিন্ন স্থানে শতাধিক লোক আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠীতে আহত ৫ জনকে কাউখালী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের বিভিন্ন হাসপাতালে এবং বেসরকারী ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিত্সা দেয়া হয়।
বাগেরহাট
বাগেরহাট জেলার উপর দিয়ে মঙ্গলবার রাতে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড কালবৈশাখী ঝড়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটি ইউনিয়নের মিত্রডাঙ্গা, জোকা ও গাজীরঘাট গ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ে এই তিন গ্রামে দুটি মসজিদসহ দেড় শতাধিক আধাপাকা এবং কাঠ ও টিনের ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে।
বুধবার এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেখানে সরকারি-বেসরকারি কোন ত্রাণ সহযোগিতা পৌঁছায়নি। বেলা ১১ টার দিকে বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের এমপি ডা. মোজাম্মেল হোসেন, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো: শুকুর আলী এবং মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: জাহর আলী ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো পরিদর্শন করেছেন।
বুধবার সরেজমিন মিত্রডাঙ্গা, জোকা ও গাজীরঘাট গ্রাম পরিদর্শন করে এই তিন গ্রামের লণ্ডভণ্ড চিত্র দেখা গেছে। কাঠ ও টিনের ঘরগুলো ছিটকে পড়েছে দশ থেকে ত্রিশ গজ দূরে। ঘরগুলো বাতাসের তোড়ে উড়ে অন্যত্র পড়ে আছে। মিত্রডাঙ্গা গ্রামের মিত্রডাঙ্গা আল্ কোবা জামে মসজিদ ও মিত্রডাঙ্গা জামে মসজিদের টিনের চাল উড়ে গেছে এবং ইটের দেয়াল ফেটে গেছে। ঘূর্ণি বাতাসে এ সব এলাকায় অসংখ্য গাছ উপড়ে বা ভেঙে গেছে। মিত্রডাঙ্গা গ্রামে গোড়া থেকে উপড়ে যাওয়া এবং আগা ভেঙে পড়া কয়েকটি তাল ও নারকেল গাছ দেখা গেছে।
মিত্রডাঙ্গা গ্রামের বৃদ্ধ মো: সামছুর রহমান শেখ (৭৬) বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে আকাশ কালো করে মেঘ জমে। এর পর পরই প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাসসহ ঝড় শুরু হয়।
দৈবজ্ঞহাটি ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ২ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো: শমসের আলী বলেন, কাল বৈশাখী ঝড়ে তার এলাকার মিত্রডাঙ্গা গ্রাম, পার্শ্ববর্তী ৩ নং ওয়ার্ডের জোকা ও ৪ নং ওয়ার্ডের গাজীরঘাট গ্রামে ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মিত্রডাঙ্গা গ্রামে প্রায় দেড়শ’, জোকা ও গাজীরঘাট গ্রামে কুড়ি-পঁচিশটি করে ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে ছয় শতাধিক মানুষ ঘরহারা হয়েছে। ঝড়ে বাগেরহাট-খুলনা ও বাগেরহাট-মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা সড়কসহ বিভিন্ন সড়কের পাশের গাছ ভেঙে এ সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
কাউখালী (পিরোজপুর)
