বাণিজ্যিক সেবাখাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিদেশি চক্র দেশীয় কয়েকজন উদ্যোক্তার মাধ্যমে এ অর্থ পাচার করছে। বাণিজ্যিক সেবাখাত যেমন—শিপিং, বায়িং, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) সহ নানা ধরনের ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে বিদেশি উদ্যোক্তাদের চাকরি না দিতে আদালতের নির্দেশও মানা হচ্ছে না। এছাড়া বিনিয়োগ বোর্ডের পক্ষ থেকে বার বার এ বিষয়ে তাগাদা দেয়া হলেও তাতে ফল মিলছে না।
বিনিয়োগ বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, সেবাখাতের যেসব ব্যবসায় নামমাত্র বিনিয়োগ, সেসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বরাবরই নিরুত্সাহিত করা হয়েছে। আদালতের রায়ও আছে। কিন্তু তা মানছে না কেউ। বোর্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলংকাসহ অনেক দেশে সেবাখাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়টি ২০ বছর ধরে ঝুলে আছে। উদাহরণ দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এমনও দেখা গেছে যে, মাত্র কয়েকশ’ মার্কিন ডলার খরচ করে কোম্পানি গঠন করা হয়। এরপর দুই থেকে তিনজন বিদেশি কর্মী নিযুক্ত করা হয় ওই কোম্পানিতে। অথচ তারা ওই কোম্পানির মাধ্যমে বছরে হাজার হাজার মার্কিন ডলার নিয়ে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে যেসব শিপিং ও ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং কোম্পানি কাজ করছে তার ৬০ ভাগের বেশি বিদেশি মালিকানাধীন।
জানা গেছে, বাংলাদেশে সেবাখাতে বিদেশিদের ব্যবসা করার ঢালাও অনুমতি দেয়া হলেও পাকিস্তান, শ্রীলংকা এবং ভারতে তা নেই। কোন কোন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ নেয়া হবে সে বিষয়ে এসব দেশে আলাদা নীতিমালা আছে। ভারত সরকার কোন খাতেই একটি বিদেশি কোম্পানিকে ৪৯ শতাংশের বেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয় না। সমপ্রতি বিশ্বখ্যাত চেইন শপ ওয়ালমার্ট ভারতে তাদের স্টোর খুলতে আবেদন করলে ভারতের বিনিয়োগ বোর্ড ১০ কোটি মার্কিন ডলার পরিশোধিত মূলধন রাখার নির্দেশ দেয়। ন্যূনতম তিন লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলে পাকিস্তান সরকার ১০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেয়। শ্রীলংকা সরকার একটি বিনিয়োগ প্রস্তাবে মাত্র ৪০ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ করার অনুমতি দেয়। আর বাংলাদেশে যে কোন খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হয়।
তবে হাইকোর্ট ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর এক রায়ে বিদেশি শিপিং এজেন্সি, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং, এয়ারলাইন্স জিএসএ, ইন্ডেন্টিং, ডিস্ট্রিবিউশন এবং ট্রাভেল এজেন্সি খাতে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে ওই রায়ে দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে এসব কোম্পানি স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়। সেক্ষেত্রে দেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ ৫১ এবং বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। হাইকোর্ট এ বিষয়ে বাণিজ্য, অর্থ, আইন, শিক্ষা, নৌ, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থাকে নির্দেশ দেয়। বিনিয়োগ বোর্ড থেকে জানা গেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশ মানছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, যেসব বিদেশি কোম্পানির নিজ দেশ থেকে পরিশোধিত মূলধন এনে ব্যবসা করার কথা, তারা তা না করে বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করছে। বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে তারা এখানে কর ফাঁকি দিয়ে মুনাফার অংশ বিদেশে নানাভাবে পাচার করছে। সমপ্রতি এ ধরনের কিছু কোম্পানির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করেছে। এসব তদন্তে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ২০১১ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক দেখেছে, জিউলিগ ফার্মা নামে একটি বিদেশি ওষুধ ডিষ্ট্রিবিউশন কোম্পানি একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ১৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ওই বছরে তারা লোকসান দেখিয়েছে ২০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এছাড়া কোম্পানিটি বিদেশে নিজেদের প্রিন্সিপাল কোম্পানিতে ২৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ দেখিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যালোচনা করে দেখেছে এ ধরনের কোন অর্থ বিদেশ থেকে আসেনি। উপরন্তু কোম্পানিটি বাংলাদেশের যে দুটি কোম্পানির সাথে ব্যবসা পরিচালনা করে তাদের কাছ থেকে বিপুল অংকের কমিশন নিয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ কমিশনের তথ্য দেয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে বিদেশি কোম্পানিটি হয় কর ফাঁকি দেয়ার জন্য মুনাফার তথ্য গোপন করেছে, অথবা কমিশনের টাকা নানাভাবে বিদেশে পাচার করেছে।
জানা গেছে, কোম্পানিটির কান্ট্রি ম্যানেজার হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার কারণে ওয়ার্ক পারমিট না পেয়ে বিজনেস ভিসায় এসে চাকরি করছেন।
শুধু ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নয়, কিছু শিপিং কোমপানিও হাইকোর্টের আদেশকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশে নানাভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে জার্মানভিত্তিক কোম্পানি হ্যাপাগ-লয়েড-এর বিরুদ্ধে তদন্ত করে কিছু বিস্ময়কর তথ্য পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক শতভাগ বিদেশি এই কোম্পানিকে ব্যবসা করার অনুমতি না দেয়ায় তারা সূক্ষ্ম কৌশলের আশ্রয় নেয়। কোম্পানিটি তাদের শ্রীলংকার এজেন্টের সহায়তায় বাংলাদেশে ভিন্ন নামে একটি কোম্পানি গঠন করে। পরে জেবিএক্স লজিস্টিকস নামে একটি স্থানীয় কোম্পানির সাথে মিলে ব্যবসা পরিচালনা করছে ওই কোম্পানি। এছাড়া কলম্বোর একটি শিপিং কোম্পানির ডিজিএম একটি বিদেশি কোম্পানির হয়ে জেবিএক্স লজিস্টিকস-এ কাজ করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাণিজ্যিক সেবাখাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর অনুমোদন বন্ধ থাকায় এসব কোম্পানি বাংলাদেশের নাগরিকদের নামে কোম্পানি নিবন্ধন করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি নাগরিকদের উচ্চ বেতন দেয়া হয়। কিন্তু ব্যবসা পরিচালনা করে বিদেশি কোম্পানির পক্ষ থেকে একজন প্রতিনিধি। আর এভাবেই বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
