‘যারা জনগণের নিরাপত্তা দিয়ে থাকেন, সেই পুলিশকে আমাদের সামনেই পিটিয়ে মেরে ফেলবে তা কীভাবে সম্ভব ? তাই মানবতার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে সবাইকে ঘরের বাইরে বের হয়ে আসতে হবে। তাহলে দেখবেন ভাল দিন আসবেই, উজ্জ্বল হবে দেশ।’ কথাগুলো বিউটি পার্লার কর্মচারী ঝরনা বেগমের। যিনি গত ১ এপ্রিল রাজশাহীর শালবাগান বাজারে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে দুর্বৃত্তদের সহিংসতায় গুরুতর আহত পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর জাহাঙ্গীর আলমকে উদ্ধার করেছিলেন। তাঁর এই সাহসিকতার স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁকে গতকাল বুধবার সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। পুলিশ সদর দফতরে এ অনুষ্ঠানে নিজের অভিব্যক্তি জানিয়ে ২৮ বছর বয়সি ঝরনা বেগম এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে স্বীকৃতি স্মারক , প্রশংসাপত্র এবং উপহার প্রদান করেন পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাহাঙ্গীর আলমের ওপর সেদিনের হামলার চিত্র দেখানো হলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি ঝরনা বেগম।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে দুই সন্তানের জননী ঝরনা বেগম বলেন, ঐ দিন যখন বোমার শব্দ পাই তখন আমি আমার ছেলেকে খুঁজতে বাসার বাইরে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি একজন পুলিশ সদস্য রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছেন। আমি প্রথমে ধরেই নিয়েছিলাম তিনি মারা গেছেন। তারপরও খেয়াল করতে থাকি নিঃশ্বাস আছে কীনা। যখন বুঝতে পারি তিনি নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। তখন তাঁকে দোয়া পড়তে বলি। আমার কথায় তিনি দোয়া পড়লেন। পরে উপস্থিতদের ডেকে নিজের সন্তানের মতো কোলে তুলে তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে যাই।
তিনি আরও বলেন, হাসপাতালে নেয়ার পথে এসআই জাহাঙ্গীরের শরীর থেকে প্রচুর রক্ত পড়ছিল। তাই আমি আমার ওড়না দিয়ে তার শরীর পেঁচিয়ে দেই। তখন আমার মনে ছিল না যে, একজন নারী হিসাবে নিজের শরীরকে আগে ঢাকা উচিত। আবেগাপু্লত কণ্ঠে ঝরনা বেগম বলেন, কোন স্বীকৃতির জন্য আমি আহত পুলিশ সদস্যকে উদ্ধারে এগিয়ে যাইনি। বরং মানবিক বিবেচনায় একজন আহত পুলিশ সদস্যের পাশে দাঁড়িয়েছি। তিনিও সকলকে মানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে অনুরোধ করেন।
পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, কীর্তি করে কীর্তিমান হয়েছেন ঝরনা বেগম। তাঁর অনন্য মানবিক ও বিরোচিত ভূমিকা বাংলাদেশ পুলিশসহ সমগ্র জাতিকে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত করেছে। নির্ভীক ও মমতাময় চিত্তের যুগপত্ বহিঃপ্রকাশ জাতির সামনে এক অনবদ্য উদাহরণ হিসাবে চির ভাস্বর হয়ে থাকবেন তিনি। আজকের এ আয়োজন তার মত একজন মহীয়সী নারীর মহতি উদ্যোগকে স্বীকৃতি প্রদানের এক ক্ষুদ্র প্রয়াস। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানিয়ে আইজিপি বলেন, সমাজের সকলের যূথবদ্ধ প্রচেষ্টায় যে কোন অন্যায় বা অপরাধ নিরসনে এগিয়ে আসতে হবে।
সেই সময় ঝরনা বেগমকে সাহায্য করেছিলেন অন্য দুই সাংবাদিক। তারা হলেন এটিএন বাংলার ক্যামেরাম্যান মাহফুজুর রহমান ও কালের কণ্ঠের রফিকুল ইসলাম। এ দুইজনকেও ধন্যবাদ জানিয়ে আইজিপি বলেন, সাংবাদিকরাও পুলিশের বিপদে সাহায্য করে যে উদাহরণ সৃষ্টি করেন তা মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম শহীদুল হক। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজি আমির উদ্দিন, অতিরিক্ত আইজি মইনুর রহমান চৌধুরী এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা।