কাউখালীতে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ২ মিনিটের এক শক্তিশালী টর্নেডোতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পাঙ্গাসিয়া বাজার ও ফলইবুনিয়া গ্রাম। টর্নেডোর আঘাতে পথচারীসহ ১০ জন আহত হয়। গুরুতর আহতরা হলেন— আলমগীর হোসেন (৩৫), আলেয়া বেগম (৬০), সৈয়দ আলী সিকদার (৬৫), রুহুল আমিন (৫৫), মজিদ সিকদার (৫০), দুলাল (৩৫) সিরাজ (৪৫), মালেক (৩০), নেহাব খন্দকার (৫০), আজিজ খন্দকার (৫৫), খালেক ডাকুয়া প্রমুখ। প্রত্যক্ষদর্শী হায়দার সিকদার (৫৫) জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টার সময় কচা নদী থেকে ঘোলা ঘোলা কালো মেঘ করে হঠাত্ করেই পাঙ্গাসিয়া বাজার ও ফলইবুনিয়া গ্রামে প্রচণ্ড শব্দে আঘাত করে। কিছু বুঝে উঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। টর্নেডোতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় কোটি টাকার উপরে।
চরভদ্রাসন (ফরিদপুর)
চরভদ্রাসন উপজেলার কয়েকটি গ্রামে ঝড়ের আঘাতে গাছপালার ক্ষতিসহ ১জন আহত হয়েছে। বুধবার আকস্মিক বয়ে যাওয়া ঝড়ে বালিয়াডাঙ্গী, হাজীডাঙ্গী, বি.এস. ডাঙ্গী ও এম.পি ডাঙ্গীসহ কয়েকটি গ্রামে গাছপালাসহ কয়েকটি ছাপড়া ঘরের ক্ষতি হয়। সূত্র জানায়, ঝড়ের সময় ঘর থেকে বের হতে গিয়ে বালিয়াডাঙ্গী গ্রামের রাফেজা (২৫) আহত হন।
মীর্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী)
মঙ্গলবার রাতে মীর্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কালবৈশাখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। রাত ৮টা থেকে ১৫মিনিটের স্থায়ী এ কালবৈশাখী ঝড়ে ঐ ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত কাঁচা ঘরবাড়ি ও ৪টি মসজিদ এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়।
ফুলপুর (ময়মনসিংহ)
ময়মনসিংহের সদর উপজেলার গোপালপুরে মঙ্গলবার ভোর রাতে কাল বৈশাখী ঝড়ে ৩৩ কেভি বিদ্যুত্ লাইনের ৮টি খুঁটি বিধ্বস্ত হলে ৩টি থানা বিদ্যুত্ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ছোট ঘিঘাটি গ্রামে মঙ্গলবার রাতে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে ভীত সন্ত্রন্ত হয়ে রহিমা বেগম (৬০) নামে এক বৃদ্ধার মৃত্যু ঘটেছে। মৃত ব্যক্তির ছেলে শিক্ষক জসিম উদ্দীন জানান, মঙ্গলবার ৮ টার দিকে ঝড় উঠলে তার মা রহিমা বেগম বাড়ির কাছে আম কুড়াতে যায়। এ সময় ঝড়ের তীব্রতা বেশি হলে রহিমা বেগম ভীত সন্ত্রন্ত হয়ে হূদরোগে আক্রান্ত হন। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় ডক্টর ক্লিনিকে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত ডাক্তার আবু বক্কর সিদ্দিক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বড়াইগ্রাম (নাটোর)
নাটোরের বড়াইগ্রামসহ আশেপাশের এলাকায় অবশেষে গতকাল বুধবার প্রত্যাশিত বৃষ্টি হওয়ায় জনজীবনে স্বস্তি নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, সেচ দিতে না পারায় পানির অভাবে জমিতে পাট ও মুগ ডালের বীজ বপন করতে পারছিল না চাষিরা। এদিকে নাটোরের বড়াইগ্রাম সদর ইউনিয়নের চণ্ডিপুর গ্রামে গতকাল বুধবার বজ্রপাতে সুজন আলী (২৪) নামে এক ভটভটি চালকের মৃত্যু হয়েছে। নিহত সুজন চণ্ডিপুরের হরফ আলীর ছেলে। বড়াইগ্রাম ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মমিন আলী জানান, গতকাল সকালে বৃষ্টি চলাকালে সুজন বাড়ির বারান্দায় বসেছিল। এ সময় আকস্মিক বজ্রপাতে সুজনের সারা শরীর ঝলসে যায়। পরে স্থানীয় চিকিত্সকের কাছে নিয়ে গেলে তিনি তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
